টেস্ট ক্রিকেটের দেড়শ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৪১৮ রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড ওয়েস্ট ইন্ডিজের। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে করা সেই রেকর্ডের বয়সও হয়ে গেছে সতেরো বছর। বাংলাদেশকে জিততে হলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আরেকটি বিশ্বরেকর্ড গড়তে হবে মুমিনুলদের। চতুর্থ ইনিংসে করতে হবে ৪৩৭ রান। 

আপাতত অবাস্তব এই লক্ষ্য ছোঁয়ার স্বপ্ন মুমিনুলরা দেখছেন না। তারা লড়ছেন পরাজয়ের ব্যবধান কমাতে। চতুর্থ দিন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৫ উইকেটে ১৭৭ রান। লঙ্কানদের দেওয়া টার্গেট থেকে এখনও ২৬০ রানকে পিছিয়ে তারা। পরাজয় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ব্যবধান কত কমাতে পারে, সেটাই দেখার।

ট্রিপিক্যাল লঙ্কান উইকেটে হচ্ছে দ্বিতীয় টেস্ট। প্রথম দুই দিন ছিল ব্যাটসম্যানদের অনুকূলে। প্রথম দিন শেষে এক উইকেটে ২৯১ রানে ছিল তারা। দ্বিতীয় দিন রান তোলার গতি কমে এলেও উইকেট হারিয়েছে পাঁচটি। ৪৬৯ রানে থেকে দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষ করে তারা। বলার অপেক্ষা রাখে না, কন্ডিশনের সুবিধা ভালোভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে স্বাগতিকরা। সেখানে আরও ২৪ রান যোগ করে তৃতীয় দিন প্রথম ঘণ্টায় ৭ উইকেটে ৪৯৩ রানে ইনিংস ঘোষণা করে তারা। পিচ ততক্ষণে ভোজবাজির মতো বদলে গেছে। বাংলাদেশ প্রথম সেশনে কিছুটা লড়াই করতে পারলেও শেষ সেশনে অলআউট। তামিম ইকবাল যতক্ষণ ক্রিজে ছিলেন লড়াইটা জমেছিল ততক্ষণ। টাইগার ওপেনার ৯২ রানে উইকেট হারানোর পর মিছিল করে ড্রেসিংরুমে ফিরেছেন ব্যাটসম্যানরা। মুমিনুল, মুশফিক, লিটনদের কেউই পঞ্চশছোঁয়া রানে যেতে পানেনি। স্বাগতিক দুই স্পিনার প্রভিন জয়াবিক্রম ও রমেশ মেন্ডিস ধসিয়ে দেন টাইগার ইনিংস। বাঁহাতি তরুণ স্পিনার ৬ উইকেট নেন একা হাতে। বাংলাদেশকে ২৫১ রানে বেঁধে ফেলে ২৪২ রানের লিড নেয় শ্রীলঙ্কা। চাইলে ফলোঅন করে মুমিনুলদের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করাতে পারতেন করুনারত্নেরা। চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট করার ঝুঁকি এড়াতেই ফলোঅন না করে দ্বিতীয়বার ব্যাটিংয়ে নামে স্বাগতিকরা। পরিকল্পনায় দারুণ সফলও তারা।

পুরো ম্যাচেই বোলিং ভালো করেনি বাংলাদেশ। স্পিন উইকেটেও বল সেভাবে টার্ন করাতে পারেননি মিরাজরা। উপরন্তু একের পর এক ক্যাচ ফেলে প্রতিপক্ষকে বড় সংগ্রহ গড়ে তোলার পথ সহজ করে দিয়েছে। গতকাল প্রথম ঘণ্টার চ্যালেঞ্জ ছিল করুনারত্নেকে ফেরানো। সেখানেও ব্যর্থ বোলাররা। উল্টো ওয়ানডে স্টাইলে ব্যাট করে লিড বাড়িয়েছেন লঙ্কান অধিনায়ক। ৭৮ বলে ৬৬ রান তার। ডি সিলভা, নিশাঙ্কা ও ডিকওয়েলারাও খেলেছেন ওয়ানডে স্টাইলে। ৪২.২ ওভারে ১৯২ রানে ৯ উইকেটে দ্বিতীয় ইনিংসও ঘোষণা করে তারা। এই অস্বস্তির ভেতরেও বাঁহাতি স্পিনার তাইজুলের ছন্দে ফেরা বড় প্রাপ্তি। ১৯.২ ওভার বল করে ৭২ রানে ৫ উইকেট নেন তিনি। যদিও তাইজুলের পাঁচ উইকেট প্রাপ্তিতেও আনন্দ নেই।

বিশাল টার্গেটে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে তামিম ইকবাল বেশ ছন্দ দেখাচ্ছিলেন। চোখ ধাঁধানো কিছু শটও খেলেছেন তিনি। ২৬ বলে ২৪ রান হতেই বিপত্তি ঘটে। মেন্ডিসের বলে স্লিপে ক্যাচ হন তিনি। জুটি ভাঙার পর তামিমের ভূমিকা নিয়েছিলেন সাইফ হাসান। বাঁহাতি স্পিনার প্রভিনের বলেও বাউন্ডারি মারছিলেন তিনি। যদিও সাইফের ওভাবে ব্যাট খুশি হয়নি টিম ম্যানেজমেন্ট। নির্বাচক হাবিবুল বাশারের মতে, 'ও যেহেতু সেট হয়ে গিয়েছিল উচিত ছিল বড় ইনিংস খেলা। ধরে খেললে বোলাররা চাপে পড়লেও পড়তে পারত। সেটা করতে দেখালাম না।' সাইফ থেমেছেন ৩৪ রানে। মেন্ডিস আর প্রভিনকে শান্ত, মুমিনুল, মুশফিকও উইকেট দিয়েছেন। আলো স্বল্পতার কারণে চতুর্থ দিনের খেলা বন্ধ হওয়ার আগে লিটনের সঙ্গে ব্যাট করছিলেন মেহেদী মিরাজ। এই জুটির ওপরই পরাজয়ের ব্যবধান কমানোর দায়িত্ব। পঞ্চম দিনের পিচে স্পিনের বিপরীতে তারা কতক্ষণ ব্যাটিং করতে পারেন, সেটাও দেখার। যেভাবে উইকেট পড়ছে তাতে করে পঞ্চম দিন এক সেশন ব্যাট করাও কঠিন। তবুও চেষ্টা করতে হয়, লিটনরা নিশ্চয়ই শেষ চেষ্টাটুকু করে দেখবেন। তাতে করে ফল পরিবর্তন করা সম্ভব না হলেও হারের ব্যবধান তো কমবে।

বাংলাদেশ মূলত পিছিয়ে গেছে প্রথম ইনিংসে স্বাগতিকদের বিশাল স্কোরের বিপরীতে আড়াইশ রানে অলআউট হয়ে। টপঅর্ডার ব্যাটসম্যান নাজমুল হোসেন শান্ত গতকাল দলীয় প্রতিনিধি হয়ে সেটা স্বীকারও করে গেছেন। তবে দ্বিতীয় টেস্টে ভাগ্যের ছোঁয়াও ছিল না টাইগারদের। যখন থেকে পিচে স্পিন ধরেছে তখনই বোলিংয়ে এসেছে সিংহলিরা। বাংলাদেশ বোলিং করেছে প্রথম দুই দিন যখন ব্যাটিংয়ের জন্য ভালো ছিল উইকেট। পরের দুই দিন পিচ ছিল বোলারদের। আরও স্পষ্ট করলে স্পিনারদের অনুকূলে ছিল পিচ। পারফরম্যান্সের আয়নাতেও প্রতিফলিত হচ্ছে সে প্রতিচ্ছবি। বাস্তবতা হলো প্রতিপক্ষের ডেরায় গিয়ে প্রতিকূল কন্ডিশনে খেলেই জিততে হবে। যে কোনো কন্ডিশনে লড়াই করে জেতার মানসিকতাই যে নেই বাংলাদেশ দলে।

মন্তব্য করুন