সবাই যখন জাতীয় দলের নিউজিল্যান্ড সফরের পরাজয়ের ধাক্কা সামলাতে ব্যস্ত, একজন তখন নীরবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন আসন্ন শ্রীলঙ্কা সফরের। লঙ্কানদের বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজ খেলতে নিজেকে যেমন তৈরি করছেন, তেমনি ভাবছেন অন্যদের নিয়েও। কারণ তার নেতৃত্বেই তো দুই টেস্টের সিরিজ খেলতে টাইগার বাহিনীর লঙ্কা সফর। যার বুকে শেলের মতো বিঁধে রয়েছে ফেব্রুয়ারিতে ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে টেস্টে হোয়াইটওয়াশ হওয়ার ঘটনা। সেই টাইগার টেস্ট অধিনায়ক মুমিনুল হকের সঙ্গে এক আড্ডায় উঠে এসেছে লাল বলের খেলার নানা দিক। কাঙ্ক্ষিত ফল না মেলা বা বিদেশে ভালো না করার পেছনের কিছু কারণ তুলে ধরেছেন তিনি। সেসবের বিস্তারিত তুলে এনেছেন আলী সেকান্দার
সমকাল: টেস্ট নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী স্বল্প না দীর্ঘ মেয়াদি?
মুমিনুল: এখন স্বল্প মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। আমার মনে হয়, দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোলে ভালো।
সমকাল: একটু খোলাসা করবেন?
মুমিনুল: আমরা দেশে মোটামুটি ভালো খেলি। বিদেশে একেবারেই অধারাবাহিক। দেশে ও বিদেশে দুই জায়গাতেই ভালো করতে গেলে উইকেটের ধরনে পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ বিদেশে গিয়ে বাউন্সি উইকেটে খেলতে সমস্যা হয়। দেশে স্পোর্টিং উইকেট হলে বা বাউন্সি উইকেটে প্রথম শ্রেণির লিগ খেললে বোলাররা বুঝতে পারবে কীভাবে ডেলিভারি দিতে হবে। ব্যাটসম্যানরা বাউন্স বলে খেলে অভ্যস্ত হবে। বল ছাড়তে এবং শট খেলতে সহজ হবে। এজন্য ঘরোয়া ক্রিকেটের উইকেটে পরিবর্তন আনতে হবে। তা না হলে বিদেশে ভালো করা কঠিন। একটা সময় দেশেও চ্যালেঞ্জ হবে। এটা এক দিনে হবে না। দু-তিন বছর লেগে যেতে পারে। এই সময়টুকু সবাই ধৈর্য ধরলে স্থায়ীভাবে লাভবান হবে দেশের ক্রিকেট।
সমকাল: দেশে তো ভালো খেলেন, তাহলে উইন্ডিজের দ্বিতীয় সারির দলের কাছে হারলেন কেন?
মুমিনুল: ভালো একটা প্রশ্ন, দেশের কন্ডিশনেও সেরা দল নিয়ে জিততে পারিনি। এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। তবে বেসিক কারণ হলো, লম্বা সময় টেস্ট না খেলা এবং খেলোয়াড়দের ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের অভাব। বোলার বা ব্যাটসম্যান কেউই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারেনি। ফ্ল্যাট উইকেটে ব্যাটসম্যানরা বড় ইনিংস না খেললে জেতা কঠিন। দ্বিতীয় টেস্টে টার্গেট ছিল ২২১ রান। আমরা যারা খেলেছি সবাই তো ব্যাটিং পারি। ফ্ল্যাট উইকেটে ওই রান তাড়া করা উচিত ছিল।
সমকাল: কিন্তু জাতীয় লিগে তো এই ক্রিকেটাররাই অনেক রান করে?
মুমিনুল: শুধু রান করলেই হবে না। পেশাদারিত্ব বাড়াতে হবে। সবদিক থেকেই সেটা হতে হবে। জাতীয় লিগের পরিবেশ হতে হবে পেশাদারিত্বে মোড়া।
সমকাল: পেশাদারিত্ব বলতে?
মুমিনুল: এখন যে উইকেটে খেলি, তাতে হবে না। টেস্ট ক্রিকেটে ভালো খেলতে চাইলে উইকেটের আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। স্পোর্টিং উইকেট খেলতে হবে জাতীয় লিগ। পেস বোলাররা বোলিং করে আনন্দ পাবে, ব্যাটসম্যানরাও ব্যাটিং করে মজা পাবে। যে উইকেটই বানান না কেন রেজাল্ট হতে হবে। স্পিন উইকেট বানালেও যেন ম্যাচে রেজাল্ট হয়। বিকেএসপির মতো একটা উইকেট বানালেন, যেখানে চার দিন খেলা হলো দুটি ডাবল সেঞ্চুরি পেলেন, দুই ইনিংসে চার দিন শেষ হয়ে গেল- তাতে কোনো লাভ হবে না। ম্যাচ কীভাবে জিততে হয়, কোন পরিস্থিতিতে কেমন চাপ থাকে, সেটা শিখতে হলে ম্যাচের রেজাল্ট চাই। সাদামাটা উইকেটে বিশাল রান করা কেউ জাতীয় দলে এলে সে কিন্তু জেতার জন্য খেলবে না। কারণ সে জানেই না কীভাবে জিততে হয়। প্রথম শ্রেণির লিগে ওই পরিস্থিতির ভেতর দিয়েই তো যায়নি সে। তার ভেতরে জেতার মনমানসিকতাই থাকবে না। সে জানে শুধু ড্র করতে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গিয়েও ওটাই চর্চা করবে। এমন উইকেট বানানো উচিত হবে না, যেখানে ড্র হয়।
সমকাল: হোম কন্ডিশনের সুবিধা নেওয়ার ব্যাপারও তো থাকে?
মুমিনুল: তা তো অবশ্যই। যে উইকেটই বানান তাতে রেজাল্ট আসতে হবে। সেজন্য বেশিরভাগ মাঠে স্পোর্টিং উইকেট থাকবে। যেখানে বাউন্সি পিচ হয় না, সেখানে টার্নিং উইকেট বানান। তার মানে এই নয় যে, দুই দিনে খেলা শেষ হয়ে যাবে। টেস্টে এমনও হয় তিন ও চার নম্বর দিনে বল ঘোরে। জাতীয় লিগে তিন নম্বর দিনে গিয়ে বল ঘুরলেই তো হয়। এখন প্রথম দিন থেকে বল ঘুরলে তো খেলা কঠিন। এই কাজটা কিউরেটরদেরই করতে হবে। যারা উইকেট বানান তারাই জানবেন কোন উইকেট কেমন। এটা আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয়।
সমকাল: বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও কি এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে বলবেন?
মুমিনুল: করতে পারলে খুবই ভালো। খেয়াল রাখতে হবে, সেখানে ম্যাচ জেতার ইনটেন্ট থাকতে হবে। ওখানেও স্পোর্টিং উইকেট দিতে হবে এবং জেতার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। নিচের দিক থেকে এটা করতে পারলে ওপরে এসে তারা অটো ভালো করবে। খেলোয়াড় ওই বয়স থেকে টেস্ট খেলার স্বপ্ন দেখলে অন্যরকম হবে। সে তখন চেষ্টা করবে টেস্ট ক্রিকেটের মতো করে। কত রান করতে চায়, পাঁচ উইকেট নেওয়া এবং কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে বল করতে হয়, শিখে যাবে। নতুন বল পুরোনো বলে বল করার অভ্যাস গড়ে উঠবে। টেস্ট দলে আসার আগেই সে পরিণত। তখন ভালো টেস্ট ক্রিকেটার পাবেন।
সমকাল: টি২০-এর স্রোতে টেস্ট ক্রিকেট হুমকির মুখে পড়ছে না তো? বিশেষ করে বাংলাদেশে?
মুমিনুল: বলা কঠিন। হতে পারে, নাও পারে। তবে অনেক আগে থেকে বোঝা যাচ্ছে, খেলোয়াড়দের টি২০-তে আগ্রহ। আমাদের দেশে যেহেতু খেলোয়াড় কম তাই ঝুঁকি তো থাকবেই।