জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা নির্মূলে সরকার ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট নাগরিকরা। 

তারা বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপশক্তিকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে মোকাবিলা করার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে পরাভূত করার জন্য সরকারকে বিভিন্ন নাগরিক উদ্যোগে সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। 

তারা বলেন, সম্মিলিতভাবে কার্যকর ব্যবস্থাপত্র ও কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে হবে, যার দিক নির্দেশনা রয়েছে আমাদের ৭২-এর সংবিধানে। কারণ ধর্মের নামে রাজনীতি থাকলে, ধর্মের নামে বৈষম্য, হত্যা ও সন্ত্রাস কখনও বন্ধ করা যাবে না।

বুধবার 'জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে সরকার ও নাগরিক সমাজের করণীয়' শীর্ষক ভার্চুয়াল আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশিষ্টজন এসব কথা বলেন। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে এই সম্মেলন আয়োজন করা হয়।

সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউটের সাম্মানিক সভাপতি নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, মহিলা পরিষদের সভাপতি ড. ফওজিয়া মোসলেম, শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, গ্রাম থিয়েটারের সভাপতি নাট্যব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ, প্রজন্ম '৭১-র সভাপতি শহীদসন্তান আসিফ মুনীর তন্ময়, যুক্তরাজ্যের মানবাধিকারকর্মী আনসার আহমদ উল্লাহ, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট লীনা পারভিন, মানবাধিকারকর্মী স্বীকৃতি বড়ুয়া, চলচ্চিত্রনির্মাতা শাকিল রেজা ইফতি, ভারতের সমাজকর্মী তাপস দাস, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল এবং বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা শাখার নেতারা।

সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘আমরা জঙ্গিবাদের বিষদাঁতগুলো ভেঙে দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছি। কিন্তু সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারিনি। ভারতের প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন- জঙ্গিবাদ নির্মূলে আমরা রোল মডেল তৈরি করেছি।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘কোনো ধর্মই সন্ত্রাসবাদ ও মানুষ হত্যার অনুমতি দেয় না। বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙখলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সহযোগিতা আমাদেরকে জঙ্গিবাদ নির্মূলে সফলতা এনে দিয়েছে। আমরা জঙ্গিবাদ সম্পূর্ণ নির্মূল করতে না পারলেও তাদের বিষদাঁত ভেঙ্গে দিয়েছি।’

ড. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘মৌলবাদীরা নারীদের স্বাধীনতার উপরে হস্তক্ষেপ করে তারা নানাভাবে ধর্মীয় অপব্যাখ্যা দিয়ে নারীদের স্বাধীনতা খর্ব করে। আমাদেরকে এদের বিস্তার যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করতে হবে।’

রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘ধর্মের নামে রাজনীতি বন্ধ না করা গেলে বাংলাদেশ কিছুতেই সামনের দিকে এগোতে পারবে না।’ 

শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, ‘পাকিস্তানি স্বাধীনতাবিরোধীরা রোহিঙ্গাদের দিয়ে বাংলাদেশে নানা ধরনের অপকর্ম করে চেষ্টা চালাচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তানের এই চক্রান্ত প্রকাশ করে ওদের মুখোশ উন্মোচন করা উচিত। দেশবিরোধী, স্বাধীনতা বিরোধীদের নাগরিকত্ব হরণ করা এখন সময়ের দাবি।’

নাট্যব্যক্তিত্ব বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেন, ‘১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী ময়দানে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণআদালত অনুষ্ঠিত করে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তা ১৯৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশে নবজাগরণ সৃষ্টি করে।’

আসিফ মুনীর তন্ময় বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদদের আদর্শের একটি বড় দীক্ষা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ও সমুন্নত রাখা। যুগে যুগে এই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের দীক্ষাকে শিক্ষায় পরিণত করে তরুণ সমাজকে চরমপন্থি, সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গি ধ্যান-ধারণা থেকে সরিয়ে আনতে হবে।’

সভাপতির বক্তৃতায় শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘রাজনীতি, প্রশাসন, সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা- সর্বত্র মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটেছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, বর্তমান বিশ্বে যেভাবে দক্ষিণপন্থার উত্থান ঘটছে তাতে ধর্মনিরপেক্ষ মানবতা ও উদারনৈতিকতার জমিন সর্বত্র ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে।’ 

তিনি ৭২-এর সংবিধানের মূল চেতনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতিকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন ও সংগ্রাম করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন। 

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বুধবার সকাল সাড়ে ৮টায় সংগঠনের পক্ষ থেকে ঢাকায় মিরপুরে শহীদজননী জাহানারা ইমামের সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়।