কাক ডাকা ভোরে রিকশা নিয়ে বের হয়েছেন পঞ্চাশোর্ধ সবুজ মিয়া। ভোরে যাত্রী পাওয়া সহজ না- এটা তার জানা। তবুও অন্যান্য দিনের তুলনায় বৃহস্পতিবার বেশি আয় করার আশায় কষ্ট করছেন। কারণ, তার একমাত্র মেয়ে কহিনূর হাসপাতালের শয্যায় কাতরাচ্ছেন। অপারেশন লাগবে, কিন্ত টাকা নেই। তাই সকালটা রুটি-কলা খেয়েই পার করেছেন। দুপুর পার করেছেন এক গ্লাস পানি খেয়ে। বিকেল গড়ালে ক্ষুধার জ্বালায় চোখে-মুখে অন্ধকার দেখলেও টাকা সঞ্চয়ের আশায় খরচ করেননি। রাজধানীর বিভিন্ন অলিগলিতে অসংখ্য হোটেল চোখে পড়লেও থেমে যাননি। খাবারের ঘ্রাণে যেন তার ক্ষুধা আরও বেড়ে যায়। সন্ধ্যার ঠিক আগে ক্লান্ত শরীরে সাতরাস্তায় এসেই তার চোখ আটকে যায়। সোডিয়াম বাতির আলোয় ফুটপাতেই লাইন ধরে ২০ থেকে ৩০ জন নিম্ন আয়ের মানুষ খাবার খাচ্ছেন। দিনমজুর, পথশিশু, রিকশাচালক কেউ বাদ নেই।

তখনই খাবারের আশা নিয়ে সামনে যেতেই এক তরুণ বলে ওঠেন, 'আপনার নাম বলেন, আর দিনে কী ভালো কাজ করেছেন?' হতাশার সুরে সবুজ মিয়া বললেন- 'ভালো কাজতো করবার পারি নাই, তয় মাইয়াডার চিকিৎসার লাইগ্যা না খাইয়া দিনভর রিকশা চালাইছি। খাইলে টাকা কম পড়বো। তাই খাই নাই।' এটা শুনেই এক সেচ্ছাসেবী তরুণ তার হাতে খাবার তুলে দিলেন। খিচুড়ি, ডিম, আর বেগুন ভাজা যেন অমৃত হয়ে ওঠে সবুজের কাছে।

শুধু আলামিন না, তার মতো অসহায় জীবনের গল্প চলা প্রায় ৭০০ মানুষ প্রতিদিন কোনো না কোনো ভাল কাজের বিনিময়ে খাবার পাচ্ছেন। বিনিময়ে কোনো টাকা-পয়সা কিচ্ছু লাগে না। ভাল কাজের বিনিময়ে প্রতিদিন খাবার দিচ্ছে তারা। তবে কেউ যদি বলে- আজ কোনো ভাল কাজ করিনি, তাকেও সত্য কথা বলার কারণে তারা খাবার দিচ্ছেন। পাশাপাশি পরবর্তীতে ভাল কাজ করতে উৎসাহ প্রদান করছেন। বলছিলাম- তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তার পাশে দেয়ালে বড় করে লেখা 'ভাল কাজের হোটেল' এর কথা।

'ইয়্যুথ ফর বাংলাদেশ' নামে একটা গ্রুপের উদ্যোগে প্রতিদিন কমলাপুর রেলস্টেশন, বনানীর করাইল বস্তির পাশে ও তেজগাঁও সাতরাস্তা মসজিদের পাশে অসহায় ও ভালো কাজ করা প্রায় ছয়শত থেকে সাতশত মানুষকে একবেলা খাওয়ানো হয়। এছাড়াও রমজান মাসে আড়াই থেকে তিন হাজার মানুষকে প্রতিদিন ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়েছে এই হোটেলের উদ্যোগে। চট্টগ্রামের পুরাতন রেলস্টেশনের পাশে প্রতি রোববার খাওয়ানো হয় ও রমজানে প্রতিদিন খাওয়ানো হয়েছে সেখানে।

১৪ শত সদস্যের ইয়্যুথ ফর বাংলাদেশ ভালো কাজের হোটেল ছাড়াও শিশুদের শিক্ষা ও চিকিৎসারও ব্যবস্থা করে। ভালো কাজের হোটেলের একজন স্বেচ্ছাসেবক মো. ফারুক বলেন, 'আমাদের চৌদ্দশত এর ওপরে সদস্যের প্রতিদিন ১০ টাকা করে দিলে মাসে ৩০০ বা এরও বেশি টাকা দেয় কেউ কেউ। কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী রয়েছেন যারা ৫০-১০০ জনের খাবারের ব্যবস্থা করেন মাঝে মাঝে। আবার কারও জন্মবার্ষিকী বা মৃত্যুবার্ষিকীতেও একদিনের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। এভাবে সদস্যদের টাকায় আমাদের ২৩ থেকে ২৪ দিন ভালোভাবেই চলে। কিন্তু মাসের বাকি ৬-৭ দিন টাকার অভাবে উদ্যোগটা বন্ধ রাখতে হয়।'

সংগঠনটির একদল স্বেচ্ছাসেবক খাবার বিতরণের আগে প্রতিদিন সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তির নাম ও কী ভালো কাজ করেছে এ দুইটি তথ্য সরবরাহ করে থাকেন। আবার সবচেয়ে বেশি ভালো কাজ করা ব্যক্তিকে আলাদাভাবে দেওয়া হয় পুরস্কার।

সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা মো. আরিফুর রহমান বলেন, 'ছোট বেলায় একটা নাটক দেখি জাহিদ হাসানের। নাটকের একটি চরিত্রে তিনি প্রতিদিন ভাল কাজ করতেন, এটা আমাকে খুব উৎসাহ দেয়। এরপর বন্ধুদের নিয়ে ভাল কাজ করা শুরু করি। হানিফ সংকেতের ইত্যাদিতে আমাদের ভাল কাজের বিভিন্ন কাজ দেখিয়েছে দুইবার।'

তিনি আরও বলেন, 'সাধারণত প্রত্যেক খারাপ কাজের শুরুটা হয় খাবারের ক্ষুধা থেকে। আর আমরা একবেলা করে এই ক্ষুধা মেটানোর চেষ্টা করি। যাতে খাবারের কষ্ট থেকে মানুষ অপরাধের দিকে না ধাবিত হয়। আমার চিন্তা- প্রথমে একটা শিশু বাঁচবে। তারপর সে খাবে, তারপর চিকিৎসা, এরপর পড়ালেখা করবে। বাড্ডা, বাসাবো ও মাদারীপুরের কালপিনির টুমচর গ্রামে মোট তিনটা স্কুলে ৭৩৮ জন শিশুকে পড়ানো হয় ও দরিদ্র শিশুদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয় আমাদের ইয়্যুথ ফর বাংলাদেশ গ্রুপের উদ্যোগে।'

'ভালো কাজের হোটেল'-এ খেয়েছেন তেজগাঁও এলাকার রিকশাচালক মনির হোসেন। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, 'ভাল কাজ করলে খাবার পাওয়া যায়। এখানে খেয়ে আমার খুব ভাল লেগেছে। এরপর থেকে ভাল কাজের প্রতি আমার ইচ্ছা বেড়ে গেছে।'

ভালো কাজের হোটেল-এ সিনিয়র স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন সিহানুর রহমান আসিফ, জাকির হোসেন, সাকিব হাসান শাওন, রুবেল আহমেদ হিমেল প্রমুখ।