মুহতাসিন আহমেদ হৃদয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টেবিল টেনিসে প্রথম স্বর্ণ জিতেছেন। গত ১০ মে মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ান জুনিয়র অ্যান্ড ক্যাডেট টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপ বালক অনূর্ধ্ব-১৯ দলগত ইভেন্টে এই স্বর্ণ জেতেন হৃদয়। প্রতিযোগিতায় হৃদয় ছাড়াও রামহি লিয়ন বম ও নাসিফ ইকবাল বাংলাদেশের হয়ে অংশ নেন। প্রতিযোগিতায় পাকিস্তান, মালদ্বীপ ও নেপালকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা। ফাইনালে ৩-২ গেমে লঙ্কা-বধে স্বর্ণ জয়ের ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ দল।

বাবার হাত ধরে...
রংপুরের নিউ ইঞ্জিনিয়ারপাড়ার ঠিকাদার ফরহাদ আহমেদ ও গৃহিণী মাসুদা বেগমের একমাত্র ছেলে মুহতাসিন আহমেদ হৃদয়। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াকালে বাড়ির পাশে টেবিল টেনিস ক্লাবে যাতায়াত করে হৃদয়। এ সময় টেবিল টেনিসের প্রতি তীব্র আকর্ষণ তৈরি হয়। কিন্তু হৃদয়ের বাবার অনটনের সংসার। তাই ছেলের খেলার সরঞ্জাম কিনে দেওয়ার সক্ষমতা ছিল না। তবু ছোট্ট ছেলের টেবিল টেনিস খেলার আগ্রহকে নিভে যেতে দেননি বাবা ফরহাদ আহমেদ। ছেলের জন্য বন্ধুদের সহযোগিতায় কিনেছেন ব্যাট-বল। খেলার সরঞ্জাম সংগ্রহ করে ছেলেকে অনুশীলনের জন্য নিয়ে যেতেন টেবিল টেনিস ক্লাবে। পাড়ার সিনিয়র ভাইদের উৎসাহে টেবিল টেনিসে আগ্রহ আরও বাড়ে হৃদয়ের।

জেলা জুনিয়র দলে সুযোগ
তবে টেবিল টেনিস ক্লাবে নানা সমস্যা। ম্যাট নেই, ভালো লাইট নেই, ভালো টেবিল নেই। তাতে কি; আগ্রহ আর ইচ্ছে তো আছে। শানের ওপর খেলতে হয়েছে হৃদয়কে। কঠোর অনুশীলনের কারণে টেবিল টেনিসে ভালো করায় ২০১৬ সালে জেলা জুনিয়র দলের হয়ে খেলার সুযোগ পেয়ে যান হৃদয়। একই বছর দিনাজপুর জেলা ভেন্যুতে জাতীয় পর্যায়ে রংপুর জেলা জুনিয়র দলের হয়ে খেলেন হৃদয়। তবে সেই আসরের দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে বিদায় নিতে হয় হৃদয়কে। ২০১৭ সালে ঢাকা ভেন্যুতে আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের খেলায় এককভাবে ফাইনাল পর্যন্ত খেলেন হৃদয়। একই বছর এককভাবে রানারআপ হয়েছিলেন হৃদয়। শুধু তাই নয়, দলগত খেলায় চ্যাম্পিয়নও হয়েছিল রংপুরের দল।

সুযোগ পেয়েও চতুর্থ খেলোয়াড়!
টেবিল টেনিস সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় পর্যায়ে সেরা আটজন জুনিয়র খেলোয়াড় সিনিয়র টিমের সঙ্গে এককভাবে খেলার সুযোগ পায়। এই নিয়মে জুনিয়রদের মধ্যে নির্বাচিতদের তালিকায় হৃদয়ের নাম স্থান পায়। ঢাকায় থেকে টেবিল টেনিস খেলা শুরু করেন। ২০১৮ সালে ঢাকায় টেবিল টেনিসের প্রিমিয়ার লিগ অনুষ্ঠিত হয়।

এই লিগে পাললিক দলের হয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। ওই টুর্নামেন্টে পাললিক দল চ্যাম্পিয়ন হয়। তবে টানা ১৫ দিন খেলা হলেও দলটি চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে একদিনও হৃদয়কে প্রতিযোগিতায় মাঠে নামায়নি। এতে খুবই কষ্ট পান হৃদয়। নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন এবং দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাওয়ার কথা ভাবেন। তাই জেদের বশে রংপুরে ফিরে কঠোর অনুশীলন শুরু করেন।

জেদ থেকে পদক
এরপর ২০১৮ সালে বাংলাদেশ র‌্যাঙ্কিং টুর্নামেন্টে সিনিয়র টিমের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হন হৃদয়। ২০১৯ সালে ফেডারেশন কাপেও চ্যাম্পিয়ন হন। সাফল্যের ধারাবাহিকতা রেখে ২০১৯ সালে ৩৮তম জাতীয় সিনিয়র টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে হৃদয় জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হন। এরই মধ্যে বাংলাদেশের হয়ে বিদেশে টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের সুযোগ পান হৃদয়। ২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কায় দক্ষিণ এশিয়ান জুনিয়র অ্যান্ড ক্যাডেট টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে দেশের হয়ে প্রথম চারটি ব্রোঞ্জ পদক নিয়ে আসেন। ২০১৮ সালে মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত একই টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে আবারও চারটি ব্রোঞ্জ পদক পান তিনি। ২০১৮ সালে সিনিয়র গ্রুপের হয়ে ভারতে আয়োজিত টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় অংশ নেন হৃদয়। সেখানে কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলেও ২০১৯ সালে কাতারে অনুষ্ঠিত এশিয়ান টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে দলগতভাবে অংশ নিয়ে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশকে ২১তম স্থানে নিয়ে আসে হৃদয় ও তাঁর দল এবং ওই টুর্নামেন্টে একক পর্যায়ে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেন হৃদয়। এরপর কাতার থেকে ওমানে ডব্লিউটিটি ইয়ুথ কনটেন্ডার ওয়ার্ল্ড টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় প্রথমবারের মতো অংশ নেন। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে কোয়ার্টার ফাইনালও খেলেন। হৃদয় বর্তমানে লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

হৃদয়ের আক্ষেপ ও আগামীর স্বপ্ন
এমন অর্জনের মধ্যেও হৃদয়ের আক্ষেপ। বলেন, 'ছোটবেলা থেকেই মা-বাবার অনুপ্রেরণায় টেবিল টেনিসে অংশ নিই। আমার এ সাফল্যের পেছনে পরিবার, কোচ, সতীর্থরা রয়েছেন। আমাদের টেবিল টেনিস সংস্থার অবস্থা বেশি ভালো নয়। আগে লাল লাইটে আমরা অনুশীলন করতাম। ঢাকায় খেলতে গিয়ে দেখি, সাদা লাইটে খেলা হচ্ছে। ফলে নিজেকে খাপ খাওয়াতে কষ্ট হচ্ছিল। সে যাক, আমার আক্ষেপটা- সরকার ক্রিকেট-ফুটবলারদের যে পরিমাণ পৃষ্ঠপোষকতা ও সম্মান দেয়, টেবিল টেনিসসহ অন্য খেলায় যদি এর কিছু পরিমাণ পৃষ্ঠপোষকতা করা যেত, তবে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরি হতো। দেশসেরা টেবিল টেনিস খেলোয়াড় হয়ে রংপুর সিটি করপোরেশন থেকে মাসিক সম্মানী ভাতা হিসেবে পাঁচ হাজার টাকা প্রাপ্তি ছাড়া কেউ আমার পাশে দাঁড়াননি। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে টেবিল টেনিস আরও এগিয়ে যাবে।' হৃদয়ের কথা টেনে নিয়ে তাঁর কোচ মিহির সেন বলেন, পাকার ওপরে টেবিল টেনিস খেলে আমাদের খেলোয়াড়রা। অথচ আন্তর্জাতিক ইভেন্টগুলোতে ম্যাটে খেলতে হয়। এতে করে খেলোয়াড়রা আন্তর্জাতিক ইভেন্টে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়ে।

তিনি আরও বলেন, গত ২০ বছরেও ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে টেবিল টেনিসের কোনো টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়নি। রংপুরে মাঝেমধ্যে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। রংপুরের খেলোয়াড় হৃদয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলে দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছেন। তাই হৃদয়দের মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের এগিয়ে নিতে ও নতুন খেলোয়াড় তৈরিতে রংপুরে আন্তর্জাতিক মানের টেবিল টেনিস ক্লাব গড়ে তুলতে হবে। আন্তর্জাতিক ইভেন্ট আয়োজনের যদি সম্ভব না হয়, তবে জেলা কিংবা বিভাগ পর্যায়ে টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে। শত প্রতিকূলতার মধ্যে হৃদয়দের হাত ধরে দেশে টেবিল টেনিসে যে অর্জন এসেছে, তা আমাদের জন্য গৌরবের। আমি মনে করি, সরকার ক্রিকেট-ফুটবলের মতো টেবিল টেনিসকে এগিয়ে নিতে কাজ করবে- আমাদেরও সেই প্রত্যাশা।