চট্টগ্রাম মোহামেডান যখন 'সদরঘাট'

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

সিয়াম আনোয়ার, চট্টগ্রাম থেকে

চট্টগ্রাম মোহামেডান স্পোটিং ক্লাবের নিচে ফলের দোকান। ছবি: রাশেদ

চট্টগ্রাম মোহামেডান স্পোটিং ক্লাবের নিচে ফলের দোকান। ছবি: রাশেদ

'এই ফলের দোকান, পান-চা-সিগারেটের দোকান আগেও ছিল। এর ওপরে চট্টগ্রাম মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব লেখা সাইনবোর্ড আগেও বেমানান ছিল। কিন্তু পাশের গলি দিয়ে খানিকটা ভেতরে গিয়ে যখন ক্লাবের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতাম, তখন মনে হতো বাইরে সদরঘাট হলেও ভেতরে আমরা ফিটফাটই। কিন্তু এখন আর সদরঘাট-ফিটফাট বলে কিছু নেই। সবই সদরঘাট।'

মজার ছলে বললেও খুব বেদনা নিয়েই কথাগুলো বলছিলেন পারভেজ মান্নান। বছর পঞ্চাশের এ মানুষটি চট্টগ্রাম মোহামেডানের সাবেক ফুটবলার এবং ফুটবল দলের সাধারণ সম্পাদক ও ম্যানেজারও। মোনেম মুন্না যখন চট্টগ্রামের ক্লাবটিতে খেলতেন, তখন অধিনায়কও ছিলেন। এক-দেড় দশক আগেও যে চট্টগ্রাম মোহামেডান রমরমা অবস্থায় ছিল, সেই স্মৃতি তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। বাইরের চেহারায় জৌলুস না থাকলেও তখন ক্লাবের ভেতরে এবং মাঠের খেলায় ছিল আভিজাত্য। চট্টগ্রামের তো বটেই, দেশের ফুটবলেরই বড়সড় এক নাম ছিল চট্টগ্রাম মোহামেডান।

১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত ক্লাবটিতে একসময় কাজী সালাউদ্দিন, আবদুস সালাম মুর্শেদীরা তো খেলেছেনই, এক দশক আগেও একই সময়ে জাতীয় দলের নয়জন ফুটবলার ছিলেন দলে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে খেলার পাশাপাশি ২০০৯ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত কোটি টাকার সুপার কাপের সেমিফাইনাল খেলার কীর্তিও আছে চট্টগ্রাম মোহামেডানের। সেই চট্টগ্রাম মোহামেডান এক দশকের ব্যবধানেই এখন 'সোনালী অতীত'। এ মুহূর্তে চট্টগ্রাম আবাহনী যখন শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্লাব কাপ আয়োজন করছে, চট্টগ্রাম মোহামেডান তখন দেশের ফুটবল-মানচিত্রে কোথাও নেই।

অন্দরে-বহিরঙ্গে 'সদরঘাট' হয়ে পড়া ক্লাবটির সঙ্গে বাস্তবিকই নামটি জড়িয়ে আছে। চট্টগ্রাম শহরে মোহামেডান স্পোর্টিংয়ের অবস্থান সদরঘাট রোডে, শেখ কামাল ক্লাব কাপ চলা এমএ আজিজ স্টেডিয়াম থেকে যা খুব একটা দূরের পথ নয়। শনিবার সরেজমিনে প্রথম দর্শনে চোখে পড়ল ফল দোকান, চা দোকান আর ওপরের সাইনবোর্ডটিই। প্রবেশমুখের খোঁজ করতে দেখিয়ে দিলেন একজন। পাশের গলি দিয়ে কয়েক হাত হাঁটলেই বাঁ দিকে দরজা। কিন্তু ঢোকার উপায় নেই, দরজায় তালা। খোলার মতো আশপাশেও কাউকে পাওয়া গেল না। দোকানিদের জিজ্ঞেস করে জানা গেল, অনেক দিন ধরেই ক্লাবটি বন্ধ। কেউ আসে না।

সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে ঢাকার মতো করে চট্টগ্রামের ক্লাবগুলোতেও ক্যাসিনো অভিযান চালানো হয়েছিল। সে সময় চট্টগ্রাম মোহামেডানে তাস আর জুয়ার সরঞ্জাম পাওয়া গিয়েছিল। ওই ঘটনার পর আর কেউই এখানে পা রাখেননি। এমনকি বেতনভুক্ত স্টাফরাও না। ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ শাহাবুদ্দিন শামীম অবশ্য ক্যাসিনোকে ক্লাবে তালার কারণ হিসেবে মানতে নারাজ। তার মতে, ইচ্ছে করেই বন্ধ রাখা হয়েছে। সেই 'ইচ্ছে' আবার মানুষের আনাগোনা বন্ধ করার জন্য। মানুষ যাতায়াত করলে ফের জুয়ার আসর চালু হবে- এমন শঙ্কা তার!

জুয়ার বিষয়টি না হয় বোঝা গেল। কিন্তু মাঠের খেলায় চট্টগ্রাম মোহামেডান কই? স্বাধীনতার পর থেকে যে দল চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার লিগে রেকর্ডসংখ্যক বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, যার মধ্যে ২০০৩-০৬ সময়ে টানা চার শিরোপাও আছে, যে দল চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ে উঠে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের দ্বিতীয় আসরে চতুর্থ হয়েছিল- সেই দলের এখন খোঁজ নেই কেন? বেশি বেশি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলে কাউন্সিলরের সংখ্যা বাড়বে বিবেচনায় নব্বই দশকে মোহামেডান ব্লুজ নামে আলাদা একটি দল গড়া হয়েছিল ক্লাবের পক্ষ থেকে। সেই দলটি এখন চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার লিগে টিকে আছে।

কিন্তু চট্টগ্রাম মোহামেডান বলতে আসল যে সত্তা, সেটির অবস্থান কী? চট্টগ্রাম থেকে আবাহনী আর সাইফ স্পোর্টিং জাতীয় পর্যায়ের নিয়মিত দল হয়ে উঠলেও সবচেয়ে পুরনো ক্লাবটির অবস্থা এমন বেহাল কেন? এমন অজস্র প্রশ্ন থাকলেও ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শাহাবুদ্দিনের কথায় মনে হলো সমস্যার উদ্ভব আর সমাধান এক জায়গাতেই, 'এখন করপোরেট হাউসগুলো ফুটবলে ঢুকছে। যাদের বাজেট অনেক বড়। সে তুলনায় আমাদের বাজেট খুবই কম। যে কোনো কারণেই হোক, মোহামেডানকে অন্য একটি রাজনৈতিক দলের ক্লাব মনে করা হয়। তাই আগে যারা ডোনার ছিলেন, তারা আসতে চান না। ভয় পান, যদি প্রশাসন থেকে রাজনৈতিক দলের মনে করে?' 

ক্লাবের সাবেক অধিনায়ক পারভেজ মান্নান অবশ্য রাজনীতি বা স্পন্সরশিপ না পাওয়াকে কারণ মনে করছেন না। তার মতে, নেতৃত্বের ব্যর্থতাই মোহামেডানের দুরবস্থার মূল কারণ, 'এখন ব্যক্তিস্বার্থে ক্লাব ব্যবহার করা হয়। মাঠের খেলা নিয়ে মাথাব্যথা নেই। স্পন্সর না আনতে পারলে দায়িত্ব ছেড়ে দিক।' ১৯৯৫ সাল থেকে ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসা শাহাবুদ্দিন অবশ্য দ্রুতই ক্লাবের স্পন্সর জোগাড় এবং মাঠের সাফল্য ফেরানোর আশাবাদ শোনালেন, 'প্রক্রিয়া চলছে। আগামী দু-এক মৌসুমের মধ্যে আবারও ঢাকার ফুটবলে ফিরব।'