দেশের ক্রীড়াঙ্গনে ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মেয়েরাও এগোচ্ছে। উন্নতিটা বেশি হয়েছে ক্রিকেটে। জাতীয় দলের নারী ক্রিকেটার জাহানারা আলম খুশি বিসিবির দেওয়া সুযোগ-সুবিধায়। তবে সার্বিকভাবে ক্রীড়াঙ্গনের নারীরা এখনও অবহেলিত বলে মনে করেন তিনি। তাই দেশের সব খেলাতেই নারীদের প্রাপ্য সম্মান দেওয়ার আহ্বান জাহানারার।

সমকাল: ক্রিকেটে মেয়েরা এখন কোন পর্যায়ে রয়েছে? ভালো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন তো?

জাহানারা: সুযোগ-সুবিধা আমরা ভালোই পাচ্ছি। দিন দিন সেটা বাড়ছে। আমরা যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, সেখান থেকে এখন অনেক উপরে গেছে সবক্ষেত্রেই। পারিপার্শ্বিক সব কিছু পরিবর্তন হচ্ছে ভালোর দিকে। আমার কাছে মনে হয়, দিন যত গড়াবে, সবকিছু আরও ভালোর দিকে যাবে। কিছু সমস্যা তো থাকবেই। সেটা শুধু ক্রিকেটে নয়, সবক্ষেত্রেই। যদি বলি কোনো সমস্যা নেই, সবকিছু ভালোভাবে এগোচ্ছে, সেটা বাস্তবসম্মত নয়। সমস্যা পরিমাণে একদমই নগণ্য। এগুলো এড়িয়ে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে সামনে এগোচ্ছি। এটা শুধু ক্রিকেট নয়, জীবনের সর্বক্ষেত্রেই।

সমকাল: মেয়েদের খেলাধুলায় ছেলেদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন দেখেন?

জাহানারা: আমার মনে হয় এ ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আগে যেমন খেলাধুলার কথা শুনলেই বড় ভাই বাধা দিতেন। বাবা বলতেন, 'না না মেয়েদের খেলাধুলা করা চলবে না।' এখন অনেক ক্ষেত্রে দেখতে পাই, বড় ভাই, বাবারা মেয়েদের মাঠে দিয়ে যাচ্ছেন। মা সংসারের কাজ দ্রুত সেরে মেয়ের খেলার সামগ্রী গুছিয়ে দিচ্ছেন। কারণ, এখনকার মায়েরা বুঝতে পারেন, খেলাধুলা করলে তার মেয়ে সুস্থ থাকবে, মেধার বিকাশ ঘটবে এবং সে খেলোয়াড় হতে পারবে। দেশের জন্য খেলে নিজের একটা পরিচয় বানাতে পারবে। এই পরিবর্তনকে আমি অবশ্যই বাহবা দিই। তবে পুরুষশাসিত সমাজে নারীরা এখনও অবহেলিত। সেটা শুধু খেলাধুলা নয়, করপোরেট অফিস, ব্যবসা-বাণিজ্য সর্বত্রই।

সমকাল: অবহেলিত না পশ্চাৎপদ?

জাহানারা: আমি বলব অবহেলিত। মেয়েরা প্রাপ্য সম্মানটা সব সময় পায় না। আমাদের মেধা কম বা চেষ্টা করি না, তেমন হলে পশ্চাৎপদ বলা যেত। নারীদের মেধা কোনো অংশে কম নয়। সুযোগ পেলে তারাও নিজেদের প্রমাণ করতে পারে। হ্যাঁ, সমাজ অনেক বদলেছে, কিন্তু সবার দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি। পুরুষের একটা অংশের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসায় নারীদের আজকের অবস্থান। আর একটু বৃহৎ আকারে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে নারীরা আরও ভালোকিছু করবে দেশের জন্য। এতে করে নিজেদের যেমন সুবিধা হবে, তেমনি দেশের উন্নতিতে অবদান রাখতে পারবে।

সমকাল: আগে তো খেলোয়াড় মেয়ের বিয়েতে সমস্যা হতো, এখন কেমন?

জাহানারা: অবশ্যই মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে। আমাদের বর্তমান দলে বিবাহিত ক্রিকেটার রয়েছে তিনজন। যেটা আগে ছিলই না। তিনজনের স্বামীই পুরোদস্তুর সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন স্ত্রীদের খেলার জন্য। শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছ থেকেও সমর্থন পাচ্ছে তারা। দেশে শিক্ষার হার বেড়ে যাওয়ায় সমাজে এই মানসিক পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষিত না হলে এ ধরনের চিন্তা মাথায় আসে না।

সমকাল: নারী দিবস কি নারীদের কাছে কোনো অর্থ বহন করে?

জাহানারা: পুরুষদের তো কোনো দিবস নেই, তাহলে কেন নারী দিবস। নিশ্চয়ই নারীরা অবহেলিত? তাই হয়তো মেয়েদের মনে করিয়ে দেওয়া, 'তোমরা হতাশ হয়ো না, তোমাদের জন্য একটি দিন রয়েছে। সে দিনটিকে উপভোগ কর।' আসলে নারীর শুরু তো ঘর থেকে। নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া একজন পুরুষ চলতে পারে না। পুরুষের পাশে নারী না থাকলে সে অপূর্ণ। নারী ছাড়া তো মানব সন্তানের জন্মই হবে না। এই ভেদাভেদ না থাকলেই ভালো।

সমকাল: ক্রীড়াঙ্গনের নারীরা কি অবহেলিত?

জাহানারা: ক্রীড়াঙ্গনের কথা বললে বলব, হ্যাঁ, নারীরা অবহেলিত। অন্য খেলার মেয়েদের নিয়ে যে প্রতিবেদনগুলো পড়ি, তাতে অবহেলার চিত্র থাকে। তবে ক্রিকেটের কথা বললে, পরিস্থিতি অনেক ভালো। বিসিবি আমাদের যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। অন্য ইভেন্টগুলোতে আর একটু যত্নবান হলে তাদের জীবনযাপন আরও সুন্দর হতে পারে। আমরা খ্যাতি, সুনাম এবং অর্থের পেছনে ছুটি। খেলাধুলা করছি নিজেদের প্রতিভা দিয়ে। আয়রোজগার ভালো না হলে খেলাকে পেশা হিসেবে নিতে পারবে না মেয়েরা। তাই ছেলেদের মতো মেয়েদের খেলায়ও পেশাদারিত্ব আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে অর্থ চলে আসে।

সমকাল: আপনারা তো স্টার। টিভিতে আপনাদের খেলা দেখে মেয়েদের উজ্জীবিত হতে দেখেন?

জাহানারা: মেয়েরা উজ্জীবিত হচ্ছে। আমি কৃতজ্ঞ মিডিয়ার প্রতি যে তারা মেয়েদের খেলাধুলার কাভারেজ দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা রাখছে। আর একটু বেশি কাভারেজ পেলে ভালো হতো, যেভাবে ছেলেরা পায়।