প্রায় অর্ধশতাব্দী আগেও ছিল বিরান, বিবর্ণ, নিষ্ফম্ফলা আর রুক্ষ এক ভূমিরেখা। বলছি দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চলের কথা। আরও সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার প্রান্তিক ইউনিয়ন ঝিলিম। তারই একটি গ্রাম, নাম জামতলা। এই গ্রামের বুক চিরে তৈরি হয়েছে নাচোল উপজেলায় যাতায়াতের আঞ্চলিক সড়ক। সেই রুক্ষ মাটির নিষ্প্রাণ বরেন্দ্র এখন সবুজে মোড়ানো এক সম্ভাবনার গল্প হয়ে উঠেছে। মাঠজুড়ে আছে বিচিত্র ফসল আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ফলের বাগানও। এমনই একটি সাড়া জাগানো মাল্টা-কমলার বাগান দেখতে কিছুদিন আগে গিয়েছিলাম সেখানে। মনামিনা কৃষিখামার নামের এই বাগানের অবস্থান মূলত বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রান্তঘেঁষেই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের 'বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প'-এর প্রকল্প পরিচালক জ্যেষ্ঠ কৃষিবিদ মেহেদি মাসুদ, কয়েকজন কৃষিবিদসহ আমরা যখন সেখানে পৌঁছাই তখন বাগানে আসা দর্শনার্থীদের নানান প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যস্ত ছিলেন বাগানটির স্বপ্নদ্রষ্টা মতিউর রহমান। মাল্টা-কমলায় ভরতি এই আলো ঝলমল বাগান দেখে মন ভরে গেল। দেশের মাটিতে প্রথম এমন একটি বড় ও সমৃদ্ধ বাগান দেখে বিস্মিত হয়েছি। বাগানের এই মাল্টা-কমলাগুলো আকৃতি ও রঙের দিক থেকেও দেশের অন্যান্য বাগানে চাষ হওয়া কমলা-মাল্টা থেকে একেবারেই আলাদা। আবার মান এবং স্বাদের দিক থেকেও যথার্থ।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মতিউর বেশ আগ্রহ নিয়ে দেখাতে শুরু করলেন বিভিন্ন জাতের মাল্টা আর কমলাগুলো। আমরা সারা বছর বাজারে হলুদ রঙের যে মাল্টা দেখি বাগানে গাছভরতি সেই মাল্টা দেখে বিস্ময় মানি। স্বস্তিও অনুভব করি, তাহলে আমাদের মাটিতেও সম্ভব! শুধু তাই নয়, বিস্ময় জাগানোর এ তালিকায় আরও আছে বাজারে দীর্ঘ সময় ধরে বিক্রি হওয়া ছোট জাতের সুস্বাদু চায়নিজ কমলাও। ফলভরতি প্রতিটি গাছের ডালগুলো ঠেকা দিয়ে রাখা হয়েছে। যতদূর চোখ যায় শুধু কমলা আর মাল্টা। এ যেন মাল্টা-কমলার স্বর্গরাজ্য! মতিউর জানালেন, ফলন বেশ ভালো হওয়ায় ফলের ভারে অনেক ডাল ভেঙে পড়ে ক্ষতি হয়েছে। ৭১ বিঘা আয়তনের এই বাগানে প্রায় ৭শ মাল্টা-কমলার গাছ আছে। এর মধ্যে আছে তিন জাতের কমলা-অস্ট্রেলিয়ান, ম্যান্ডারিন ও চায়নিজ। মাল্টাও তিন জাতের-অস্ট্রেলিয়ান, বারি-১ ও ভেরিগেটা।
প্রথমে ২০০৬ সালের দিকে বিভিন্ন ফলের একটি মিশ্রবাগান তৈরি করেন মতিউর রহমান। ২০০৯ সালে শুরু করেন মাল্টা চাষ। তারপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন জাতের কমলার কলমগুলো সংগ্রহ শুরু করেন। তবে আগেই মাল্টা চাষে সাফল্য আসে। তার কৃতিত্বের খবর ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। এ বছর কভিড-১৯ জনিত বৈরী পরিস্থিতিতেও তিনি প্রায় ১৫ লাখ টাকার মাল্টা বিক্রি করেছেন। কমলা বিক্রি করেছেন প্রায় ৫ লাখ টাকার। শুধু ফলই নয়, চারা-কলম বিক্রি করেও ভালো আয় করছেন তিনি। তার এই সফলতার পেছনে রয়েছে কৃষি বিভাগের সঠিক পরামর্শ এবং সেই সঙ্গে নিজের বুদ্ধিমত্তা ও একাগ্রতা।
মতিউরের বাগানে এই চোখধাঁধানো মাল্টা-কমলার বিপুল সমারোহ দেখে মনে হলো, দেশের মাটিতে মাল্টা-কমলার উৎপাদন এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব। অদূর ভবিষ্যতে এর উৎপাদন নিয়ে আশাবাদী হতে কোনো বাধা দেখি না। কমানো যায় আমদানি নির্ভরতাও।

বিষয় : মাল্টা-কমলায় সুদিন

মন্তব্য করুন