শাহরুখ খান সেই কবে কলকাতা নাইট রাইডার্সের স্বত্ব কিনেছেন, তার মালিকানা আজও ধরে রেখেছেন। মুকেশ আম্বানি বা প্রীতি জিনতারাও হারিয়ে যাননি, মুম্বাই, পাঞ্জাবও আইপিএলে খেলছে নিয়মিত। অথচ গত ১০ বছরে বিপিএলকে প্রাতিষ্ঠানিক একটা কাঠামোতে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়নি। পুরোনো কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজির নাম জানতে সার্চ দিতে হয় গুগলে। মালিকানা বদল, চুক্তি বাতিলের মতো ঘটনা নিয়মিত ঘটনা বিপিএলে। ফ্র্যাঞ্চাইজিদের দীর্ঘ মেয়াদে রেখে দেওয়ার চেষ্টা সেভাবে ছিল না বিসিবির দিক থেকেও। এখন তো বিশেষ বিপিএলের নামে ফ্র্যাঞ্চাইজি খোঁজা হয় এক বছরের জন্য। যে কারণে বেক্সিমকো, জেমকন এবং বসুন্ধরার মতো প্রতিষ্ঠিত শিল্প গ্রুপ বিপিএলে ফ্র্যাঞ্চাইজি হতে অনাগ্রহী। ২০২২ সালের বিপিএলে ফ্র্যাঞ্চাইজি হতে আগ্রহ দেখায়নি তারা। 

গতকাল বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন স্বীকার করলেন, এক বছরের জন্য বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ফ্র্যাঞ্চাইজি স্বত্ব কিনতে চায় না। স্লট, সম্মানী এবং অনিয়মিত হওয়ায় বিপিএলের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন বিদেশি ক্রিকেটাররাও। দেশের একমাত্র এই টি২০ টুর্নামেন্টের ব্যবস্থাপনা দেখে যে কারও মনে হতে পারে বিপিএল বিসিবির সৎ ছেলে। সুশৃঙ্খলভাবে তাকে বেড়ে উঠতে দেওয়া যাবে না।

বঙ্গবন্ধু বিপিএল ২০২২ আসরের জন্য ফ্র্যাঞ্চাইজি চেয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া হলে রোববার শেষ দিন পর্যন্ত ছয়টি দলের জন্য আটটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে আবেদন জমা পড়েছে বলে জানান বিসিবি সভাপতি পাপন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স ছাড়া সবই নতুন। ফরচুন বরিশাল বঙ্গবন্ধু টি২০ কাপে খেললেও বিপিএলে নতুন। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা খতিয়ে দেখার পর চূড়ান্ত করা হবে ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজি। পরের বছর বিপিএল হলে আবার নতুন করে বিজ্ঞাপন দিতে হবে ফ্র্যাঞ্চাইজি চেয়ে। এতে করে দেশের একমাত্র টি২০ টুর্নামেন্টটি দিন দিন জৌলুস হারাচ্ছে। 

এ বছর বিপিএলের স্লট ঠিক করা হয়েছে ২০২২ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে। একই সময়ে পাকিস্তান প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগ (পিএসএল) এবং আমিরাত প্রিমিয়ার লিগ (এপিএল) চলবে। আমিরাত প্রিমিয়ার লিগে দল কিনেছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। আরব সাগরের দুই পাড়ে এ দুই দেশের টি২০ লিগে খেলার জন্য বিদেশি ক্রিকেটাররা বেশি আগ্রহী। সম্মানী ও খেলার মানের কারণে পিএসএল পেছনে ফেলেছে বিপিএলকে। 

বিপিএলের একাধিক পুরনো ফ্র্যাঞ্চাইজির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা শঙ্কা করছেন একসঙ্গে তিনটি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ চললে বিপিএলে বড় তারকা ক্রিকেটার খেলতে রাজি হবেন না। এক লাখ ডলারে ডোয়াইন ব্রাভোদের পাওয়া যাবে না। পাকিস্তানি ক্রিকেটাররাও পুরো টুর্নামেন্টের জন্য ছাড়পত্র পাবেন না। আগামী ২৭ জানুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি হবে পিএসএল। এতে করে দ্বিতীয় সারির ক্রিকেটার নিয়ে খেলতে হতে পারে বিপিএল। এ সময়ে আন্তর্জাতিক সিরিজও খেলবে বেশ ক'টি দেশ। সব মিলিয়ে বঙ্গবন্ধু বিপিএলে মানসম্পন্ন ক্রিকেটার পাওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে। 

বেক্সিমকো, বসুন্ধরা বা জেমকন গ্রুপ থাকলে বেশি টাকা খরচ করে খেলোয়াড় আনত। নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজিদের পক্ষে সেটা সম্ভব নাও হতে পারে। বড় কোম্পানিগুলো না থাকার কারণ জানতে চাওয়া হলে বিসিবি সভাপতি বলেন, 'তারা চায় দীর্ঘ মেয়াদে চুক্তি করতে। দীর্ঘ মেয়াদে হলে একটা পরিকল্পনা করে নামতে পারে। সে কারণেই হয়তো এবার আগ্রহ দেখায়নি।'

দীর্ঘ মেয়াদে ফ্র্যাঞ্চাইজি চুক্তি না করার কারণ জানতে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব ইসমাইল হায়দার মল্লিকের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, বিসিবি থেকে দীর্ঘ মেয়াদে চুক্তি করার সিদ্ধান্ত হলে সেভাবে কাজ করবেন তারা। বিসিবির সাবেক সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০১২ সালে নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে চালু করেন বিপিএল। প্রথম আসরেই সেমিফাইনালের দল নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি। গঠনতন্ত্র উপেক্ষা করে চট্টগ্রামের পরিবর্তে বরিশালকে সেমিফাইনাল খেলার সুযোগ দেওয়া হয়। ব্যাপক সংস্কারের পর দ্বিতীয় আসর মাঠে গড়ালেও ফিক্সিংয়ের মতো ঘটনায় কলঙ্কিত হয় টুর্নামেন্ট। ফিক্সিং তদন্তের কারণে পরের বছর স্থগিত রাখা হয় বিপিএল। এর পরও দুই চুক্তিতে টানা পাঁচ আসর খেলা হলেও করোনার কারণে ২০২০-২০২১ সালে টুর্নামেন্ট হয়নি। ১০ বছরে তাই অষ্টম টুর্নামেন্ট হবে আগামী বছর। অথচ গত বছর আইপিএলে ফ্র্যাঞ্চাইজিদের সঙ্গে ১০ বছরের চুক্তি করা হয়েছে। সিপিএলেও দীর্ঘ মেয়াদে ফ্র্যাঞ্চাইজি চুক্তি। পিএসএলে আট বছরের চুক্তি থাকলেও আর্থিক লেনদেন অনিয়মিত হওয়ায় নতুন করে ফ্র্যাঞ্চাইজি নেওয়া হয় দীর্ঘ মেয়াদে। নতুন মডেলে ফ্র্যাঞ্চাইজিদের সঙ্গে টুর্নামেন্টের রেভিনিউ শেয়ার করছে ৯৫ শতাংশ। বিপিএলে তেমন কোনো নিয়ম নেই। যে কারণে বিপিএল টেকসই হচ্ছে না বলে মনে করেন ক্রিকেট সংশ্নিষ্টরা।