ক্রিকেটের বিশাল কমপ্লেক্সে পাশাপাশি দুটি মাঠ। পাহাড়ের পাদদেশে সবুজের সমারোহ। ঘাসের গালিচায় মখমলের আরাম। কমপ্লেক্সটির নাম আল আমেরাত ক্রিকেট একাডেমি। ওমানের এই ভেন্যুতে সদ্যই শেষ হলো টি২০ বিশ্বকাপের প্রথম পর্বের 'বি' গ্রুপের খেলা। বাংলাদেশ, স্কটল্যান্ড, ওমান ও পাপুয়া নিউগিনির খেলা ছিল ওমানে। বিশ্বকাপ দিয়েই আল আমেরাত ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পরিচিতি ছড়িয়েছে বিশ্বজুড়ে। বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপের প্রথম পর্বের তিনটি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশিদের হাতে গড়া মাঠে। পাথরের বুকে ফুল ফুটিয়েছেন ১৫ জন বাংলাদেশি। বিশ্বকাপ ভেন্যুর মাঠকর্মী তারা। ওমান ক্রিকেট মাঠের শিল্পীও।

নিজ চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না কত শত দিনে, কত শ্রম আর ঘাম ঝরিয়ে নিপুণ হাতে গড়ে উঠেছে আল আমেরাত ক্রিকেট একাডেমি। বারমুডা ঘাসগুলো শিকড় বিস্তার করে সতেজ হয়ে উঠেছে যত্নের ছোঁয়ায়। ভারতীয় কিউরেটরের অধীনে কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে দিনের শেষ পর্যন্ত মাঠের যত্ন-আত্তি করেন ১৯ জন মাঠকর্মী, যেখানে তিনজন ভারতীয়, বাকিরা বাংলাদেশের। ওমানের এ ক্রিকেট মাঠের ভিত্তিও হয়েছিল একজন বাঙালির হাতে। ২০১২ সালে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সৈয়দ আশরাফুল হক ওমানের আধুনিক ক্রিকেট মাঠের সূচনা পর্বে জড়িত ছিলেন। ঠিক তখন থেকেই মাঠের কাজে বাংলাদেশিদের সম্পৃক্ততা। শুরুর সবাই না থাকলেও বেশিরভাগই অভিজ্ঞ মাঠকর্মী। এই দলের সবচেয়ে পুরোনো সদস্য সুমন মিয়া ও মো. রাজিব। অনেক চেষ্টার পর এ দু'জনের নাম ও পরিচয় জানা গেছে। অন্য ১৩ জনের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ মেলেনি। খুব কাছে দাঁড়িয়ে থাকলেও কথা বলা বারণ। ওমান ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের কড়া নির্দেশ বাইরের কারও সঙ্গে মাঠকর্মীরা কথা বলতে পারবে না। বাংলাদেশ দলের কাছাকাছি ভিড়তে দেওয়া হয়নি তাদের। কেবল স্বাগতিক দলের চাওয়া পূরণ করার অনুমতি ছিল। এর ব্যত্যয় ঘটলেই চাকরি থেকে পত্রপাঠ বিদায়। অনেক চেষ্টার পর সুমন মিয়াকে অনুমতি দেওয়া হয় মিনিটখানেক কথা বলার জন্য। চটপটে ছেলেটি এক নিঃশ্বাসে বলে গেলেন, 'আমরা ১৯ জন গ্রাউন্ডসম্যান কাজ করি। ১৫ জন আছি দেশের। আমি পাঁচ বছর ধরে এই মাঠে। বাকিরাও অনেক দিন ধরে কাজ করছে। যে মাঠ দুটি দেখছেন আমরা বানিয়েছি। প্রধান কিউরেটর ভারতের হলেও সবাই একটা পরিবার। সারাদিন কাজ করি, থাকি স্টেডিয়ামের পাশে।' এটুকু বলে হাসিমুখে বিদায় নেন সুমন। সহকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়ার দায়িত্ব পড়েছে তার কাঁধে। কাজের বাইরে অপচয় করার মতো সময় নেই হাতে।

মাঠকর্মীদের আবাস স্টেডিয়ামের পাশেই। পরিবেশ বেশ ভালো। পাহাড়ি শহরে সবুজ ফলিয়ে, সবুজে বাঁচেন তারা। সীমিত সুযোগ-সুবিধার ভেতরেও দিন শেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। ওমানে তারা শুধু প্রবাসী কর্মীই নন, ক্রিকেট মাঠের শিল্পী ও কলাকুশলী। মাঠকর্মীরা আড়ালে থাকলেও ক্রিকেটের প্রাণ। তারাই ভালো পিচ গড়ে তোলেন, সুন্দর আউটফিল্ড দেন ক্রিকেটারদের জন্য। ওমান প্রবাসী মাঠকর্মীদের কাজের স্বীকৃতি দিয়েছে টি২০ বিশ্বকাপ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছ থেকে ধন্যবাদ পেয়েছেন সুমন মিয়ারা। মিডিয়ার কল্যাণে দেশেও পরিচিতি পেয়েছেন। মাঠের পেরিমিটার বোর্ডের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রাজিবের সঙ্গে সামান্য কথা বলারও সুযোগ হয়। ইতিউতি দেখে নিয়ে অভিজ্ঞ এ মাঠকর্মী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, 'এত বছর ধরে আমরা যে পরিশ্রম করে মাঠ বানিয়েছি বিশ্বকাপের খেলা হওয়ায় তা সার্থক। সাকিব ভাইদের সামনে তো আমরা যেতে পারতাম না। মাঠের কাজ করায় তাদের দেখতে পেলাম। ওমানে আরও ক্রিকেট মাঠ হবে, আরও অনেক বাংলাদেশি কাজ পাবে।'

বিশ্বকাপ উপলক্ষে মাঠকর্মীদের নতুন পোশাক দেওয়া হয়েছে। টি২০ বিশ্বকাপে তারাও একটি দল। একই রঙের গেঞ্জি ও ট্রাউজার পরে মাঠের কাজ করতে হয় সুমনদের। কখনও ঘাসের বিচালি বাছা, পিচ রোল করা, বাউন্ডারি লাইনের দড়ি ঠিক করা, মেশিনে ঘাস ছাঁটার কাজে গত কিছুদিন খুব ব্যস্ততায় গেছে আল আমেরাত স্টেডিয়ামের মাঠকর্মীদের। বায়োসিকিউর বাবলের নিয়ম থাকায় কমপ্লেক্সের বাইরে যাওয়া হয়নি অনেক দিন। তাতে অবশ্য কারও আফসোস নেই। তাদের যত্নে গড়া মাঠে প্রিয় বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলেছে এতেই খুশি। ওরা ১৫ জন ভালো থাকলে, ভালো থাকবে ১৫টি পরিবার। তারা ভালো কাজ করলে সম্মান বাড়বে বাংলাদেশের।