২০১৮ যুব বিশ্বকাপের পর থেকে এবারের বিশ্বকাপের মাঝামাঝি সময়ে ৩৩টি যুব ওয়ানডে খেলেছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল। অংশ নেওয়া ১২ আসরের মধ্যে বাংলাদেশের আর কোনো যুব দলই এত বেশি ম্যাচের প্রস্তুতি নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে যায়নি। বেশি ম্যাচ খেলার তাৎক্ষণিক ফল- বাংলাদেশের প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনাল; যা পারেনি আগের কোনো দল।

আকবর আলীদের ফাইনালে ওঠার নেপথ্য কারণ যদি এককথায় ব্যাখ্যা করতে হয়, উত্তর তবে দশ-বারোজন খেলোয়াড়ের একসঙ্গে বেশি বেশি ম্যাচ খেলতে পারাটাই।

দেশের মাটিতে ২০১৬ বিশ্বকাপে তৃতীয় হলেও দুই বছর পরের আসরে ষষ্ঠতে সন্তুষ্ট থাকতে হয় বাংলাদেশকে। নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সেই আসরের পরই দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ নিয়ে ভাবা শুরু করে বিসিবি। লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় দুটি- দেশের চেয়ে বাইরে বেশি খেলা এবং বড় সংখ্যক খেলোয়াড়কে লম্বা সময় একসঙ্গে খেলিয়ে যাওয়া। ২০১৮-এর সেপ্টেম্বরে যে স্কোয়াডটি দাঁড় করানো হয়, সেটিই খেলছে এবারের বিশ্বকাপে। যুব বিশ্বকাপের আগের আসরগুলোতে পুরোনো খেলোয়াড় তিন-চারজন থাকলেও এবার আছেন মাত্র একজন- তৌহিদ হৃদয়।

দুই বছর আগে অনূর্ধ্ব-১৭তে থাকা আকবর আলী, মাহমুদুল হাসান জয়, শাহাদাত হোসেন, তানজিদ হাসান তামিম, শরিফুল ইসলাম, শামিম হোসেনদের নিয়ে গড়া হয় বর্তমান দলটি। শ্রীলংকার সাবেক ক্রিকেটার নাভিদ নেওয়াজকে দেওয়া হয় কোচের দায়িত্ব। এরপর নিয়মিতই দ্বিপক্ষীয় সিরিজের মাধ্যমে খেলা ও অনুশীলনে রাখা হয় গোটা দলকে। প্রতিবেশী ভারত, শ্রীলংকা তো বটেই, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডেও পাঠানো হয় দলটিকে। ছিল টানা দুই বছরে দুটি যুব এশিয়া কাপও। সব মিলিয়ে গত বিশ্বকাপের পর থেকে ত্রিশের বেশি ম্যাচ খেলে ফেলেন আকবররা, যার মধ্যে জয় ১৮টিতে, হার আটটিতে; আর টাই ও পরিত্যক্ত মিলিয়ে গেছে সাতটি ম্যাচ।

তবে জয়ের সংখ্যা পঞ্চাশ শতাংশের বেশি হলেও এ সময়ের মধ্যে দরকারি শিক্ষাও হয়েছে। টানা দুই এশিয়া কাপে ভারতের কাছে হেরেছে বাংলাদেশ; এর মধ্যে ২০১৮ আসরের সেমিফাইনালে ২ রানে আর ২০১৯ আসরের ফাইনালে ৫ রানে। গত বছর ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টের ফাইনালে আড়াইশ'র বেশি রান করেও হারতে হয়েছে একই দলের কাছে।

তাৎক্ষণিকভাবে হৃদয় ভেঙে দেওয়া এই হারগুলোই অনূর্ধ্ব-১৯ দলটিকে মানসিকভাবে আরও দৃঢ় করেছে। যে কারণে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে প্রস্তুতি ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের কাছে ৪ উইকেটে হেরে যাওয়ার পরও মূল খেলার সেমিফাইনালে তাদের ৬ উইকেটে হারানো গেছে; প্রস্তুতিতে প্রথম বলে আউট হওয়া মাহমুদুল হাসানই সেমিতে করে ফেলেন সেঞ্চুরি! বেশি ম্যাচ খেলার সুবাদে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া আর ১২-১৩ জনের একসঙ্গে দেড় বছর খেলার সুফলই এখন ফাইনালে খেলতে পারা।

দেশকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে তোলার সাফল্যের মধ্যে আরেকটি কীর্তিও তারা গড়ে ফেলেছে। যুব ওয়ানডেতে টানা ৯ ম্যাচে জিতেছেন আকবররা, এর আগে সর্বোচ্চ আট ম্যাচ জিতেছিল ২০০৫ সালের ব্যাচ। পূর্বসূরিদের ছাপিয়ে গিয়ে এখন ট্রফি হাতে তোলায়ও অগ্রগামী হওয়ার অপেক্ষায় আকবররা। শনিবার বিশ্বকাপ ফাইনাল সামনে রেখে বাংলাদেশ যুব দলের অধিনায়ক বলে গেলেন, 'টুর্নামেন্টে ভারত এখনও হারেনি, আমরাও অপরাজিত। আশা করি দারুণ এক ম্যাচ হবে। মাঠে নেমে পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন ঘটাতে পারলে ফল আমাদের পক্ষেই আসবে।'

মাহমুদুল হাসান জয়

যুব বিশ্বকাপে শুরুটা তার ভালো হয়েছিল। জিম্বাবুয়ে ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে অপরাজিত ছিলেন যথাক্রমে ৩৮ ও ৩৫ রানে। কিন্তু বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হওয়া পাকিস্তান ম্যাচ আর কোয়ার্টারে প্রোটিয়াদের বিপক্ষে এক অঙ্কে আউট হয়ে গিয়েছিলেন। একপাশ আগলে রাখার দায়িত্ব নিয়ে খেলা মাহমুদুল হাসান জয় সেরা ইনিংসটি খেলেছেন সেমিফাইনালে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তার ১০০ রানই বাংলাদেশকে এখন শিরোপার মঞ্চে এনে দাঁড় করিয়েছে। ৫ ইনিংসে ১৭৬ রান করে চলতি আসরে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহকও এই ডানহাতি ব্যাটসম্যানই।

তৌহিদ হৃদয়

অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ের ক্রিকেটে তৃতীয় সর্বোচ্চ রান এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির মালিক তৌহিদ হৃদয়। মিডল অর্ডারে খেলা এ ডানহাতি গ্রুপ পর্বে ভালো খেলতে পারেননি। তবে নকআউট থেকে ছন্দে দেখা যাচ্ছে তাকে। কোয়ার্টারে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে খেলেছেন ৫১ রানের ইনিংস। এরপর সেমিতে দ্রুত দুই ওপেনার ফিরে যাওয়ার পর চাপের মুহূর্তে মাহমুদুল হাসানকে জয়কে সঙ্গ দিয়েছেন ৬৮ রানের জুটিতে। খেলেছেন ৪৭ বলে ৪০ রানের ইনিংস। মাঝের ওভারে আজও ভরসা টানা দুই আসরে খেলা এই ব্যাটসম্যানের ওপর।

রাকিবুল হাসান

৪ ম্যাচে ১১ উইকেট শিকার করে রাকিবুল এখন সর্বোচ্চ উইকেটশিকারিদের মধ্যে সেরা দশে। বাঁহাতি এ স্পিনার কোয়ার্টার ফাইনালে প্রায় একাই ধসিয়ে দিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং লাইনআপ, নিয়েছিলেন ৫ উইকেট। এর আগে গ্রুপ পর্বে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে করেছিলেন হ্যাটট্রিক। সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে উইকেট খুব বেশি পাননি (মাত্র ১টি), তবে দশ ওভার হাত ঘুরিয়ে ৩৫ রানের বেশি খরচও করেননি। অর্থাৎ উইকেটশিকার বা রান আটকানো- দুটোতেই দলের ভরসা হয়ে উঠেছেন রাকিবুল।

শরিফুল ইসলাম

৪ ইনিংসে ১১১ রান দিয়ে নিয়েছেন ৭ উইকেট, ২৯ ওভারের মধ্যে মেডেন ৫টি। ওভারপ্রতি রান খরচের (৩.৮২) তথ্যও শরিফুলের পক্ষে বলছে। তবে সংখ্যার মধ্যে যা নেই, তা হচ্ছে টুর্নামেন্টজুড়ে দরকারি সময়ে ব্রেক থ্রু দিতে পেরেছেন বাঁহাতি এ পেসার। বলে মুভমেন্টও ভালো। যে কারণে আজকের ফাইনালে ফর্মে থাকা দুই ভারতীয় ওপেনার যশস্বী জয়সওয়াল ও দীবায়ন সাক্সেনাকে আটকানোর মূল দায়িত্বটা তারই।