একটি অপরাজিত সেঞ্চুরির সঙ্গে তিন হাফ সেঞ্চুরির মেলবন্ধন দেখার পর মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্টের কথাই মাথায় আসে সবার আগে। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ে টপ অর্ডার এবং মিডল অর্ডার ব্যাটাররা এভাবেই রান করে জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন। বোলিংও ভালো হয়েছিল সে ম্যাচে। আপাতদৃষ্টিতে চট্টগ্রাম টেস্টেও বোলিংয়ের পর ব্যাটিং ভালো করছে বাংলাদেশ। তবে সেই টেস্ট এবং এই টেস্টের মধ্যে বড় পার্থক্য উইকেটে। মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে ছিল স্পোর্টিং উইকেট, চট্টগ্রামে খেলা হচ্ছে ব্যাটিং স্বর্গ। যেখানে ব্যাটার চাইলে মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে পারেন।
বাজে শট না খেললে আউট করা কঠিন। অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজের পর তামিম ইকবাল সেঞ্চুরি করে সেটা দেখালেনও। মুশফিকুর রহিম, লিটন কুমার দাসরা 'ক্যারি' করতে পারলে স্কোর বোর্ডে ৫০০ রান যোগ করা কঠিন নয়, খুবই সম্ভব। ব্যাটিং কোচ জেমি সিডন্সের বিশ্বাসও তাই। সবকিছু বিবেচনায় নিলে চট্টগ্রাম টেস্টের তিন দিনের দুই দিনই লিড করে বাংলাদেশ। স্বেচ্ছায় আত্মাহুতি না দিলে ম্যাচের চতুর্থ দিনও হয়তো দাপট দেখাবে স্বাগতিকরা।

শ্রীলঙ্কার ৩৯৭ রানের জবাবে বাংলাদেশ তৃতীয় দিন শেষ করে ৩ উইকেটে ৩১৮ রান। হাতের মাসলে ক্র্যাম্প করায় তামিম গতকাল চা বিরতির পর ব্যাটিংয়ে না নামলেও অপরাজিত। তিনি আজ ব্যাটিং করবেন বলে জানান জেমি সিডন্স। মুশফিকুর রহিম আর লিটন কুমার দাস তো জুটিতে অপরাজিত আছেনই। এই জুটি চতুর্থ দিন এক সেশন টিকে গেলে স্কোরবোর্ড রানে ফুলে ফেঁপে উঠবে। সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল সেটিকে টেনে কিছুটা লম্বা করতে পারবেন নিশ্চয়ই। প্রথম ইনিংসে ১০০ রানের লিড নেওয়া গেলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ স্বাগতিকদের হাতেই থাকবে। তখন পঞ্চম দিনের উইকেটের সুবিধা কাজে লাগাতে চেষ্টা করবেন স্পিনার ত্রয়ী- সাকিব, তাইজুল ও নাঈম। আরও একটি বড় লাভ, পাঁচশ রান করা গেলে টেস্ট ম্যাচ হারের শঙ্কা কম থাকবে।

প্রথম ইনিংসে ৭৯ রানে পিছিয়ে থেকে চতুর্থ দিন শুরু করে বাংলাদেশ। বোলিংয়ের পর ব্যাটিং ভালো হওয়ায় স্বাগতিক দলের ড্রেসিংরুমকে দেখাচ্ছে সুখী পরিবার। সুখের সংসারেও এক দু'জন দুঃখী মানুষ তো থাকেই। মুমিনুল হক আর নাজমুল হোসেন শান্ত তেমনই দু'জন। চট্টগ্রামের ব্যাটিং স্বর্গে তামিম ইকবাল, মাহমুদুল হাসান জয়, মুশফিকুর রহিম ও লিটন কুমার দাস যেখানে রান উৎসব করলেন, সেখানেই শান্ত ১ আর মুমিনুল ২ রানে উইকেট উপহার দেন সফরকারীদের। এ মুহূর্তে মুমিনুলের কাছে মনেই হতে পারে, ক্রিকেট স্বর্গের দেবতা সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করেননি। সতীর্থদের নামের পাশে এত এত রান দেখে অধিনায়কের আক্ষেপ হতেই পারে- কিছু রান তাঁকে দিলে এমন কী ক্ষতি হতো? ইনিংসের পর ইনিংস রান না পাওয়া মুমিনুল কল্পনায় আরও অনেক কিছু ভাবলেও ভাবতে পারেন। কিন্তু তাঁকে নিয়ে সমর্থকরা যে খুব ভালো কিছু ভাবছেন না, সেদিকটায় হয়তো খেয়ালই নেই তাঁর। শেষ ১৩ ইনিংসের ১০টিতেই এক অঙ্কের রানে আউট তিনি। এর পরও ব্যাড-প্যাচকে অবলীলায় অস্বীকার করছেন।

দ্বিতীয় দিনের দুই অপরাজিত ব্যাটার তামিম ও জয় এদিন জুটি অক্ষত রাখেন মধ্যাহ্ন বিরতি পর্যন্ত। তামিম ৮৯, জয় ৫৮ রানে ছিলেন তখন। নতুন সেশন শুরু হলেই ঘটে বিপত্তি। কোনো রান যোগ না করেই আউট জয়। ওপেনিং জুটি টিকে ছিল তিন ঘণ্টা ৩৮ মিনিট। শান্ত-মুমিনুলের সঙ্গে তামিম এক ঘণ্টা কাটালেও রান উঠেছে সামান্যই। ১৮৪ রানে ৩ উইকেট হারালেও তামিম-মুশফিক চা বিরতি পর্যন্ত টিকে থেকে জুটি গড়েন। মধ্যাহ্ন বিরতি থেকে ফিরেই দশম টেস্ট সেঞ্চুরির দেখা পান তামিম। ৯৯ রানে পৌঁছান বাউন্ডারি মেরে। শতক স্পর্শ করেন এক রান নিয়ে। ৩৯ মাস পর সেঞ্চুরি পেলেন বাঁহাতি এ ওপেনার। তাঁর নবম সেঞ্চুরিটি ছিল নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২০১৯ সালে হ্যামিলটনে। আরেকটি সেঞ্চুরির দেখা পেতে বাঁহাতি এ ওপেনারের এত সময় লাগার কারণ হলো, ইনজুরিতে পড়ে একটা লম্বা সময় টেস্টে বিরতি দিয়েছেন। তামিম শতকের ঘরে পৌঁছাতে ১৬২ বলে ১২টি চার মারেন। দু'বার আউট হতে গিয়েও বেঁচে যাওয়া টাইগার এ ওপেনার ১৩৩ রানে অপরাজিত। বিশ্রামে যাওয়ার আগে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ক্রিজে ছিলেন তিনি। যদিও ১০২ রানে আম্পায়ার সৈকত আউট দিলে রিভিউ নিয়ে বাঁচেন। ১১৪ রানে ক্যাচ ফেলেন ধনাঞ্জয়া। তার ওপেনিং সঙ্গী জয় জীবন পান ৫২ রানে। ওপেনিং জুটির পর পঞ্চম উইকেটে মুশফিক ও লিটন স্বচ্ছন্দ দেখান। লিটন একবার জীবন পেলেও কোনো জড়তা ছিল না ব্যাটিংয়ে। মুশফিক-লিটনের অপরাজিত জুটি ২১১ বলে ৯৮ রানের। ধারাবাহিকতা দেখাতে পারলে তামিম-জয়ের ১৬২ রানকে ছাপিয়ে যেতে পারবেন তাঁরাও। মুশফিক ৫৩, লিটন ৫৪ রান নিয়ে নতুন শুরু করবেন আজ। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এই টেস্ট দিয়ে একটি মাইলফলের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশি দুই ব্যাটার তামিম-মুশফিক। টেস্টে পাঁচ হাজারি রান ক্লাবে পৌঁছাতে মুশফিককে আর ১৫, তামিমকে ১৯ রান করতে হবে।

বাংলাদেশের এমন ঝলমলে দিনে কৌশলগত একটি সুবিধা কাজে লাগাতে চতুরতার আশ্রয় নেয় সফরকারীরা। বিশ্ব ফার্নান্দোর মাথায় বল লাগার একদিন পর কনকাশন সাব নামায় কাসুন রাজিথাকে। মূলত ফার্নান্দো বোলিং ভালো না করায় কাসুনকে নামানো। সাব হিসেবে নেমে ভালোও করেন। তিন উইকেটের দুটিই গেছে লঙ্কান এ পেসারের দখলে। যদিও ব্যাটাররা সফরকারীদের টেকনিক্যাল কৌশল গুঁড়িয়ে দিচ্ছেন রানের পর রান জমা করে।