বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব দেওয়া একমাত্র সরকারি দপ্তর হচ্ছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি হওয়া সব পণ্য শুল্ক্কায়ন করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনে থাকা এই প্রতিষ্ঠান। দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করতে এই প্রতিষ্ঠান খুব গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিতে যথাযথ নজর পড়েনি স্বাধীনতার ৫০ বছরেও।

২০ বছর আগে মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ একটি ভবনে এখনও প্রতিদিনকার কাজ করতে হচ্ছে এই দপ্তরের রাজস্ব কর্মকর্তাদের। প্রয়োজনের অর্ধেক জনবলও নেই তাদের। দেশের প্রধান এই শুল্ক্ক স্টেশন স্বয়ংক্রিয় করতে ৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে 'এসআইকুডা ওয়ার্ল্ড' নামে নতুন সফটওয়্যার স্থাপন করা হলেও তার সবক'টি মডিউল পুরোদমে কার্যকর হয়নি আট বছরেও। নিয়ন্ত্রণে আসেনি চোরাচালান, বন্ধ হয়নি জালিয়াতি, সচল আছে ঘুষ-বাণিজ্য, সংকট আছে ইমেজেরও। এই চ্যালেঞ্জগুলো সামনে নিয়েই ২৬ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবস পালিত হলো।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার মো. ফখরুল আলম বলেন, 'কাস্টম হাউস শিগগির পূর্ণাঙ্গভাবে অটোমেশনে আসবে। এসআইকুডা ওয়ার্ল্ড নামের আপডেট ভার্সনের সফটওয়্যার আগের চেয়ে কাজে গতি বাড়িয়েছে। এখন ই-এলসি, ই-এক্সপি এবং ই-পেমেন্ট চালু হয়েছে। অয়েল বন্ড, ল্যাবরেটরিসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু মডিউল সচল করার প্রক্রিয়া চলছে। শুল্ক্কায়ন প্রক্রিয়ায় গতি আনতে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে ওয়ানস্টপ সার্ভিস সুবিধা দিতে নেওয়া হয়েছে এ উদ্যোগ। এসব প্রতিষ্ঠানকে এক প্ল্যাটফর্মে আনা গেলে আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া আরও সহজ হয়ে যাবে। কমে যাবে হয়রানিও।'

চিটাগাং চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, 'কাস্টমস পুরোপুরি অটোমেশনে আসতে পারেনি এখনও। এ কাজ করতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। আইসিডিসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পর্যাপ্ত জনবল রাখতে হবে। সব কাজ স্বয়ংক্রিয় করা গেলে ঘুষ, দুর্নীতির সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। কমে যাবে আমাদের দুর্ভোগও।'

ঘুষখোর ও শুল্ক্ক ফাঁকিবাজদের দৌরাত্ম্য কমাতে প্রথমবারের মতো ২০০৮ সালে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে অটোমেশনের আওতায় আনা হয় চট্টগ্রাম কাস্টমসকে। তখন বলা হয়, অটোমেশন হলে কমবে ঘুষ-দুর্নীতি, বাড়বে কাজের গতি। কিন্তু কথার সঙ্গে মিল ছিল না কাজের। এ সফটওয়্যারে ইন্টারনেট ভার্সন না থাকায় লোকাল নেটওয়ার্ক দিয়েই কাজ করতে হয়েছে। ব্যবহারকারীদের ঘরে বসে শুল্ক্কায়নের যাবতীয় তথ্য জানার সুবিধাও থেকে গেছে অধরা। পণ্য খালাসের আগাম চালান অনলাইনে দাখিল হলেও শুল্ক্কায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ঠিকই কাস্টমসে এসে ফাইল খুলতে হতো ব্যবহারকারীদের।

কাস্টমসে ব্যবসায়ীরা কোনো পণ্যের অগ্রিম আয়কর কিংবা ভ্যাট পরিশোধ করলেও সংশ্নিষ্ট দপ্তর তা পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পাচ্ছিল না। এ অবস্থ্থায় অটোমেশনের সফটওয়্যার আরও আপডেট করার সিদ্ধান্ত নেয় এনবিআর। ২০১৩ সালে ৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে 'এসআইকুডা ওয়ার্ল্ড' নামে আরেকটি সফটওয়্যার স্থাপিত হয় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে। বলা হয়, নতুন এই সফটওয়্যারে ইন্টারনেট ভার্সন থাকায় শুল্ক্কায়নের যাবতীয় প্রক্রিয়া অনলাইনে দেখতে পাবেন আমদানিকারকরা।

কোনো ব্যবসায়ীর এলসি পর্যায়ে ঘোষিত মূল্য ও খালাস পর্যায়ে পরিশোধিত প্রকৃত মূল্যে ফারাক থাকলে জানতে পারবে ব্যাংক। কেউ জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে পণ্য খালাস করলে ধরা যাবে তাকেও। চালু করা যাবে ল্যাবরেটরি, অয়েল বন্ডসহ বিভিন্ন পয়েন্টে থাকা গুরুত্বপূর্ণ মডিউলগুলো। কমে আসবে ঘুষ-দুর্নীতি। কিন্তু প্রকল্প শুরুর অনেক বছর পরও সচল ছিল না এই মডিউলগুলো। সম্প্রতি কয়েকটি মডিউল সচল হলেও ল্যাবরেটরির গুরুত্বপূর্ণ মডিউল এখনও অচল। অটোমেশন আংশিক কার্যকর থাকায় জালিয়াতি এবং দুর্নীতিও বন্ধ হয়নি পুরোদমে।