কিছু স্মৃতি থাকে অমলিন। ২০০৭ সালে প্রথম টি২০ বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানো তেমনই একটি স্মৃতি। প্রথম ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারাই। যখন ফিল্ডিং করছিলাম, ১৬ ওভার পর্যন্ত মনে হয়েছিল ১২০ থেকে ১৩০ রানে অলআউট করতে পারলে জিততে পারব। দুর্ভাগ্যবশত শেষ চার ওভারে প্রচুর রান দিয়ে ফেলি আমরা। আশরাফুল দুই ওভারে ৪৪ রান দেয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১৬৪ করে। টি২০ ক্রিকেট নতুন হওয়ায় ১৬৪ অনেক বড় রান মনে হচ্ছিল। স্বাভাবিকভাবেই ড্রেসিংরুমে সবার মন খারাপ ছিল। তামিম-নাজিম দ্রুত আউট হয়ে গেলে চাপে পড়ে যায় দল। আমার ও আশরাফুলের জুটি হওয়ায় ম্যাচ আমাদের হাতে চলে আসে। আশরাফুল দুর্দান্ত একটি ইনিংস খেলেছিল। ওর সে ইনিংস ভোলার নয়। সেদিন যেভাবে ব্যাটিং করছিল, অবিশ্বাস্য। দু-তিনটা ছয় মারার পর আমি ওকে বলেছিলাম- 'হয়েছে, এখন একটু উইকেটে থাক। ও বলে, না আজ ব্যাটে লাগতেছে, হয়ে যাবে। আমি বললাম, ঠিক আছে তুই তোর মতো খেল।' আমি সাপোর্ট দিয়েছি, ও খেলেছে। ২৭ কি ২৮ বলে ৬১ রান করেছিল আশরাফুল। আমি ৪৯ বলে করি ৬২ রান। একশ প্লাস (১০৯) রানের জুটি ছিল। হারা ম্যাচ আমরা ৬ উইকেটে জিতে যাই। টুর্নামেন্টে আমরা খুব ভালো খেলছিলাম। আরও কিছু ম্যাচ জিততে পারতাম। ছোট ছোট কিছু ভুলের কারণে হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ভালো একটা ইনিংস ছিল আমার। আর একটি দুটি ম্যাচ জিততে পারলে ভালো হতো। দুর্ভাগ্যবশত সেটা হয়নি।

টি২০ যখন শুরু হলো, বিশ্বব্যাপী সবাই মনে করেছিল এটা বাংলাদেশের সংস্করণ। যেহেতু আমাদের ব্যাটাররা শট খেলতে পছন্দ করে, সে কারণে ধারাভাষ্যেও এ ধরনের কথা বলতে শুনেছি। আসলে সবাই মনে করেছিল এই সংস্করণটা অনেক সহজ। বাস্তবে এটা অতটা সহজ নয়। ওয়ানডেতে যখন একজন ব্যাটার ১৫ ওভারে নামে, তার হাতে তখনও ৩৫ ওভার থাকে। সে নিজের মতো করে ইনিংস গড়ে তুলতে পারে। এই সংস্করণে একজন ওপেনার ৬ ওভার খেলে দিলে ১৪ ওভার থাকে। ১০ ওভার হয়ে গেলে একটা বলও ডট করলে দলের ক্ষতি। অথচ মালিঙ্গা, মুরালিধরনের মতো বোলারকে নেমেই কোনো ব্যাটারের পক্ষে মেরে খেলা সহজ ব্যাপার নয়। ওই জায়গায় আমরা এখনও অতটুকু স্মার্ট হতে পারিনি। আমরা উইকেটে গিয়েই শট খেলতে পারি না। একটু সময় লাগে। সে জন্য আমরা এই সংস্করণে এখনও পিছিয়ে আছি। কারণ, আমাদের পাওয়ার হিটার নেই। ক্রিজে গিয়েই চার-ছক্কা মারার মনমানসিকতাও তৈরি হয়নি। টি২০ ম্যাচ জিততে হলে পাওয়ার হিটার লাগবে। ব্যাটারদের টেকনিক্যালি সাউন্ড হতে হয়। আমাদের দলে এমন কোনো ব্যাটার নেই যে, ১৫ ওভারের পর ৩০ বলে ৬০ করবে। মিডল ওভারে হিট করার মতো খেলোয়াড়ের অভাব আছে। আমরা একটা জায়গায় দলকে রেখে এসেছি। এই ১৩-১৪ বছরে আরও উন্নতি করা উচিত ছিল। আমরা বাংলাদেশকে ওপরের দিকে দেখতে চাই। তবে ফ্যাক্ট হলো, পাওয়ার হিটার বা ম্যাচ উইনার বোলারের অভাব আছে। বিপিএলের মানটা আরও বাড়লে হয়তো বা ভালো কিছু খেলোয়াড় আসবে। বিপিএলে দেখেন বিদেশি খেলোয়াড়রাই শেষের দিকে মেরে খেলে। ওপরের দিকেও কিছু বিদেশি খেলে দেয়। বাংলাদেশে খুব কম সংখ্যক খেলোয়াড় আছে, যারা শেষ পর্যন্ত খেলে অনেক ম্যাচ জিতিয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায়, আমরা ওই জায়গায় পিছিয়ে আছি।

হ্যাঁ, বলতে পারেন ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা তো আমাদেরই মতো। তারা টি২০ বিশ্বকাপও জিতেছে। তাহলে আমরা কেন পারছি না? ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামো তাদের এগিয়ে দিয়েছে। আইপিএল ভারতকে অনেক ওপরে নিয়ে গেছে। আমাদের জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা ঘরোয়া লিগে না খেললে হাতেগোনা অল্প কয়েকজন আছে, যাদের কাউন্ট করতে পারবেন। ঘরোয়া লিগে খেলে ক'জন খেলোয়াড়কে মানুষ চেনে। বিশ্বকাপে ভালো করতে হলে বা বিশ্বমানের ক্রিকেটার পেতে চাইলে আমাদের ক্রিকেট কাঠামো অনেক ভালো করতে হবে। আমাদের খেলোয়াড়ের সংখ্যা বেড়েছে; কিন্তু মান বাড়েনি। আমি কাউকে চোট করছি না- কিন্তু বাস্তবতা হলো, টি২০-এর জন্য যে কোয়ালিটি খেলোয়াড় লাগবে। তাই এই বিশ্বকাপে খুব বেশি প্রত্যাশা করব না। কারণ, যাদের সঙ্গে আমাদের খেলা, ম্যাচ অত সহজ হবে না। বিশ্বকাপের আগে আমরা তিনটি সিরিজ জিতেছি, তার জন্য অভিনন্দন। তবে বিশ্বকাপের প্রস্তুতির কথা বলা হলে আদৌ সে রকম প্রস্তুতি হয়েছে? আমি নিশ্চিত, ওমানে ১৮০-১৯০ রানের উইকেট হবে। আমি দুবাই-আবুধাবিতে খেলে এলাম, ওখানে দেখেছি উইকেট খুবই ফ্ল্যাট থাকে। দুই-তিন ওভারেই ৪০-৪৫ রান হয়। ১৮০ বা ১৯০ রান চেজ করতে হলে আমাদের বড় রান করার ব্যাটার লাগবে। আমরা দেশে যে ১০টি টি২০ ম্যাচ খেলেছি, সেখানে ক'জন ব্যাটার বড় ইনিংস খেলেছে, কেউ না। ব্যাটারের রান করার আত্মবিশ্বাস থাকলেই না ব্যাটিং উইকেটে বড় রান করতে পারবে। এটা নিয়ে আমি একটু চিন্তিত। তবে একটা প্লাস পয়েন্ট আছে, আমরা সিরিজ জিতেছি অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে। সেই আত্মবিশ্বাসটা থাকলে ভালো করলেও করতে পারে। সাকিব ও মুস্তাফিজ যেহেতু আইপিএল খেলছে, এ দু'জনের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করব। তারা তারকা ক্রিকেটারের মতো করেই খেলে ম্যাচ জেতাবে, সেই প্রত্যাশা রেখে শেষ করছি।