‘সামর্থ্যের ৩০ ভাগও দিতে পারিনি’

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২০   

সুমন মেহেদী

ছবি: ফাইল

ছবি: ফাইল

‘কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা’। ‘সোনার তরীর’ লাইনটার সঙ্গে মিলে যায় আনামুল হক বিজয়ের ক্যারিয়ার। কী দারুণ সূচনাই তিনি করেছিলেন। ২০১২ সালে অভিষেক সিরিজে উড়ন্ত শুরু। ২০১৫ বিশ্বকাপে ছিলেন দলের মূল ক্রিকেটার। কিন্তু বিশ্বকাপে ইনজুরি দিয়েই তার ক্যারিয়ারে ‘বরষা’ শুরু। বসন্ত আর ফেরেনি। ব্যাটে ফোটেনি রানের ফুল।

দোষটা আনামুল ভাগ্যকেই দেন। সমকাল অনলাইনকে বলেন, ‘ভাগ্যের ওপর তো হাত নেই।’ বিশ্বকাপে শুরুর দুই ম্যাচেই তিনি করেছিলেন ২৯ করে রান। ওই ইনিংস দুটোকেও বড় করে দেখেন তিনি, ‘বিশ্বকাপের ইনিংস দুটোও বড় ব্যাপার। বড় রান পেলে; অন্তত দুটি ফিফটি পেলে ইনজুরি থেকে ফিরলে নিশ্চয় ডাক পেতাম।’

জাতীয় দলে আনামুল অনিয়মিত হয়ে পড়লেও ঘরোয়া ক্রিকেটে তার খারাপ সময় যায়নি। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের আগেও তার নাম ছিল আলোচনায়। কারণ রান ক্ষুধাটা তার আছেই। সব সময় ফিটও রাখেন নিজেকে। তাই তো ২০১৮'র শুরুতে ঘরের মাঠে ত্রিদেশীয় সিরিজে ডাক পড়ে তার। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের পর শ্রীলংকা সফরে লিটন না থাকায় তার কাছেই ফিরতে হয় নির্বাচকদের।

কিন্তু সর্বোচ্চ পর্যায়ে ফর্ম দেখিয়ে জায়গা পাকা করতে পারেননি আনামুল। এছাড়া তার খেলার ধরণ, ফুটওয়ার্ক নিয়েও আছে প্রশ্ন। তবে সেগুলো সমস্যা মনে হয়নি টপ অর্ডার এই ব্যাটসম্যানের, ‘যাদের সঙ্গে ব্যাটিং নিয়ে কাজ করেছি, তাদের এটা সমস্যা মনে হয়নি। এছাড়া আমি এভাবে খেলেই রান পেয়েছি। সেজন্য এগুলো নিয়ে ভাবিনি। মনে হয়েছে রান তো পাচ্ছি, সমস্যা কী। তবে সব ঠিক আছে এটাও মনে হয়নি।'

নিজের খেলার ধরণ নিয়েও আত্মবিশ্বাসের ছটা আনামুলের কথায়, ‘আমি মনে করি, আমার গেমটা আমি শুরু থেকেই বুঝি। ধীরে কিংবা মেরে খেলা এগুলো দলের প্রয়োজনে করতে হয়। কারণ গেমটা সবসময় আমার না, দলের। আর আমার ভালো খেলার ক্ষুধা আছে। আমি এখনও সামর্থ্যের ৩০ ভাগ দিতে পারিনি। ক্যারিয়ারের না, সামর্থ্যের।’

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আনামুলের অভিষেক ২০০৮ সালে। খেলে ফেলেছেন ১২ বছর। ঘরোয়া ক্রিকেটে এরই মধ্যে সেরা দশ রান সংগ্রাহকের একজন। করে ফেলেছেন সাত হাজারের ওপরে রান। তার আগে থাকা তুষার ইমরান-অলক কাপালি কিংবা শাহরিয়ার নাফিসদের ক্যারিয়ার শেষ প্রান্তে। কিন্তু আনামুলের সামনে এখনও দীর্ঘ সময়। যেভাবে এগোচ্ছেন ঘরোয়া ক্রিকেটে দেশের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হওয়ার সব ধরণের সুযোগ আছে তার। একজন জ্যাক হবস যেমন ইংল্যান্ড তথা ঘরোয়া ক্রিকেটের লিজেন্ড, ড্যারেন লেহম্যান যেমন শেফিল্ড শিল্ডে সর্বোচ্চ রান করেছেন। কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজের গর্ডন গ্রিনিজ, ভারতের ওয়াসিম জাফর বা পাকিস্তানের ফরহাদ আলমরা ঘরোয়া ক্রিকেটের লিজেন্ড হয়েছেন। তার সামনেও তেমন সুযোগ আছে।

কিন্তু আনামুল ঘরোয়া ক্রিকেটে নয়। সম্পূর্ণ ফোকাসটা রাখছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দিকে। ঘরোয়া ক্রিকেটে তিনি রান করেন জাতীয় দলে ফেরার জন্য। তার বয়ানে, ‘বিপিএলে রান করি টি-২০ খেলার জন্য, প্রিমিয়ার লিগে খেলি ওয়ানডে দলে ফেরার ফোকাস রেখে। তেমনি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটও পারফর্ম করি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরবো বলে। জাতীয় দলে ফেরার জন্য আমাকে যদি ২০ হাজার রানও করতে হয়, আমি করবো। ফোকাসটা আমি ওই দিকে রেখেই খেলি।’

তারপরও ঘরোয়া ক্রিকেটের লিজেন্ড হয়ে শেষ করতে পারা কম কী! হোমারের মহাকাব্য ইলিয়ডে কিং ওডিসিয়াস যেমন বলেছিলেন, সবাই বলুক, আমি হেক্টরের সময় জন্মেছি। আমি একিলিসের সময় জন্মেছি। তেমনি আনামুলের জন্য তামিম-মুশফিক-সাকিবদের সময় জন্মে বাংলাদেশ ঘরোয়া ক্রিকেটের লিজেন্ড হতে পারা কোন অংশেই কম কাব্যিক হবে না নিশ্চয়। তার জন্য আনামুলকে খেলতে হবে আরও অন্তত ১০ বছর। করতে হবে আরও অনেক রান। শেষ পর্যন্ত ওই রানটাই তো জাতীয় দলে আনবে তাকে!