মাঝে চব্বিশ ঘণ্টারও কম সময়। এর মধ্যেই যে এতটা উথালপাতাল হয়ে যাবে, কে জানত এতসব। হঠাৎ লাফিয়ে ওঠা বুকসমান উঁচুতে বল, নিচু হয়ে যাওয়া বলের সুইং আর তার সঙ্গে গতির হেরফেরের বিভ্রান্তি- এসবে যে রাজ্যের অরুচি টাইগার ব্যাটারদের! তবে কিনা আগের ম্যাচে যেখানে একই বোলারদের সামনে তিনশর ওপর রান তুলেছিলেন, তারাই কিনা এদিন টেনেটুনে ১৯৪। আফিফ আর মিরাজের লড়াইটুকু বাদ দিলে ৭ উইকেটে হারা ম্যাচে নিজেদের বলে কিছুই নেই। কৌতূহলটা এখানেই- তাহলে কি পিচে সবুজ ঘাসের উপস্থিতি বাড়বাড়ন্ত ছিল? কন্ডিশন কি একেবারেই টিকে থাকার মতো ছিল না? তা না হলে ৩৪ রানের মধ্যেই কীভাবে ৫ উইকেট পড়ে যায়? 'ব্যাপারটি তেমন কিছু না। আমরা আগের ম্যাচে যেভাবে বোলিং করেছিলাম, এদিনও সেটাই করেছি। এদিন আমরা উইকেট পেয়েছি যেটা আগের দিন পাইনি। আমরা বোলিংয়ের বেসিকটা প্রয়োগ করেছি। বাড়তি কিছু না।' ৫ উইকেট শিকারি রাবাদার মধ্যে তখন বাঘবন্দির আনন্দ। তিন ম্যাচের সিরিজ এখন ১-১, অপেক্ষা বুধবার শেষ ম্যাচের। ম্যাচ জয়ের অনুভূতি জানাতে গিয়ে সেঞ্চুরিয়ানে সেদিনের হারের যন্ত্রণাটা চাপা রেখেই হাসতে হাসতে রাবাদা বোঝাতে চাইছিলেন- ম্যাচের ফল যা হওয়ার সেটাই তো হয়েছে, আশ্চর্য হওয়ার কি আছে!

কিন্তু জোহানেসবার্গের ওয়ান্ডারার্সে তো 'আশ্চর্য' হওয়ার কিছু থাকেই ! তামিম ১, সাকিব ০, লিটন ১৫, মুশফিক ১১, ইয়াসির ২, রিয়াদ ২৫- রানের এই সংখ্যাগুলো যে তাদের নামের পাশে একেবারেই বেমানান। অবাক হওয়ার মতোই। যেভাবে এনগিডির আগের বলটিই একই ভাবে গা বাঁচাতে গিয়ে ব্যাট তুলে দিয়েছিলেন তামিম, একই ধরনের ঠিক তার পরের বলটিতেই কিনা ক্যাচ তুলে দিলেন অধিনায়ক। লেগ স্লিপে যেভাবে ফিল্ডার রেখে মাহমুদউল্লাহকে ফাঁদ পেতে বোলিং করেছিলেন তাবরেজ শামসি, সেই ফাঁদেই তো শেষ পর্যন্ত ক্যাচ তুলে দিলেন রিয়াদ। সাকিব এসে রাবাদার গতিতে বিভ্রম হয়ে ফ্লিক করতে গিয়ে ক্যাচ দিলেন, লিটন বুকের ওপর উঠে আসা বল কাট করতে গিয়ে ধরা পড়লেন, ইয়াসির কুপোকাত হলেন রাবাদার বাউন্সে; আর মুশফিক হলেন এলবিডব্লিউ। মাত্র ১৩ ওভারের মধ্যে যখন কোনো দলের এই হাল হয়, তখন তাতে শুধু আশ্চর্যই নয়, আতঙ্কও তৈরি হয়। সেই আতঙ্ক কাটিয়ে কিছুটা সম্মানের জায়গায় দলের স্কোর নিয়ে গিয়েছিল আফিফ-মিরাজ জুটি। ঘরের মাঠেও আফগান সিরিজে এই জুটির রেকর্ড রানেই ভর করে জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। এদিনও তারা ৮৬ রান তোলেন। প্রোটিয়াদের বিপক্ষে যা কিনা সপ্তম উইকেট জুটিতে সর্বোচ্চ রান।

আসলে এদিন বাংলাদেশের ব্যাটিং ইনিংসটিকে যদি তিনটি ভাগে ভাগ করা যায় তাহলে ব্যাপারটি দাঁড়ায় অনেকটা এমন- প্রথম ভাগে রাবাদা-এনগিডি মিলিয়ে প্রথম ১৫ ওভার। পারনেল ইনজুরিতে পড়ায় মাঝের ওভারগুলোতে বাভুমা, মহারাজ আর শামসি এবং তৃতীয় ভাগে ৪০ ওভারের পর ফের রাবাদা আর এনগিডির আগমন। আফিফ আর মিরাজ ইনিংসের ওই মাঝের ওভারগুলোই দারুণ কাজে লাগিয়েছেন। শুধু স্পিন নয়, রাবাদাকেও পরপর বাউন্ডারি হাঁকিয়েছেন আফিফ, মিরাজ ছক্কা হাঁকিয়েছেন মহারাজকে। আফিফ তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় হাফ সেঞ্চুরি পূরণ করে ৭২ রানে আউট হন। আর মিরাজ করেন ৩৮ রান। দু'জনই একই ওভারে দুটি জীবন পেয়েছিলেন। বাভুমার ওভারে মিরাজ ২১ রানে আর আফিফ ৫৯ রানে। অবাক করার মতো ব্যাপার এটাই যে, দু'জন আউটও হয়েছেন রাবাদার একই ওভারে। রাবাদার ওই শেষ ওভারটি যদি দু'জন টিকে যেতেন তাহলে হয়তো দলের রান দুইশ পার হয়ে যেত।

কিন্তু সেটা পার হলেই কি ম্যাচের ফলাফলে খুব বেশি পরিবর্তন আসত? বোধহয় না। প্রথম ম্যাচটি হারার পর এদিন দলে তিনটি বদল এনে মাঠে নেমেছিল প্রোটিয়ারা। ম্যাচটি জেতার মরিয়া চেষ্টা ছিল তাদের। আগের ম্যাচে অসুস্থ থাকায় খেলতে না পারা ওপেনার ডি কক এদিন ব্যাটিংয়ে নেমে তেড়েফুঁড়ে ১৫১ স্ট্রাইক রেটে ৬২ রান তুলে নেন। যখন ৭৬ বল হাতে রেখেই ম্যাচ জিতে নেই প্রোটিয়ারা তখন অন্তত এটা বোঝা যায়, প্রথম ম্যাচের হারের শিক্ষা তারা ভোলেনি। 'গোলাপি ম্যাচের' সুভাসটা এদিন প্রোটিয়ারাই নিয়েছে, আর গোলাপের কাঁটাটা বিঁধে গেছে টাইগারদের গায়ে। এখন অপেক্ষা, আবার সেই সেঞ্চুরিয়ানে ফিরে যাওয়া। যেখানে বুধবার সিরিজের শেষ ম্যাচেই ফয়সালা হবে ট্রফি থাকবে জোহানেসবার্গে না ঢাকায়।