ক্রিকেট সাংবাদিকদের বেশিরভাগ সময় কাটে মাঠে ও প্রেসবক্সে। টি২০ বিশ্বকাপ হোক বা ওয়ানডে, সাংবাদিকদের ব্যস্ততার শেষ নেই। অনুশীলন দেখা, সংবাদ সম্মেলন কাভার করে রিপোর্ট তৈরি করতে গিয়ে কখন যে দিন ফুরোয়, খেয়ালই থাকে না। বিদেশে সিরিজ বা টুর্নামেন্ট কাভার করতে এলে তাই বেড়ানোর সময় খুব একটা মেলে না। বুধবার ঈদে মিলাদুন্নবীর ছুটি থাকায় মাসকট শহর ঘুরে দেখার জন্য কিছুটা সময় ছিল। সকাল ১০টায় কভিড টেস্ট দিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম দর্শনীয় স্থানগুলো দেখার জন্য। পায়ে চাকা লাগিয়ে রাত ৩টা পর্যন্ত পাহাড়, সমুদ্র, রাজবাড়ি, পুরোনো ও নতুন স্থাপত্য দেখে এবং চেখে নেই। ভ্রমণপিপাসু মনের তৃষ্ণা না মিটলেও অভুক্ত তো থাকতে হলো না। কোনো কিছু না দেখে দুবাই গেলে আফসোস থেকে যেত। সেটা অন্তত থাকছে না।

মাসকটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান বলা হয় পাহাড় ও সমুদ্রের সঙ্গমস্থল মাত্রাকে। শহরের বাণিজ্যিক এলাকা রুয়ি থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটারের দূরত্ব। প্রশস্ত রাস্তা ধরে মাত্রায় ট্যাক্সিতে যেতে সময় লাগে ১৫ থেকে ২০ মিনিট। জ্যামের যন্ত্রণা নেই। বুধবার ঢাকা থেকে আসা কয়েকজন মাত্রা দর্শনে গিয়ে রোমাঞ্চিত হলাম। সুলতান কাবুজ বিন সাঈদ আল সাঈদের প্রাসাদ মাত্রায়। ৫০ বছর আগে প্রয়াত এ সুলতানের অভিষেক হয়েছিল পুরোনো প্রাসাদে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেখানেই থেকে গেছেন। ওমানের খুব জনপ্রিয় সুলতান ছিলেন তিনি। সালতানাতের মানুষ তাকে বাবা বলে সম্বোধন করতেন। নির্মোহ কাবুজ দেশের উন্নয়নে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করে গেছেন। কাবুজ এতটাই সম্মানিত ছিলেন যে, বর্তমান প্রজন্মের কাছেও তিনি পিতা। অনেকটা জাতির পিতার মতোই সম্মান দেওয়া হয় তাকে। ২০২০ সালে বার্ধক্যজনিত কারণে কাবুজ মারা গেলে সালতানাতের মসনদের উত্তরাধিকারী হন তার চাচাতো ভাই হাইথাম বিন তারিক আল সাঈদ। 

মাত্রার রাজবাড়ির সমনে দাঁড়ালে স্থাপত্যশৈলী দেখে মন ভরে যাবে। মাত্রার পাহাড়ি সৈকত পাথরে বাঁধানো। পুরোনো পোতাশ্রয়কে গড়ে তোলা হয়েছে জাদুঘর হিসেবে। সুলতান কাবুজ ও সাঈদ নামে দুটি বিশাল জাহাজ প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে। সিডনি হারপারের বিলাসবহুল ক্রুজের মতো সুলতান কাবুজ জাহাজটি। পোতাশ্রয়ের তিন পাশ ঘিরে গড়ে উঠেছে বিপণিবিতান। ঐতিহ্যবাহী পোশাক, জাহাজের নানা সামগ্রী, পুরোনো মুদ্রা, ছুরি-চাকু, ছড়ি, রুপা, স্বর্ণ সবকিছু পাওয়া যায় দোকানগুলোতে। সমুদ্রের পাড় ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলে দুটি বড় পার্ক পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। তবে মাত্রায় বেশি ভালো লাগবে বিকেলে সূর্যাস্তের সময়। এ সময় ক্ষণে ক্ষণে পাহাড়ের রঙ বদলায়। পাহাড়ের সঙ্গে সমুদ্রের নীল জলেও আসে পরিবর্তন।

মাসকট ভিউ পয়েন্ট বেশ দূরের পথ। শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে রাতের আলোকিত মাসকট দেখা যায় ভিউ পয়েন্ট থেকে। ট্যাক্সিতে গেলে ২৫ মিনিট লাগে। রাত দেড়টায় মাসকট ভিউ পয়েন্টে দাঁড়ানোর সৌভাগ্য হয়েছিল। পাহাড়ের দু'দিকে আলোর মিছিল। চোখে লেগে রয়েছে আলোর সৌন্দর্য। মাসকটে এসে সুলতান গ্র্যান্ড মস্কে না গেলে সফর অপূর্ণই থেকে যায়। গতকাল সকালে ওমানের এই গ্র্যান্ড মস্কে গিয়ে চোখ ছানাবড়া। শুধু মসজিদের নকশা, দেয়ালের কারুকাজ, লনের বাগানের চেয়ে বেশি সুন্দর মসজিদের ভেতরে মুসলিম, অমুসলিম, নারী-পুরুষ সবাইকে একসঙ্গে মসজিদের ভেতরে ঘুরতে দেখার দৃশ্য। সকাল ৮টা থেকে সকাল ১১টা পর্যন্ত প্রদর্শনীর জন্য খোলা থাকে। জুতা পায়ে পুরো মসজিদ ঘোরা যায়। যেখানে খুশি ছবি তোলার সুযোগ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। ১১টার পর থেকে নামাজের জন্য প্রস্তুত করা হয় মসজিদ। মুসলমান হলে নামাজের জন্য যে কোনো সময় যেতে পারে। শুক্রবার ১০ হাজার নারী-পুরুষ জুমার নামাজ আদায় করেন সুলতান গ্র্যান্ড মস্কে। 

সমুদ্রের দেশ ওমানে সৈকতের অভাব নেই। গতকাল কুরুম সৈকতে ২০ মিনিট কাটানোর সৌভাগ্য হয়। দু'চোখ ভরে দেখে, মন জুড়িয়ে শেষ করতে হচ্ছে ওমান পর্ব। আজ সকালে টি২০ বিশ্বকাপের সুপার টুয়েলভের ম্যাচ কাভার করতে যেতে হবে আরব আমিরাতের দুবাইয়ে। পাহাড়ের মায়া কাটিয়ে তপ্ত মরুতে ছোটাছুটি করতে হবে শারজাহ, আবুধাবি-দুবাই ক্রিকেট স্টেডিয়ামে।