আধুনিক অলিম্পিকের ইতিহাসে এ পর্যন্ত কতজন অলিম্পিয়ান শুধু জন্মগত প্রতিভার বদৌলতে স্বর্ণপদক জিতেছেন, এমন পরিসংখ্যানের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেনি। ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি অসম্ভব বিষয়। চ্যাম্পিয়ন তৈরি হয় আধুনিক অ্যাথলেট তৈরির কারখানায় বছরের পর বছর যত্নের সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম এবং অনুশীলনের মাধ্যমে। আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত কারখানায় থাকেন ক্রীড়াবিজ্ঞানী, আধুনিক কোচ, ট্রেনার, স্পোর্টস ফিজিওলজিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, ডাক্তার, ম্যাসিওর ডায়েটেশিয়ান, সাইকিয়াট্রিস্টসহ বিভিন্ন ধরনের বিশেষজ্ঞ। এরা একটি পূর্ণাঙ্গ টিম হিসেবে নির্ধারিত পথরেখার আওতায় পরিকল্পনামাফিক প্রগতিশীল প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। অ্যাথলেটদের নিয়ে চলে বিজ্ঞানীদের গবেষণা। তাদের ও পরিবারের সব দায়দায়িত্ব সরকার, ক্রীড়া সংস্থা এবং বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষকদের। এটা মুক্ত বিশ্বের দেশগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অন্যদিকে, সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর পুরোপুরি দায় সরকারের। এ ক্ষেত্রে অবশ্য সময়ের সঙ্গে কিছু পরিবর্তন লক্ষণীয়। চ্যাম্পিয়ন অ্যাথলেট তৈরির ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষকতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে নির্দিষ্ট নিয়মকানুনের মধ্যে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংগৃহীত কাঁচামাল (মানব প্রতিভা, যা অল্প বয়সে দেহবিজ্ঞানীরা নির্বাচিত করেন। খেলার বিভিন্ন ইভেন্টে ভিন্ন ভিন্নভাবে। এখানে মনগড়া বা আন্দাজ করে কিছু করার সুযোগ নেই), ক্রীড়াঙ্গনে জনকল্যাণমূলক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোতে ব্যক্তি বা সমষ্টির স্বার্থকে কখনও গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

কথা হচ্ছিল ২০০২ সালে সিউলে দক্ষিণ কোরিয়ার ক্রীড়া দেহবিজ্ঞানী এবং ক্রীড়া প্রশাসনিক কর্মকর্তা হং জং সুর সঙ্গে বুসানে এশিয়ান গেমস চলাকালে এক সন্ধ্যায়। কোনো দেশে ক্রীড়াঙ্গনের ভবিষ্যৎ পূর্বনির্ধারিত নয়। ভবিষ্যৎ পথরেখা তৈরি করার বিষয়। সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে তার কেবিনেটের সদস্যবৃন্দ, জাতীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলো, এনওসি (ন্যাশনাল অলিম্পিক কমিটি), বহুজাতিক করপোরেট হাউসগুলো এবং সাধারণ মানুষ উৎসাহ প্রদর্শনের পাশাপাশি ঐক্যবদ্ধভাবে সর্বাত্মক সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। সবাই অলিম্পিক পদক চেয়েছে। অলিম্পিকের পদকের মধ্যে লুকিয়ে আছে জাদু। কোন কোন খেলা নির্বাচিত করে এগোলে পদক জয়ের সম্ভাবনা বেশি, সেগুলো নির্ধারিত করে সরকারের সম্মতিতে খেলাধুলা নিয়ে কাজ করার দায়িত্ব হলো জাতীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোর। অ্যাথলেট নির্বাচন থেকে শুরু করে দেশে ও বিদেশে ভালো কোচের মাধ্যমে আধুনিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার দায়িত্বও ক্রীড়া সংস্থা এবং সরকারের। এ ক্ষেত্রে প্রচুর অর্থ প্রয়োজন। এ অর্থের জোগান নিশ্চিত করে সরকার। এখন প্রায় সব দেশেই সরকারের পাশাপাশি বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষকদের সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কোনো ছোট দেশ বাংলাদেশ থেকে অর্থনীতিতে অনেক পিছিয়ে থেকেও পদক জিতেছে, উল্লেখ করা হয়। তবে যিনি বা যারা পদক জিতেছেন দেশের হয়ে, তিনি বা তারা কোন পরিবেশে সুযোগ পেয়ে পদক জিতেছেন, সেটি আগে জানতে হবে।

সচেতনতার অভাবে অনেক সময় মনে করা হয়, ন্যাশনাল অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন উদ্যোগ নিলেই পদক জয় সম্ভব হতে পারে। এটি ভুল ধারণা। এটি কোনো দেশের এনওসির কাজ নয়। লক্ষ্য নির্ধারণ করে সঠিক পথরেখা অনুযায়ী কাজ করার দায়িত্ব হলো জাতীয় ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তাদের। এনওসির কাজ হলো ক্রীড়া সংস্থা এবং সরকারের মধ্যে সমন্বয় সাধন। দেশের বাইরে আইওসি এবং এনওসিগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনে যোগাযোগ রক্ষা। বিদেশে ভালো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, বিদেশ থেকে ভালো কোচ আনা- এসব কাজে জাতীয় সংস্থাগুলোকে সর্বাত্মক সাহায্য-সহযোগিতা করা। বিদেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিটে অংশগ্রহণ এবং ক্রীড়া দল পাঠানোর ক্ষেত্রে জাতীয় ক্রীড়া সংস্থা এবং সরকারকে সহযোগিতা করা। সব দেশের এনওসিগুলোতে তো জাতীয় খেলার সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরাই প্রতিনিধিত্ব করেন। অনেকে মনে করেন, অলিম্পিকে পদকের জন্য এনওসির উদ্যোগ নেওয়া উচিত। উদ্যোগ নিতে হবে খেলার জাতীয় সংস্থার কর্মকর্তাদের সম্মিলিতভাবে। আর এ ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাইয়ের পর সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সবচেয়ে বড় এবং প্রধান সহযোগিতা হলো বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হবে ক্রীড়াঙ্গনে।

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। বাংলাদেশ জনমিতির সুবিধা আর বেশি দিন পাবে না। ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশ জনমিতির সুবিধা লাভ করেছে। দেশের ক্রীড়াঙ্গন জনমিতির সে সুবিধা ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। এখনও সময় আছে তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর। কিছুদিন আগে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা আমাকে জানিয়েছেন, জাতীয় ক্রীড়া নীতি ২০২১ প্রণয়নের লক্ষ্যে ইতোপূর্বে প্রণীত জাতীয় ক্রীড়ানীতি ১৯৯৮ পর্যালোচনা এবং সময়োপযোগী পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংযোজনের নিমিত্তে গত ২২ আগস্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি তিন মাসের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে। অতীতে বেশ কয়েকবার এ ধরনের কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমাকে একটি কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। চার-পাঁচটি মিটিংয়ে যোগও দিয়েছি। সুপারিশগুলোর কী হয়েছে, তার হদিস আর পাইনি।

অলিম্পিকে দক্ষিণ কোরিয়ার পদক জয় নিয়ে গল্প করছিলেন হং জং সু। মস্কো অলিম্পিকে পদক নেই। ১৯৮৪ সালের লস অ্যাঞ্জেলেসে ছয় স্বর্ণপদক ও অন্যান্য পদক। এরপর ১৯৮৮ সালে সিউলে তো অসাধারণ নৈপুণ্য! হং বললেন, যত সহজে কথাগুলো বলে ফেললাম, আসলে বিষয়টি এত সহজ ছিল না। এর পেছনে বছরের পর বছর ধরে লোকচক্ষুর অন্তরালে এক দল সংগঠক আর অ্যাথলেটের অবদান সব সময় স্মরণীয়। ১৯৫২ সালের পর ৩২ বছর অলিম্পিকে অনুপস্থিত ছিল চীন। ১৯৮৪ সালে ফিরে এসে ১৫টি স্বর্ণপদকসহ ৩২টি মেডেল জয় করে। সেই চীন এখন অলিম্পিকে শীর্ষের লড়াইয়ে। ক্রীড়াঙ্গনে চীনের আর্থিক বিনিয়োগ চিন্তার বাইরে। গত কয়েক বছর ধরে ভারত সরকার অলিম্পিকে পদক জয়ের ক্ষেত্রে তাদের মনমানসিকতা পাল্টে ফেলেছে। তারা কেন পদক জয়ের জন্য গত কয়েক বছর ধরে এত বিনিয়োগ করেছে। ভারতে শাসক দলের রাজনীতিবিদরা চাচ্ছেন ভারতকে অনেক বেশি পদক আগামীতে জয় করতে হবে- দেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে উজ্জ্বল করার জন্য। এবার একটি স্বর্ণসহ সাতটি পদক ভারতের অর্জন। এ অর্জনের পেছনে আছে তাদের সরকারের প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ, সচেতনতা, আর তাদের জাতীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোর অবদান।

কলামিস্ট ও বিশ্নেষক