মনে হয়, সেদিনই তো ম্যারাডোনাকে দেখলাম। অথচ একটা বছর পেরিয়ে গেল, তিনি নেই। হঠাৎ চলে গেলেন। এভাবে ৬০ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমাবেন, সেটাও ভাবিনি। কিন্তু এটাই সত্য, বাস্তবতা। যেটা না মানার সাধ্য কারও নেই। আসলে এই ধরায় ফুটবল যত দিন থাকবে, ম্যারাডোনাও থাকবেন মানুষের হৃদয়ে।
২৫ নভেম্বর দিনটি এলে হয়তো বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠবে ম্যারাডোনার জন্য। তার স্মৃতি আঁকড়েই এগিয়ে যাবে ফুটবল প্রজন্মগুলো। যার ফুটবলে ছিল মায়াবী জাদু, বৈচিত্র্য, তাকে যে ভোলা যায় না।
জানি না, এখনকার খেলোয়াড়রা এসব ইতিহাস পড়েন কিনা, তাদের আগ্রহে এসব আছে কিনা। আমি একটা উদাহরণ দিই, পেলের একটা অটোবায়োগ্রাফি আমি পড়তে বসে আর উঠতেই পারিনি। নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে এক নিঃশ্বাসে পুরো বইটা শেষ করি। এতটা সুন্দর আর গোছানো কথাগুলো, পড়তে বিন্দুমাত্র একঘেয়ে লাগেনি। ম্যারাডোনাও একই মাপের। তিনি কিংবদন্তি, তিনি ফুটবল ঈশ্বর, তিনি জাদুকর।
'৮৬-এর বিশ্বকাপে যারা ম্যারাডোনার খেলা দেখেছে, এরপর তারা তাকে ফলো করেছে। '৯৪ সাল পর্যন্ত যারা তাকে মাঠে দেখেছে, তাদের তো ভোলার কোনো কারণ নেই। আসলে তিনি অপ্রত্যাশিত এমন কিছু করেছেন, যেটা তাকে কখনোই ভুলতে দেবে না।
অনেকে বলেন, ম্যারাডোনা একাই জেতাতে পারে। আমি বলব, এটা ভুল। কেউ একা জেতাতে পারে না। এটা ঠিক, যে কোনো ম্যাচে ম্যারাডোনার প্রভাব, তার ভূমিকা, তার দাপট ছিল অকল্পনীয়। যখন তিনি আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নামতেন কিংবা তার ক্লাবের হয়ে খেলতেন, তখন এমন কিছু করতেন যেটা সবাইকে মুগ্ধ করে ছাড়ত। ন্যাপোলির কথাই বলি, কীভাবে এই ক্লাবটাকে তিনি এতদূর নিয়ে গেলেন। তারাও কিন্তু ভুলবেন না ম্যারাডোনাকে। চলে যাওয়ার পরও যুগ যুগ ধরে নেপলসের মানুষ পাগলের মতো এই কিংবদন্তিকে স্মরণ করছে। আজও করছে, আগামীতেও করবে। তিনি যে স্মরণ করার মতো কীর্তি রেখে গেছেন।
ম্যারাডোনা সবার থেকে আলাদা। তাকে আপনি কারও সঙ্গে মেলাতে পারবেন না। তার ব্যক্তিজীবন, খেলোয়াড়ি জীবন বা কোচিং জগৎ সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। এ ব্যাপারগুলো অস্বীকার করার জো নেই। হ্যাঁ, তিনি বিতর্কে জড়িয়েছেন ঠিক; কিন্তু তার ফুটবলশৈলী কোটি মানুষকে রোমাঞ্চিতও করেছে। দেখুন, ম্যারাডোনাকে নিয়ে আলোচনা হবে না তো কাকে নিয়ে হবে? তার সময়ে যারা খেলেছে, তাদের কারও কীর্তি নিয়ে কথা হয়! হবে কী করে। ম্যারাডোনাকে নিয়ে কথা বলার একশ একটা কারণ আছে। কারণ, তিনি আলোচনায় আসার মতোই একজন। সে সময় তার ওপরই ছিল সব ফোকাস। মানুষ যেমন তার ভালো দিক দেখে উৎফুল্ল হয়েছে; তার যে বিষয়গুলো পছন্দ হয়নি, সেটা নিয়ে কিছু কথাও বলেছে। আরেকটা কারণও আছে, তিনি রাজনৈতিকভাবেও একটু বামঘেঁষা ছিলেন। তাই কিছু জিনিস মানুষ পছন্দ করত না। আর সাংবাদিকরাও সেসব নিয়ে একটু বেশি খোঁচা দিত। এসবের বাইরে আমি বলব, ম্যারাডোনার ফুটবল দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ নেই, এটা নিয়ে সন্দেহ করারও কোনো উপায় নেই। যত দিন ফুটবল থাকবে, তার ফুটবল কারিকুরি নিয়ে প্রশংসা করতেই হবে, তার নাম উচ্চারণ করতে হবে।
আরেকটা বিষয় প্রায়ই শুনি, পেলে আর ম্যারাডোনাকে নিয়ে তুলনা। আসলে তাদের কারও সঙ্গে কারও তুলনা চলে না। দু'জনই পুরোপুরি ভিন্ন। পেলের একটা সময় গেছে। ম্যারাডোনার আরেকটা সময়। আমাদের যেমন আশরাফ-কবির-মানিক, তারপর এনায়েত, সালাউদ্দিনরা খেলল। পেলে যেমন তার সময় শ্রেষ্ঠ ছিল, ম্যারাডোনা তার সময়ে শ্রেষ্ঠ। এখন আবার মেসি-রোনালদোর যুগ প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। তারা দু'জন ক্লাব পরিবর্তন করেছে। তাদের থেকে ভালো কিছু পেলে ভালো। কিন্তু আমার মনে হয়, তাদের থেকে ভালো কিছু আশা করা আর উচিত হবে না।
ম্যারাডোনার খেলা আমি লাইভ দেখেছি। '৮৬-এ লাইভ দেখেছি, তারপরও দেখছি। '৮২-এর খেলাও কিছুটা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। পেলের '৭০-এর বিশ্বকাপের কিছু খেলা পরিস্কার বোঝা গেছে। এর আগে '৫৮, '৬২-এর খেলা লাইভ দেখিনি, তবে রেকর্ড করা ফুটেজগুলো দেখেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে, দু'জনই দুই মেরুর। পেলে এক টাইপের, ম্যারাডোনা আরেক টাইপের। দু'জন দুই রকমের। পেলে অবধারিত ছিল ব্রাজিলের জন্য, ম্যারাডোনা অবধারিত ছিল আর্জেন্টিনার জন্য। দু'জনই মাঠে অপ্রত্যাশিত, অবিশ্বাস্য এমন কিছু ক্যারিশমা দেখিয়েছে। যেটা ইতিহাসের পাতায় থাকবে। আসলে এই দক্ষতা সৃষ্টিকর্তাই তাদের দিয়েছে। পুরোপুরি ঐশ্বরিক একটা ব্যাপার।
আজ ম্যারাডোনা নেই। আমার মনে হয়, তিনি আছেন, তবে সেটা তার কীর্তির মধ্য দিয়ে। যদি আরও কিছুদিন থাকতেন, যদি মেসির হাতের ট্রফিটা দেখে যেতে পারতেন, ভালোই হতো। যাক, এখন আর আক্ষেপ করে কী হবে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম।