একটু আগেই পদকের মঞ্চে দাঁড়িয়ে গলায় সোনার মেডেল পরে 'ভি' চিহ্ন দেখিয়ে উচ্ছ্বাস করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু নবম বাংলাদেশ গেমসে জিমন্যাস্টিকসের দুই ইভেন্টে স্বর্ণজয়ী রাজিব চাকমার মুখের সেই হাসিটা একটু পরই মিলিয়ে গেল। অন্য সবাই যখন ফোনে পরিবারের সঙ্গে পদক জয়ের অনুভূতি প্রকাশ করছেন, দূর থেকে বসে সেই দৃশ্য দেখছেন কোয়ান্টাম কসমো স্কুল অ্যান্ড কলেজের এ জিমন্যাস্টস। স্বর্ণ জেতা এ রাজিবের হৃদয়ে চলছে রক্তক্ষরণ। মনের মধ্যে লুকিয়ে আছে অজানা এক কষ্ট। যে কষ্ট চাইলেও কাউকে বলতে পারছেন না। কষ্টটা তার বাবাকে নিয়ে। যার ভালোবাসা পেয়ে জিমন্যাস্টিকসে নতুন স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই বাবার জন্য সব ভালোবাসা থাকার কথা ছিল রাজিবের। কিন্তু মা ও দুই ভাইকে রেখে বাবা সন্দ্বীপ চাকমা সংসারের মায়া ত্যাগ করে ধর্ম চর্চায় চলে যান বৌদ্ধ ভিক্ষুর কাছে। তাই বাবার প্রসঙ্গ উঠতেই রাজিবের চোখ দিয়ে ঝরতে থাকে পানি। কান্নায় বারবার কথা আটকে যাচ্ছিল রাজিবের। 'বাবাই ছিলেন আমাদের সংসারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। কিন্তু তিনি এখন সংসার থেকে আলাদা হয়ে গেছেন। উনি বৌদ্ধ ভিক্ষুর সঙ্গে আছেন। আমি জানি না, কেন তিনি এটা করেছেন। বাবার জন্য কষ্ট লাগে না, তবে বাবার আচরণে কষ্ট পাই। যেভাবে সবাই বাবাকে ভালোবাসে, আমি কিন্তু তাদের মতো না। আমার ভেতরে অনেক কষ্ট।'
অথচ এই রাজিবও অন্য সবার মতো ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে স্কুলে যেতেন। বান্দরবানের লামাইয়ে বেড়ে ওঠা রাজিবের কাছে সবার চেয়ে প্রিয় ছিলেন বাবা সন্দ্বীপ চাকমা। দুই ভাইয়ের সংসারে বাবা করতেন কবিরাজি। বড় ভাই মধুরঞ্জন চাকমাও করতেন পড়াশোনা। সংসারের দায়িত্বটা সামলাতেন মা আনন্দ মায়া। বান্দরবানের কোয়ান্টাম কসমো স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়া রাজিব চাকমা প্রেমে পড়ে যান জিমন্যাস্টিকসের প্রতি। অলিম্পিক ও আন্তর্জাতিক জিমন্যাস্টিকসের বিভিন্ন খেলা টেলিভিশনে দেখা রাজিবও সবচেয়ে মনমাতানো এই খেলার দিকে ঝুঁকে পড়েন। ২০১২ সালে কোয়ান্টাম স্কুলে জিমন্যাস্টিকসে নাম লেখা রাজিবের চোখে ছিল অনেক বড় স্বপ্ন। বাবা ছিলেন বলে আর্থিক টানাটানি ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করে বাবা সংসার ছেড়ে চলে যাওয়ায় এখন বড় ভাইকে সংসারের ঘানি টানতে হয়। গার্মেন্টসে চাকরি করে কোনোমতে সংসার চালান বড় ভাই। তবে বাংলাদেশ গেমসে সাফল্য পাওয়ায় ভবিষ্যতে রাজিবও চান ভাইয়ের মতো সংসারে সাহায্য করতে।
জিমন্যাস্টিকসে পোমেল্ড হর্স এবং প্যারালাল বারস ইভেন্টে স্বর্ণ জিতেছেন রাজিব। আরও জিতেছেন তিনটি রৌপ্য পদক। তবে শুরুটা ফ্লোর আর ভল্ডিং টেবিলে করেছিলেন রাজিব। কিন্তু ইনজুরির কারণে নিজের দুই প্রিয় ইভেন্টকে বিসর্জন দিতে হয়েছে তাকে। তার পরও প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ গেমসে অংশ নিয়ে স্বর্ণ জিতে তৃপ্ত রাজিব, 'নিজের প্রতি আমার বিশ্বাস ছিল যে পারব, অবশেষে পেরেছি। খুবই ভালো লাগছে।'

মন্তব্য করুন