বাংলাদেশে বন উজাড়ের গড় হার ২ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০ বছরে (২০০১-২০২০) গাছের আচ্ছাদন কমেছে এক লাখ ৯৭ হাজার হেক্টর; যা মোট বনভূমির ১০ ভাগ। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ এবং দখল হওয়া বনের পরিমাণ প্রায় সাড়ে চার লাখ একর। ২০১৯ সাল পর্যন্ত ঢাকায় মোট জলাভূমির ৩৬ শতাংশ ভরাট হয়ে গেছে। বন ও জলাশয় ধ্বংসের কারণে দেশের অন্তত ২৬৮টি প্রজাতির প্রাণি চরম সংকটের মুখে পড়েছে; যারমধ্যে ৫৬ প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। ৯ শতাংশ স্তন্যপায়ী হারিয়ে গেছে। সামুদ্রিক সংকটাপন্ন মাছের ১০টির মধ্যে সাতটিই হারিয়ে গেছে। বিলুপ্ত হয়ে গেছে ১১৮টি দেশীয় মাছ। ২৯ বছরে হাতি হত্যা হয়েছে ১৪১টি। 

রোববার আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) উদ্যোগে আয়োজিত এক ওয়েবিনারে এসব তথ্য জানানো হয়। তথ্যগুলো জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা-এফএও, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব ন্যাচার (আইইউসিএন), গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) ও ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয় (আইডব্লিউএম) থেকে নেওয়া বলে জানান আয়োজকরা।

ওয়েবিনারে বক্তারা বলেন, দেশের জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে। বর্তমান সংকট দূর করতে বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিনির্ধারণের পাশাপাশি দরকার আন্দোলন। লাভের জন্য ক্ষতি করা যাবে না। এ জায়গাটি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে।

বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সঞ্চালনায় ওয়েবিনারের বক্তব্য দেন বন অধিদপ্তরের উপ প্রধান বন সংরক্ষক (বন ব্যবস্থাপনা উইং) মো. জাহিদুল কবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও ওয়াইল্ডটিম প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী আনওয়ারুল ইসলাম, আইইউসিএনের বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ রাকিবুল হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আলিফা বিনতে হক, ক্রিয়েটিভ কনজার্ভেশন অ্যালায়েন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহরিয়ার সিজার রহমান ও আরণ্যক ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম সমন্বয়কারী আবু হেনা মোস্তফা কামাল প্রমুখ। 

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কিছু ভালো কাজ হচ্ছে। কিন্তু পরিসংখ্যানগুলো ভয়ার্ত। কোথায় আমরা ভুল করেছি তা বের করা জরুরি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একটি দর্শনের জায়গায় আসতে হবে। যাতে জীববৈচিত্র রক্ষা হয়। 

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বন বিভাগের পাশাপাশি সব মন্ত্রণালয় ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করা দরকার বলে মনে করেন মো. জাহিদুল কবির। 

আনওয়ারুল ইসলাম সংরক্ষিত বন সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা কম থাকার বিরূপ দিকটি তুলে ধরেন। এর সাথে তিনি সংরক্ষিত এলাকায় বসবাসরত মানুষের জীবনযাত্রার সাথে সামঞ্জস্যতার ব্যাপারটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন। 

রাকিবুল আমিন বলেন, আমাদের পরিবর্তনের দিকে যেতে হবে। না হলে বড় দুর্যোগ নেমে আসবে। আগামী প্রজন্মের জন্যই আমাদের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে। জেলেদের প্রণোদনা দেওয়ার কারণে ইলিশে আমাদের সাফল্য এসেছে। জীববৈচিত্রের ক্ষেত্রও এটি দেখাতে হবে। আমরা যত বেশি প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছি, তত বেশি ধ্বংস হচ্ছি।

শাহরিয়ার সিজার রহমান, ক্রিয়েটিভ কনজার্ভেশন অ্যালায়েন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানো বন্যপ্রাণী রক্ষা নিয়ে তাদের কাজের ব্যাপারে আলোচনা করেন। তাছাড়াও তার সংস্থায় বিভিন্ন স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ক্ষমতায়নের ব্যাপারটিও তুলে ধরেন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আলিফা বিনতে হক তার বক্তব্যে জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার থেকে সংরক্ষণকে বেশি প্রাধান্য দেন। 

আরণ্যক ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম সমন্বয়কারী আবু হেনা মোস্তফা কামাল, পাহাড়ি অঞ্চলে কাজ করার প্রতিকূলতার ব্যাপারে উল্লেখ করেন। এর পাশাপাশি পাহাড়ি অঞ্চলের জমি মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতার বিষয়ে কথা বলেন।