কালের পরিক্রমায় স্মৃতির অ্যালবামের পাটে পাটে সাজিয়ে রেখেছেন কতই না রোমাঞ্চ। পাট ভেঙে তা থেকে কত সুখস্মৃতি তুলে আনার কথা তার। হারারে স্পোর্টস ক্লাব, বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম, কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেনস, বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম, উইন্ডিজের কুইন্স পার্ক ওভাল, প্রভিন্স স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের জয়গুলো লেখা হয়েছে স্বর্ণাক্ষরে।

জিম্বাবুয়ে, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলংকা, দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানো টাইগার স্কোয়াডের সেনাপতি হাবিবুল বাশারকে স্মৃতির কুঠুরি থেকে যখন তুলে আনতে বলা হলো কোনো একটি ম্যাচের গল্পগাথা, আনন্দ-বেদনায় মাখামাখি স্মরণীয় মুহূর্তগুলো থেকে জাতীয় দলের সাবেক এ অধিনায়ক পাঠ করলেন মুলতান টেস্টের বেদনার গীতিকাব্য।

২০০৩ সালে সুফি সাধকের মুলতানে পাকিস্তানের কাছে নিশ্চিত জয়ের টেস্ট ম্যাচ হারের দুঃখ হৃদয় দখল করে রেখেছে এতকাল পরও। তবে কি সেই চিরাচরিত বলা কথাই সত্য, জীবনের ভগ্নাংশে জমে থাকা কোনো একটি বিয়োগান্ত ঘটনাই মানুষকে ভেঙেচুরে গড়ে। হাবিবুল বাশার তাই তো বলছেন, 'জীবনের প্রথম ধাক্কা ২০০৩ সালের মুলতান টেস্ট।'

খটমট পরিসংখ্যানের পাতায় চোখ বুলালে ধরা দেবে বেদনার সেই রূপকথা। টেস্ট ক্রিকেটের নবাগত বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজন টস জিতে ব্যাটিং নিয়েছিলেন। উমর গুলদের মোকাবিলা করে টপঅর্ডার ব্যাটসম্যানরা রান পেলেন। ব্যাটিং অর্ডারের তিন নম্বরে নেমে হাবিবুল বাশার ১৫৩ বল খেলে করেন ৭২ রান। জাভেদ ওমর বেলিমের ৩৮ আর রাজিন সালেহর হার-না-মানা ৪৯ রানে স্কোর বোর্ডে জমা হলো ২৮১ রান। পুরো ইনিংসে একটিও ছক্কা নেই। এতটাই সাবধানী ব্যাটিং করেছে টাইগাররা। ৯৯.২ ওভার ব্যাট করে হয়েছে অলআউট।

খালেদ মাহমুদ আর মোহাম্মদ রফিক ৯ উইকেট শিকার করে স্বাগতিক পাকিস্তানকে বেঁধে ফেলেন ১৭৫ রানে। ১০৬ রানে এগিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামে বাংলাদেশ। এবার অবশ্য বড় জুটি না হওয়ায় গুটিয়ে গেল ১৫৪ রানে। ২৬১ রানের লক্ষ্য দিয়েও ইনজামাম-উল হকের সেঞ্চুরির কাছে শেষ মুহূর্তে এক উইকেটে পরাজিত বাংলাদেশ। কান্নার নোনা জলে ভাসল পুরো দল।

স্মৃতিচারণ করে হাবিবুল বাশার ফিরে গেলেন ১৭ বছর পেছনে, 'মুলতান টেস্ট ম্যাচটা খুব নাড়া দেয়। তখন টেস্ট ম্যাচ জেতা আমাদের কাছে অচিন্তনীয় ব্যাপার ছিল। চার বা পাঁচ দিন খেলতে পারলেই বর্তে যাই। তাতেই প্রাপ্তি খোঁজা হতো। সেখানে পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে জয়ের খুব কাছে চলে গিয়েছিলাম। পুরো সিরিজে আমি ভালো করেছি। মুলতান টেস্টের প্রথম ইনিংসে রান করি। দ্বিতীয় ইনিংসে ভালো হয়নি। আমি জীবনে অনেক ব্যর্থ হয়েছি, তবে ওই ব্যর্থতা অনেক পোড়ায়। সবাই বলাবলি করছিল- ওই ইনিংসটায় (দ্বিতীয় ইনিংস) আমি রান করলে টেস্ট ম্যাচটি জিততে পারতাম। প্রতিটি সেশনে ম্যাচের রং বদলাচ্ছিল। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মনে হচ্ছিল জিতে যাব। যখন জিততে পারলাম না, তখন খুব কষ্ট পেয়েছি। ওটা খুব পোড়ায়।'

মুলতান টেস্টের শিক্ষা পরবর্তী সময়ে অনেক কাজে দিয়েছে হাবিবুল বাশারের। একটু একটু করে নিজেকে আরও পরিণত ও শানিত করেছেন। তার সময়ে ক্ষণে ক্ষণে পাওয়া কিছু জয় ভিত দিয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের। গল্পচ্ছলে শোনালেন নিজেরই স্মৃতিকথা, 'তারপর তো অনেক স্মরণীয় ম্যাচ হয়েছে- জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ জেতা আমার নেতৃত্বে হারারেতে। প্রথম টেস্ট ম্যাচ জেতা চট্টগ্রামে। ভারতকে দেশের মাটিতে হারানো। কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাওয়া সেই জয়। ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানো। এগুলো সব স্পেশাল ম্যাচ। অনেক জিতেছি, অনেক হেরেছি; কিন্তু একটা জায়গায় এসে থমকে যাই- মুলতান টেস্ট। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ফতুল্লা টেস্ট ম্যাচটাও জেতা উচিত ছিল। ওটাতেও প্রথম ইনিংসে রান করেছি, দ্বিতীয় ইনিংসে রান করিনি। রান করলে হয়তো ভিন্ন চিত্র হতে পারত। কিন্তু সব মিলিয়ে মুলতান টেস্ট হারা বিশাল ধাক্কা। প্রথম ধাক্কা বলতে যেটা বোঝায়, যা কখনও ভোলা যায় না, সেটাই হয়েছে। বাঁধভাঙা দুঃখ। ম্যাচটা খুব ভালো ছিল সব মিলিয়ে।' 

জীবনে প্রথম প্রেমের ব্যর্থতার শোক কেটে যায় নতুন কারও আগমনে। হাবিবুল বাশারও হয়তো সেসব ভুলে গেছেন। শুধু ভুলতে পারেননি ক্রিকেটের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে একটি ব্যর্থতার গল্প- 'মুলতান টেস্ট'।