করোনাভাইরাসের থাবায় চরম বিপর্যস্ত ইতালি। তাদের ফুটবল অঙ্গনেও এর প্রভাব ভয়ানকভাবে পড়েছে। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে এবার আক্রান্ত হয়েছেন ইতালির কিংবদন্তি ফুটবলার পাওলো মালদিনি। শুধু তিনি একা নন, তার ছেলে ড্যানিয়েল মালদিনিও আক্রান্ত। দুই মালদিনির আক্রান্তের কয়েক ঘণ্টা আগেই জুভেন্তাসে তৃতীয় ফুটবলার হিসেবে আর্জেন্টিনার পাওলো দিবালা এবং তার বান্ধবী ওরিয়ানা সাবাতানির করোনার খপ্পরে পড়ার খবর আসে। এ ছাড়া সাম্পদোরিয়ার পাঁচজন, ফিওরেন্টিনার দু'জনও আক্রান্ত হয়েছেন করোনায়। স্থগিত হওয়ার আগে এ মাসের ৮ ও ৯ তারিখ সিরি 'এ' সর্বশেষ রাউন্ড হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, তখনই ফুটবলারদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে করোনা।

অনেকের মতে, ইতালিতে সর্বসাধারণের মধ্যে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পেছনেও ফুটবল দায়ী। ১৯ ফেব্রুয়ারি মিলানের বিখ্যাত সানসিরো স্টেডিয়ামে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নকআউট পর্বের প্রথম লেগে আটালান্টার মুখোমুখি হয়েছিল স্প্যানিশ ক্লাব ভ্যালেন্সিয়া। সেদিন সানসিরোর গ্যালারিতে হাজির ছিল প্রায় চল্লিশ হাজার দর্শক। ওই ম্যাচের পরই নাকি ইতালিতে ছড়িয়ে পড়ে করোনা।

লমবার্দি অঞ্চলের বার্গামোইতে আটালান্টা ক্লাব অবস্থিত। তাই সেদিন গ্যালারিতে থাকা দর্শকের অধিকাংশই ছিল বার্গামোই থেকে আসা। পরে দেখা যায়, এই বার্গামোই সবচেয়ে বেশি করোনা আক্রান্ত। ওই ম্যাচ দেখতে আসা দর্শকদের অনেকে কয়েক দিনের মধ্যে করোনাভাইরাস পরীক্ষায় পজিটিভ ধরা পড়ে। ভ্যালেন্সিয়ার পঁয়ত্রিশ শতাংশ ফুটবলার ও কর্মকর্তা আক্রান্ত হওয়ার পেছনেও এ ম্যাচকেই দেখছেন অনেকে। সেদিন মাঠে উপস্থিত ছিলেন স্পেনের অনেক দর্শকও। তাই স্পেনে করোনা সংক্রমণের পেছনেও ওই ম্যাচকেই অনেকে দায়ী করছেন।

পাওলো দিবালাও আক্রান্ত হয়েছেন ফুটবল মাঠ থেকেই। ১১ মার্চ ইতালিয়ান লিগের প্রথম ফুটবলার হিসেবে জুভ-সতীর্থ ড্যানিয়েল রুগানি করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই তুরিনে বান্ধবীসহ কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন দিবালা। দু'দিন আগেই জুভেন্তাসের ডাগআউটে রুগানির সঙ্গে ছিলেন তিনি। তখনই তার আক্রান্ত হওয়ার গুঞ্জন উঠেছিল। কিন্তু তখন সে খবর উড়িয়ে দিয়ে দিবালা বলেছিলেন, তিনি কেবল পরীক্ষা করিয়েছেন। কয়েকদিন পর ফল হাতে আসবে। গত শনিবার সে ফল এসেছে, তাতে করোনা পজিটিভ হয়েছে আর্জেন্টাইন এই স্ট্রাইকারের। শুধু তিনি একা নন, তার বান্ধবী ওরিয়ানাও আক্রান্ত। ইনস্টাগ্রামে নিজেই দু'জনের আক্রান্ত হওয়ার খবর দিয়েছেন দিবালা, 'হাই, সবাইকে জানাতে চাই যে মাত্রই কভিড-১৯ পরীক্ষার ফল হাতে পেয়েছি। আমি ও ওরিয়ানা দু'জনই পজিটিভ। সৌভাগ্যবশত, আমরা দু'জনই এখন শারীরিকভাবে ঠিক আছি। বার্তার জন্য আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।'

দিবালা হলেন জুভেন্তাসের করোনা আক্রান্ত তৃতীয় ফুটবলার। তার আগে ড্যানিয়েল রুগানির সংস্পর্শে সংক্রমিত হন ব্লেইস মাতুইদি। জুভেন্তাস কর্তৃপক্ষ গতপরশু এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গত ১১ মার্চ বুধবার থেকে নিজ উদ্যোগেই আইসোলেশনে আছেন আর্জেন্টাইন এ তারকা, 'পাওলো দিবালা মেডিকেল টেস্ট করিয়েছেন। তার শরীরে কভিড-১৯ পাওয়া গেছে। তিনি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে আছেন। তিনি সুস্থ আছেন, তার শরীরে কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।' তবে তিনজন ফুটবলার আক্রান্ত হলেও গঞ্জালো হিগুয়াইন, পিয়ানিচ, সামি খেদিরা ও ডগলাস কস্তাকে ইতালি ত্যাগ করতে দিয়েছে জুভেন্তাস। তাদের এ কার্যক্রম নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।

শনিবার সন্ধ্যায় পাওলো মালদিনির করোনা আক্রান্তের খবর দেয় ইতালির আরেক ক্লাব এসি মিলান। ৫১ বছর বয়সী মালদিনি ইতালির তো বটেই, সর্বকালের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডারদের একজন। ইতালির হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ২৩ ম্যাচ খেলার রেকর্ডটি তার। বিশ্বকাপে তার খেলা ২২১৬ মিনিটও রেকর্ড। সারা জীবন শুধু এসি মিলানের হয়ে ক্লাব ফুটবল খেলা মালদিনি এখন ক্লাবের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর। তার ১৮ বছর বয়সী ছেলে ড্যানিয়েল মালদিনি এসি মিলান যুব দলের ফরোয়ার্ড। মালদিনিরা তিন প্রজন্ম ধরে এসি মিলানের খেলছেন। পাওলোর বাবা ও ড্যানিয়েলের দাদা সিজার মালদিনিও এসি মিলানের হয়ে খেলেছেন। এক বিবৃতিতে দু'জনেরই আক্রান্ত হওয়ার খবর দিয়েছে এসি মিলান কর্তৃপক্ষ, 'পাওলো মালদিনি জানতে পেরেছেন যে, সম্প্রতি করোনা আক্রান্ত এক ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছিলেন তিনি। এই ভাইরাসের সংক্রমণ হলে যে লক্ষণগুলো দেখা যায়, তার মধ্যে সেগুলো ফুটে উঠেছিল। টেস্টে তার পজিটিভ রিপোর্টও এসেছে। একই অবস্থা তার ছেলে ড্যানিয়েলেরও। তবে পাওলো ও ড্যানিয়েল এখন ভালো আছেন। দু'জনই দুই সপ্তাহ ঘরে কাটিয়ে ফেলেছেন। এই সময়ে তারা কারও সংস্পর্শে আসেননি। পুরোপুরি সেরে ওঠার জন্য যতদিন প্রয়োজন, ততদিন কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন তারা।'

ইতালিতে করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা গতপরশুই পাঁচ হাজার ছুঁই ছুঁই। কোনোভাবেই তারা এই ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।