১৯৩ রানের মামুলি লক্ষ্য। আফগানদের হোয়াইটওয়াশ করার যে মিশন নিয়ে আজ খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশ, তা যেন ব্যাটিংয়েই শেষ হয়ে গেছে। এমন অবস্থায় দরকার ছিল আটসাঁট বোলিং ও ফিল্ডিং। কিন্তু বোলাররা ঠিকঠাক বল করলেও ফিল্ডারদের যাচ্ছেতাই পারফরম্যান্সে স্বাগতিকদের বরণ করতে হল বড় পরাজয়। কম পুঁজি নিয়ে বল করতে নেমে ক্যাচ মিসের প্রতিযোগিতায় নামে মুশফিক-মাহমুদউল্লাহরা। তিনবার জীবন পেয়ে সেঞ্চুরি করলেন রহমানউল্লাহ গুরবাজ। এতে ৫৯ বল বাকি থাকতেই ৭ উইকেটে জিতে সফরকারী আফগানিস্তান। এই জয়ে ধবলধোলাই এড়ালো আফগানিস্তান।

সহজ টার্গেট তাড়া করতে নেমে আফগানদের শুরুটা হল ঝলমলে। পাওয়ারপ্লের ৬ ওভারে দলটি তোলে ২০ রান। দুজনের উদ্বোধনী জুটিতে লক্ষ্যের দিকে ছুটছিল আফগানিস্তান। প্রথম দশ ওভার শেষে আফগানদের সংগ্রহ কোনো উইকেট না হারিয়ে ৫৭ রান। বারবার বোলিং পরিবর্তন করেও যেন উইকেটের দেখা পাচ্ছিল না বাংলাদেশ। আফগানদের এই পার্টনারশিপ টিকেছিল ১৫ তম ওভার পর্যন্ত। দলীয় ৭৯ রানে জুটি ভাঙতে সমর্থ হন সাকিব আল হাসান। ১৬তম ওভারের তৃতীয় বলে স্ট্যাম্প আউট হন ৩৫ রান করা রিয়াজ। রিয়াজের বিদায়ের কিছুক্ষণ পরই ফিফটি হাঁকান অপর ওপেনার রহমানউল্লাহ গুরবাজ। ৫৩ বলে তুলেছেন তার এই অর্ধশতক। এটি গুরবাজের ক্যারিয়ারের প্রথম অর্ধশতক। 

কিন্তু গুরবাজকে শুরুতেই ফেরাতে পারতো বাংলাদেশ। শরিফুলের ওভারে সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে পারনি মুশফিকরা। গুরবাজের ব্যাটের কানায় লেগে উইকেটকিপার আর প্রথম স্লিপের ফাঁক গলে চলে যায় বল। মুশফিকদের শুধু তাকিয়ে ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। এরপর ২৫তম ওভারে আবারও শরিফুলের বলে ক্যাচ মিস। এবার ফাইন লেগে ক্যাচ মিস মাহমুদউল্লাহর। ব্যাটসম্যান সেই গুরবাজ। এরপর ২৭তম ওভারে শরিফুলের বলে আবারও ক্যাচ ফেলে দিলেন মুশফিক। ক্যাচ মিসের কারণে এক গুরবাজই পেলেন তিনবার জীবন।

এরপর আর তাদের পিছু তাকাতে হয়নি। দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে রহমত শাহকে সঙ্গে নিয়ে দলকে জয়ের দিকেই নিয়ে যান ওপেনার গুরবাজ। জয়ের একদম দ্বারপ্রান্তে যাওয়ার পর ব্যক্তিগত ৪৭ রানে আউট হন রহমত। পরে অধিনায়ক হাশমতউল্লাহ শহিদি আউট হন ২ রানে। দুটি উইকেটেই নেন মেহেদী হাসান মিরাজ।

এদিকে ব্যাট হাতে আপনতালে খেলতে থাকা দলীয় ওপেনার গুরবাজ ব্যক্তিগত অর্ধশতককে শতকে পূর্ণ করেন। দলকে জয় এনে দিয়েই মাঠ ছাড়েন তিনি। অপরাজিত থাকেন ১০৬ রানে। ১১০ বলে খেলা এই ইনিংসটি সাতটি চার এবং চারটি ছয়ে সাজানো। এদিকে ৫ রানে অপরাজিত থাকেন নাজিবুল্লাহ জাদরান।

এর আগে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে টসে জিতে ব্যাট করতে নেমে শুরুতে সাবধানী খেলতে থাকেন তামিম ও লিটন। কোনো উইকেট না হারিয়ে পাওয়ার প্লেতে এই দুই ব্যাটার স্কোর বোর্ডে যোগ করেন ৪৩ রান। প্রথম দশ ওভারে উদ্বোধনী জুটিতে দারুণ একটা শুরু এনে দেওয়ার পর ৪৩ রানে ভাঙে এই জুটি। 

ফজলহক ফারুকি যেন মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে গেছেন বাংলাদেশি ব্যাটারদের। বিশেষ করে ফারুকির সামনে যেন টিকতেই পারছেন না দেশসেরা ওপেনার তামিম ইকবাল। তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের তিন ম্যাচেই ফারুকির কাছে পরাস্ত হয়েছেন টাইগার ওপেনার। প্রথম দুই ওয়ানডেতে এলবিডব্লিউয়ের শিকার হলেও সিরিজের শেষ ওয়ানডেতে তামিমকে বোল্ড করে মাঠছাড়া করেছেন আফগান পেসার ফজলহক ফারুকি। তার ব্যাট থেকে আসে ২৫ বলে ১১ রান। প্রথম ম্যাচে করেছিলেন ৮ রান। দ্বিতীয় ম্যাচে ১২ রানের বেশি যেতে পারেননি।

অধিনায়কের বিদায়ে উইকেটে আসেন সাকিব আল হাসান। লিটনের সাথে তাল মিলিয়ে রানের চাকা ঘুড়িয়েছেন তিনি। ২০তম ওভারে নিজের ৫০তম ওয়ানডেতে হাফ-সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন লিটন। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের চতুর্থ হাফ-সেঞ্চুরি পেতে ৬৩ বল খেলেছেন আগের ম্যাচে সেঞ্চুরি করা লিটন। এই অর্ধশতকের পথে ৩৫ রানে থাকার সময়ই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ৪ হাজার রানও হয়ে গেছে লিটনের। 

পরের ওভারে জুটিতে হাফ-সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন লিটন-সাকিব। দলীয় ১০৪ রানে সাকিবকে হারায় বাংলাদেশ। আজমতউল্লাহর বলে রক্ষণাত্মক খেলতে গিয়ে দুর্ভাগ্যক্রমে বোল্ড হন সাকিব। হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়েন সাকিব। সাকিবের বিদায়ে ভাঙে ৬৯ বল স্থায়ী ৬১ রানের জুটি। ৩৬ বলে তিন চারে ৩০ রান করেন সাকিব।

সাকিবের উইকেট পতনে, বিপদ বাড়ে বাংলাদেশের। ৪ রানের ব্যবধানে বাংলাদেশের দুই মিডল-অর্ডার ব্যাটার মুশফিকুর রহিম ও ইয়াসির আলিকে শিকার করেন আফগানিস্তানের স্পিনার রশিদ খান। উইকেটের পেছনে রহমানউল্লাহ গুরবাজকে ক্যাচ দেন ১৫ বলে ৭ রান করা মুশফিক। আর রশিদের ষষ্ঠ ওভারের শেষ বলে স্লিপে গুলবাদিন নাইবকে ক্যাচ দিয়ে প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন ৪ বলে ১ রান করা ইয়াসির। 

ইয়াসিরকে আউট হরে  ৮০তম ওয়ানডেতে ১৫০তম শিকার পূর্ণ করেন রশিদ। দ্রুত ১৫০ উইকেট শিকারের তালিকায় তৃতীয় স্থানে জায়গা করে নেন রশিদ। ওয়ানডেতে দ্রুত ১৫০ উইকেট শিকারের রেকর্ড অস্ট্রেলিয়ার মিচেল স্টার্কের। ৭৭ ম্যাচে  ১৫০ উইকেট শিকারের রেকর্ড গড়েছেন স্টার্ক। 

মুশফিক-ইয়াসিরের আউটের মাঝে নিজের ইনিংস বড় করছিলেন লিটন। আরও একটি সেঞ্চুরির স্বপ্নও বুনে ফেলেছিলেন তিনি। কিন্তু ৩৬তম ওভারে মোহাম্মদ নবীর বল স্লগ সুইপ করতে গিয়ে বল আকাশে তুলে দেন লিটন। লং অন থেকে সেটি ক্যাচ নেন নাইব। ফলে ১১৩ বলে ৭টি চারে গড়া ৮৬ রানের ইনিংসের সমাপ্তি ঘটে লিটনের। এরপর দলের স্কোরকার্ডে ৭ রান যোগ হতেই সাজঘরে ফিরে প্রথম ম্যাচের জয়ের নায়ক আফিফ হোসেন। নবীর বলে মুজিবের ক্যাচ হয়ে ৫ রান করে ফিরেন তিনি।

আফিফের পর টিকতে পারেননি মিরাজও। দলের হাল ধরার মুহূর্তে রানআউট হয়ে বিপদ বাড়ান টাইগার এই অলরাউন্ডার। নবীকে মিড উইকেটে ফ্লিক করে রান নিতে গিয়ে রশিদের থ্রোতে রানআউট হন তিনি। ১২ বলে ৬ রান করেন মিরাজ। পরের ওভারেই রশিদের বলে এলবিডব্লিউ হন তাসকিন আহমেদ। রিভিউ নিয়েছিলেন কিন্তু কাজে আসেনি। 

শেষ মূহুর্তে শরিফুলকে নিয়ে জুটি গড়ার চেষ্টা করেন মাহমুদউল্লাহ। কিন্তু ভুল বোঝাবুঝিতে রান আউটে কাটা পড়েন শরিফুলও। ৯ বলে ৭ রান করেন তিনি। শরিফুলের মত রান আউট হলেন মোস্তাফিজ। তার আউটেই বাংলাদেশ গুটিয়ে যায় ১৯২ রানে। বাংলাদেশের শেষ চার উইকেটের তিনটিই রানআউট। শেষদিকে দায়িত্ব নিয়ে খেলতে পারতো মাহমুদউল্লাহ, কিন্তু তাসকিন-শরিফুলদের স্ট্রাইক দিয়ে সেফ জোনে সময় পার করেছেন টিম টাইগারের এই অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। শেষ পর্য়ন্ত  ৫৩ বলে কোন বাউন্ডারি ছাড়া ২৯ রানে অপরাজিত থেকে যান তিনি।

আফগানদের হয়ে ৩ উইকেট শিকার করেন রশিদ খান। মোহাম্মদ নবী নেন দুটি উইকেট। একটি করে উইকেট পান ফারুকি ও ওমরজাই।

বাংলাদেশ একাদশ: 

তামিম ইকবাল (অধিনায়ক), লিটন কুমার দাস, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, ইয়াসির আলী রাব্বি, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, আফিফ হোসেন ধ্রুব, মেহেদী হাসান মিরাজ, তাসকিন আহমেদ, মোস্তাফিজুর রহমান ও শরিফুল ইসলাম।

আফগানিস্তান একাদশ: 

রহমানুল্লাহ গুরবাজ, রিয়াজ হাসান, রহমত শাহ, হাসমতুল্লাহ শহীদি, নাজিবুল্লাহ জাদরান, আজমতুল্লাহ ওমরজাই, মোহাম্মদ নবী, রশিদ খান, মুজিব উর রহমান, ফরিদ আহমেদ ও ফজলহক ফারুকি।