ছুটিতে কেউ দুবাই, কেউ ব্যাংকক, কেউ বা যুক্তরাষ্ট্রে- মিরপুর টেস্ট শেষ হতে না হতেই ক্রিকেটাররা বিশ্রাম কাটাতে ছুটেছেন বিদেশে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে পরের টেস্ট শুরু না হওয়ার আগে পর্যন্ত আর লঙ্কা সিরিজের ব্যর্থতা নিয়ে কোনো কিছু গায়ে মাখবেন না কেউ। টেলিভিশনের টক শো কিংবা পত্রিকার পাতাতেও ততদিন কমে আসবে সদ্য সমাপ্ত সিরিজ ব্যর্থতার 'পোস্টমর্টেম'। 

ক্রিকেটার এবং টিম ম্যানেজমেন্ট- প্রত্যেকেই এসব ট্রেন্ড জানেন। তাই কিছুদিন শুধুই 'শান্ত' হওয়ার অপেক্ষায় থাকেন সবাই। হয়তো অধিনায়ক মুমিনুলকে বিসিবি অফিসে এসে হারের এই ব্যর্থতার জবাবদিহিতা দিতে হয়। কিন্তু বাকিরা? যারা কিনা দল নির্বাচন করেন, যারা একাদশে নিজের পছন্দের ক্রিকেটারকে নেওয়ার জন্য ড্রেসিংরুমে সওয়াল করেন- ব্যর্থতার জন্য তাদের জবাবদিহি কেন থাকবে না? 

সূত্রের খবর, মিরপুর টেস্টের একাদশে মোসাদ্দেকে নিতে চাননি কোচ ও অধিনায়ক। তাহলে কার ইচ্ছায় নেওয়া হলো তাকে। এই যে টপ অর্ডারের গুরুত্বপূর্ণ তিন নম্বর পজিশনে দিনের পর দিন ব্যর্থ হচ্ছেন নাজমুল হোসেন শান্ত, অথচ তার ওপরই আস্থা রাখা হচ্ছে অবিচল। বিশ্বের অন্যান্য দলে তিন নম্বরে টেকনিক্যালি সবচেয়ে সাউন্ড, সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও ফর্মে থাকা ব্যাটারদের খেলানো হয়- অথচ আমাদের এখানে যাকে খেলানো হচ্ছে তিনি ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির লিগে দুই মৌসুমে কুড়িটির মতো ম্যাচ খেলেই দলে সুযোগ পেয়েছেন। গত চার ইনিংসে তার রান ১৮। সর্বশেষ সেঞ্চুরি ১৫ ইনিংস আগে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। তার প্রিয় প্রতিপক্ষও জিম্বাবুয়ে, যাদের বিপক্ষে সবচেয়ে বেশি ২০৮ রান রয়েছে। এখনও ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে তার খেলা হয়নি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তার টেস্ট গড় ১০, এই ফর্ম নিয়েই তিনি কি আসছে উইন্ডিজ সফরে তিন নম্বরেই ব্যাটিং করবেন? কোচ রাসেল ডমিঙ্গো সমস্যার গভীরতায় গিয়ে সাহসী হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। জানিয়েছেন, ব্যাটিং অর্ডারে পরিবর্তন আনতেই হবে।

টেস্ট ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিন নম্বর জায়গাটিতে ভারত খেলাচ্ছে হনুমা বিহারিকে, যিনি কিনা একশর কাছাকাছি প্রথম শ্রেণির ঘরোয়া ম্যাচে সাত হাজারের কাছাকাছি রান করে তারপর জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছেন। পাকিস্তানে ওই জায়গায় খেলছেন আজহার আলির মতো অভিজ্ঞ একজন। অস্ট্রেলিয়ার লাবুশানে এ মুহূর্তে টেস্ট ব্যাটারদের মধ্যে র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে, তিনি ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির প্রায় আশিটি ম্যাচ খেলে তারপর ব্যাগি গ্রিন ক্যাপ পেয়েছেন। নিউজিল্যান্ডের তিনে খেলা ব্যাটার ডেভন কনওয়ে ১১০টি ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলার পর জাতীয় দলে এসে সাতটি টেস্ট খেলছেন। অর্থাৎ ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ম্যাচগুলোতে বেশি বেশি ম্যাচ খেলে সব ধরনের পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে জয় করে তবেই জাতীয় দলে এসে তারা ভালো পারফর্ম করছেন। সেখানে নাজমুল হোসেন শান্ত ২০১৭ সালে টেস্ট অভিষেকের আগে ২০১৫ মৌসুমে জাতীয় লিগ খেলাই শুরু করেন। জিম্বাবুয়ে আর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুটি সেঞ্চুরিসহ ১৭ টেস্টে তার গড় মাত্র ২৬.৭০। অভিষেকের প্রথম ছয় ইনিংস পর এসে হাফসেঞ্চুরি পেয়েছিলেন। তার ৩২ ইনিংসের ক্যারিয়ারে ২৪ বারই ত্রিশের নিচে আউট হয়েছেন। দশের নিচেই তেরো বার। টেস্ট দলে এত অল্প অভিজ্ঞতায় অপরিপক্ক যাদেরকে নির্বাচিত করা হয়েছে বাংলাদেশ দলে, তারা কিন্তু কেউই সেভাবে সফলতার মুখ দেখেননি। সাদমান ইসলাম অনিক, সাইফ হাসানরা যার টাটকা উদাহরণ।

এটা ঠিক যে, আমাদের এখানে ঘরোয়া ক্রিকেটের পিচ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার মান অত ভালো নয়। আর সে কারণেই নির্বাচকরাও উৎসাহিত হন না জাতীয় লিগ কিংবা বিসিএলে পারফর্ম করাদের মূল্যায়ন করতে। কিন্তু তার পরও এবারের আসরে যখন ফজলে রাব্বি সর্বোচ্চ ৬০৩ রান করেন, অমিত হাসান ৫৯০ রান করেন তখন তাদের নামগুলোও সামনে আসা দরকার। এ বছর মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের পর পাঁচটি ইনিংসে এ পর্যন্ত পঞ্চাশের নিচে দলের প্রথম পাঁচ উইকেট পড়েছে। একবার দু'বার এমন হলেও অঘটন বলা যায়, কিন্তু একই ঘটনা যখন বারবার হতে থাকে, তখন সেই সমস্যার গভীরতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাহলে কোথাও গিয়ে কি নির্বাচকদের ব্যাটার বাছাইয়ে ভুল হচ্ছে? মুমিনুলের সঙ্গে কথা বলে যেমন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন কিছু প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়েছেন, তেমনি নির্বাচকদের কাছেও জানতে চাওয়া দরকার কোথাও কি তাদেরও ভুল হচ্ছে ?