ঢাকা লিগ বা বিপিএলের মতো জাতীয় লিগে ক্রিকেটার বা টিম ম্যানেজমেন্টকে জবাবদিহিতা করতে হয় না। খারাপ খেলে হারলেও কেউ প্রশ্ন করে না। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের মূল্যায়ন হয় বেশি। স্বাভাবিকভাবেই ক্রিকেটারদের পরিকল্পনাও থাকে আত্মকেন্দ্রিক। টেস্ট ক্রিকেটে যেটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মুমিনুলের প্রত্যাশা, এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে দলের জন্য খেলবে সবাই। সিনিয়র ক্রিকেটারদের কাছ থেকে দেড়শ-দুইশ রানের ইনিংস আশা করছেন তিনি। টাইগার টেস্ট অধিনায়ক মুমিনুল হক সৌরভের সঙ্গে একান্ত আড্ডা থেকে ঘরোয়া ক্রিকেট ও জাতীয় দলের পারফরম্যান্স নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে এনেছেন আলী সেকান্দার
সমকাল: জাতীয় লিগের উইকেটে পরিবর্তন ও পেশাদারিত্ব আনার কথা বলেছেন। ঢাকা লিগ ও বিপিএলের চিত্র কী?
মুমিনুল: ঢাকা লিগ ও বিপিএলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলা হয়। কারণ, ডিপিএলে ক্লাব কর্মকর্তাদের চাপ থাকে। বিপিএলে ফ্র্যাঞ্চাইজিদের চাপ থাকে। কিন্তু জাতীয় লিগে সে চাপ থাকে না। লাল বলে খেলা আরও বেশি হতে হবে। এই খেলাগুলো যদি আরও একটু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়, যারা খেলে তারা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়, তাহলে দ্রুত উন্নতি করা সম্ভব। কীভাবে লম্বা সময় ব্যাটিং করতে হয়, সেশনের ট্রানজেকশনগুলো মোকাবিলা করা এবং লম্বা স্পেলে বোলিং করা শিখতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ১১ জনকেই দলের জন্য খেলতে হবে। প্রিমিয়ার লিগে দেখবেন ক্লাবের চাপে দলের জন্য খেলে। স্বার্থপর ব্যাটিং করলে পরের ম্যাচেই ড্রপ করে দেবে। জাতীয় লিগে যেটা সম্ভব হয় না। জাতীয় লিগেও দলের জন্য খেললে অভ্যাসটাই বদলে যাবে। ধরেন, আপনি একশ করলেন তাতে দলের লাভ হচ্ছে না, দেড়শ বা দুইশ করলে দল জিতবে। সেই প্র্যাকটিস ও মানসিকতা নিয়ে খেললে উন্নতি হবে। ব্যক্তিগত চিন্তা না করে দলের জন্য চিন্তা করতে পারলেই খেলার উন্নতি। তাতে দলের রেজাল্ট হবে, ব্যক্তিগতভাবেও লাভ হবে।
সমকাল: এই সমস্যাগুলো টেস্ট দলে কতটা প্রভাব ফেলে?
মুমিনুল: প্রভাব অবশ্যই ফেলে। ঘরোয়া লিগে একজন ক্রিকেটার যে প্র্যাকটিসের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠে, জাতীয় দলের খেলায় সেটাই চর্চা করবে স্বাভাবিক। রাতারাতি কেউ নিজেকে পরিবর্তন করতে পারে না। তাই আমি বলব, টেস্ট ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স করতে খেলোয়াড়দের আরও পেশাদার হতে হবে। ৫০ করে আউট হওয়া যাবে না। ১০০ করলেও তৃপ্ত হলে চলবে না। একশ হয়ে গেলে দেড়শ-দুইশ রানের লক্ষ্যে খেলতে উচিত। ব্যাটসম্যানদের বড় ইনিংস খেলার অভ্যাস গড়তে হবে। বিশেষ করে যারা অনেক দিন ধরে টেস্ট খেলছে তাদের কাছ থেকে বড় ইনিংস বেশি আসা উচিত। আর বোলারদের লম্বা স্পেলে বোলিং করতে হবে। এখন যারা বোলার আছে, তারা সেটা পারে। এই জায়গায় আরও উন্নতি দরকার। জাতীয় লিগ এবং বিসিএলে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলা হলে সেটা তৈরি হবে। সর্বোপরি আপনি যা-ই করবেন, সবই হতে হবে দলের জন্য।
সমকাল: ভারতে বলেছিলেন, টেস্ট দলকে ঢেলে সাজাবেন। তার কী হলো?
মুমিনুল: আমি যখন বলেছিলাম তখন থেকে খুব বেশি টেস্ট ম্যাচ খেলা হয়নি। আমার নেতৃত্বে ছয়টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছে দল। তাও ভিন্ন ভিন্ন সময়ে। এক বছর বিরতি দিয়ে খেলা হলো দুটি টেস্ট। এত কম টেস্টে দল গোছানো খুবই কঠিন। হ্যাঁ, কন্ডিশনের পরিবর্তন করা হলে এবং সঠিক পরিকল্পনা নিলে দুই থেকে তিন বছর পর রেজাল্ট পাবেন। ওয়ানডেতে দ্রুত ফল পাওয়া যায়, টেস্টে না। টেস্টের জন্য প্রয়োজন লম্বা পরিকল্পনা এবং দেশ ও বিদেশে খেলার মতো ঘরোয়া ক্রিকেটের কন্ডিশন দেওয়া। আমি পাঁচ বছর সময় চাই না, সবকিছু গুছিয়ে দুই বছর দেন, রেজাল্ট দেব।
সমকাল: বিকল্প খুঁজে রেখেছেন?
মুমিনুল: হ্যাঁ, সেটা করা হচ্ছে। পেস বোলিং ইউনিটের দিকে তাকালে দেখবেন সংখ্যাটা বেড়েছে। ছয়-সাতজন পেস বোলার রেখেছি। জাতীয় লিগে যারা ভালো খেলবে তারা 'এ' দলে খেলবে। এভাবে পরিকল্পনা করা হচ্ছে কোচ এবং নির্বাচকদের সঙ্গে বসে। লক্ষ্য করলে দেখবেন, শেষ তিন-চারটি সিরিজে বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার দলের সঙ্গে ছিল। তারা খেলেনি; কিন্তু দলের সঙ্গে ছিল। যার অর্থ হলো, তারা প্রক্রিয়ার ভেতরে আছে এবং খেলবে। সুযোগ এলে খেলোয়াড়কেও সেটা কাজে লাগাতে হবে। রেজাল্ট পেলেই প্রক্রিয়াটাও দেখতে পাবেন।
সমকাল: ১৪-১৫ বছর ধরে কয়েকজন ক্রিকেটারের ওপরই দল নির্ভরশীল। এখন কি নতুন করে ভাবার সময় এসে গেছে?
মুমিনুল: করা যায়। আসলে সেখানেই ট্রানজেকশন করতে পারবেন যেখানে খেলোয়াড় বেশি। কোনো একটি সিরিজে একজন সিনিয়র হয়তো খেলছে না, তখন তার জায়গায় নতুন কাউকে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। তবে ট্রানজেকশন করতে হলে পরিকল্পনা করে করতে হবে। তাহলে কার্যকর হবে।
সমকাল: সীমিত ওভারের দুই অধিনায়ক তো নিজেদের পরিকল্পনামতো দল গোছাচ্ছেন। আপনার খবর কী?
মুমিনুল: করোনার আগে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে যখন খেলেছি তখন দলকে মোটামুটি একটা শেপে আনা সম্ভব হয়েছিল। ম্যাচ না খেললে পরিস্থিতি বোঝা কঠিন। আমি একটি টেস্ট খেলার এক বছর পর আরেকটি টেস্ট খেলে হারলাম, সেটা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কোন দিকে থেকে উন্নতি করতে হবে, সেটা বুঝতে পেরেছি উইন্ডিজের বিপক্ষে খেলে। সেটা নিয়ে পরিকল্পনা করে এগোচ্ছি। কোচ ও ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে কথা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, যারা টেস্ট খেলতে চায়, টেস্ট ক্রিকেটকে ভালোবাসে, তাদেরই এই সংস্করণে খেলা উচিত।
সমকাল: গুঞ্জন আছে, দলের ভেতর থেকে সেভাবে সাপোর্ট পান না। এই গুঞ্জন কতটা সঠিক?
মুমিনুল: আসলে রেজাল্ট না হলে বাইরে থেকে মনে হবে দলের ভেতরে গ্রুপিং আছে। দলের ভেতরে উপদল আছে। তেমন কিছুই না। আমি বরাবরই সবার কাছ থেকে সমর্থন পাচ্ছি। তবে আমি চাই, বোলাররা ভালো বল করে, ব্যাটসম্যানরা রান করে এবং ফিল্ডিং ভালো দিয়ে সাপোর্ট করুক। অন্য সাপোর্ট আমার দরকার নেই। সবার কাছ থেকে ভালো ক্রিকেটটা চাই। যে সাপোর্ট দিলে ম্যাচ জিততে পারব, সেই সাপোর্ট চাই। বোলাররা পাঁচ-ছয়টি করে উইকেট নিলে ও ব্যাটসম্যানরা দেড়শ-দুইশ রান করলেই আমি খুশি।

বিষয় : ক্রিকেট টেস্ট অধিনায়ক মমিনুল হক

মন্তব্য করুন