টেস্টের সৌন্দর্য রূপ বদলে। এক সেশনে নিষ্প্রাণ তো পরের সেশনে লাগামহীন ঘোড়ার মতো টগবগে। মিরপুর টেস্ট এগোচ্ছে রং ছিটিয়ে। ঝলকে ঝলকে খুলছে রূপ। ক্রিকেটের এলিট দর্শকদের কাছে প্রতিটি সেশন হয়ে উঠছে উপভোগ্য। গত দুই দিনেই কত কী-ই না দেখা হলো। বাংলাদেশের ইনিংসটি দু-দুটি বিশ্বরেকর্ড গড়া। প্রথম দিন মুশফিক-লিটনের জুটিতে হয় বিশ্বরেকর্ড। গতকাল রেকর্ডের পাতায় জায়গা করে নেয় আরেকটি রেকর্ড। বাংলাদেশই বিশ্বের একমাত্র দল, ছয়জন ব্যাটার শূন্য রানে আউট হলেও ইনিংসে ৩৬৫ রানে করেছে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ভারত করতে পেরেছিল ১৫২ রান। বাংলাদেশের কীর্তিটা তাই অনেক বড়। রেকর্ড গড়া টেস্টের দ্বিতীয় দিন শেষে শ্রীলঙ্কার রান ২ উইকেটে ১৪৩ রান। সিংহলিরা স্বাগতিকদের চেয়ে এখনও ২২২ রানে পিছিয়ে। সেদিক থেকে দেখলে টানা দুই দিন লিডে থাকল বাংলাদেশ। এই লিড ধরে রাখতে হলে আজ জ্বলে উঠতে হবে বোলারদের।

বিশ্বরেকর্ড হয়েছিল প্রথম দিনই। দ্বিতীয় সেটাকে নতুন লুক দেওয়ার সুযোগ ছিল। ষষ্ঠ উইকেটে বিশ্বরেকর্ডের আরও কাছাকাছি যেতে পারত দ্বিতীয় দিন সকালে লিটন কুমার দাস আউট না হলে। লঙ্কান ফাস্ট বোলার কাসুন রাজিথা নতুন কোনো রেকর্ডে যেতে দেননি জুটিকে ভেঙে। কাব্যিক ইনিংস খেলে ১৪১ রানে ফেরেন লিটন। ৬ ঘণ্টা ২৪ মিনিট ক্রিজে থেকে ২৪৬টি বল খেলেন তিনি। উইকেটরক্ষক এ ব্যাটারের নান্দনিক ইনিংসটি সাজানো ১৬টি চার আর একটি ছয় দিয়ে। এই সংখ্যা দিয়ে লিটনের ব্যাটিং চিত্রায়িত হয় না। ব্যাটের তুলিতে রানের ছবি আঁকেন তিনি। চোখ জুড়িয়ে মন ভরিয়ে দেয় বাউন্ডারি শট খেলে। রানের ফুল ফোটানো লিটন ব্যাটিংশিল্পী। সংবাদ সম্মেলনে লিটন জানান, গতকাল শূন্য থেকে শুরুর পরিকল্পনা ছিল তাদের। শুরু শূন্য থেকে হলেও প্রথম দিনের মতো ঝলমলে ব্যাটিং হলো না। শেষ পর্যন্ত ২৭২ রানে থামতে হলো মুশফিক-লিটনকে।

লিটনের উইকেটটি রাজিথার চতুর্থ। মহামূল্যবান এই উইকেট জুটি ভাঙতে পারা ২৮ বছর বয়সী বোলারের জন্য ছিল সাফল্যের, দলের জন্য ছিল স্বস্তির। মুশফিক-লিটন যতক্ষণ ক্রিজে ছিলেন ততক্ষণ অস্বস্তির চোরা স্রোত ভাসিয়ে নিচ্ছিল সফরকারীদের। যে কারণে লিটনকে আউট করার পর উল্লাসে ফেটে পড়ে লঙ্কান ড্রেসিংরুম। কোচিং স্টাফের মুখে হাসি ফিরিয়ে দিতে পেরে রাজিথাও তৃপ্তি পেলেন। ২৯৬ রানের মাথায় জোড়া উইকেট হারায় বাংলাদেশ। মোসাদ্দেককে আউট করে ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো পাঁচ উইকেট পান। বাংলাদেশের বিপক্ষে যাঁর খেলারই কথা না, তিনিই কিনা শ্রীলঙ্কার বোলিং নায়ক। বিশ্ব ফার্নান্দো কনকাশনে না পড়লে রিজার্ভ বেঞ্চে বসেই কাটিয়ে দিতে হতো তাকে।

লিটন - মোসাদ্দেকে পরপর হারালেও লড়াই ছাড়েনি বাংলাদেশ। মুশফিক-তাইজুল মিলে ৪৯ রানের জুটি গড়েন ৭৯ বল খেলে। সময়ক্ষেপণের পাশাপাশি দলীয় স্কোর বাড়িয়ে নেওয়ার জন্য যেটা ছিল দারুণ একটি কৌশল। অষ্টম উইকেট জুটির এই রানই হতে পারে ম্যাচের গতিপ্রকৃতি নির্ণায়ক। এটা বোঝা যাবে শ্রীলঙ্কার প্রথম ইনিংস শেষে। তাইজুল ১৫ রান করলেও ৭০ মিনিট টিকে থেকে ৩৭টি বল খেলে মুশফিককে ইনিংস বড় করার সুযোগ করে দেন। শেষ উইকেটে মুশফিকের জুটি হন পেসার এবাদত হোসেন। এক উইকেট বাকি থাকায় সেশনের সময় বাড়ান আম্পায়াররা। কিন্তু আধাঘণ্টা খেলা হওয়ার পরও জুটি ভাঙতে না পারায় বাধ্য হয়েই সাড়ে ১২টায় মধ্যাহ্ন বিরতিতে যেতে হয়। যদিও দ্বিতীয় সেশনে নেমেই অলআউট হয় বাংলাদেশ। ১৭৫ রানে অপরাজিত থাকেন মুশফিক। জুটির অভাবে আরেকটি ডাবল সেঞ্চুরি করা হলো না তাঁর। দলের দিক থেকে দেখলে মুশফিকের এই ১৭৫ রান তার যে কোনো দ্বিশতকের চেয়ে মহামূল্যবান। পৌনে দুইশ রানের ইনিংস খেলতে পৌনে ৯ ঘণ্টা ছিলেন ক্রিজে। অনিন্দ্য এই ইনিংস গড়তে সব ধরনের শট খেলেন তিনি। চট্টগ্রামে রিভার্স সুইপ না খেলা উইকেটরক্ষক এ ব্যাটার মিরপুরে ঠিকই মেরেছেন। প্রিয় রিভার্স সুইপ থেকে বাউন্ডারিও পান তিনি।

এরপর শ্রীলঙ্কান ব্যাটাররা বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করেন ব্যাটিং। দিন শেষ করেন ২ উইকেটে ১৪৩ রানে। তাদের দেখে একবারের জন্যও মনে হয়নি চাপে আছেন। আসলে স্বাগতিক দুই পেসার এবাদত হোসেন আর খালেদ আহমেদ সফরকারীদের চাপে ফেলতে পারেননি। রাজিথা বা আজিথাদের মতো লাইল-লেন্থ ধরে এক চ্যানেলে বোলিং হয়নি। এবাদত বল লাইনে রাখতে পারলেও খালেদ ছিলেন কিছুটা এলোমেলো। লিটন তাই সংবাদ সম্মেলনে আর্জি রাখেন দুই পেসারের উদ্দেশে- অন্তত আজ প্রথম সেশনে ভালো কিছু স্পেল যেন করেন তারা। কারণ এই উইকেটে পেসারদের ভালো করার যথেষ্ট সুযোগ আছে। রাজিথার মতে, পেসারদের জন্য মুভমেন্ট আছে। তিনি মনে করেন, চট্টগ্রামের থেকে অনেক সরেস উইকেট হয়েছে মিরপুরে। পেস বোলিংয়ের জন্য যা উৎকৃষ্ট। যদিও স্বাগতিক পেস বিভাগ সুবিধা নিতে পারছে না। বরং স্পিনাররাই বেশি ভালো বোলিং করছেন। শেষ বিকেলে সাকিব একটি উইকেট নিয়ে সেই ইঙ্গিতই দিয়ে রেখেছেন।

বিষয় : বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা দ্বিতীয় টেস্ট

মন্তব্য করুন