উত্তাল পদ্মার প্রলয়ংকরী রূপ যেমন তাঁদের দেখা আছে, তেমনি তার মায়াবী সুন্দরী রূপের সঙ্গেও তাঁদের গভীর পরিচয় আছে। সাগরের পানে ছুটে চলা প্রগলভা, প্রবলা এই পদ্মা আজ বন্ধন বেঁধেছে দু’পাড়ে। পদ্মাপারের জনপদের এগিয়ে যাওয়ার দিনে উৎসবের রং আজ পুরো দেশে। তা থেকে ক্রীড়াঙ্গনই বা বাদ যাবে কেন। 

যে ক্রিকেটার ঢাকায় আসতে আসতে টিম মিটিং মিস করেছেন, যে ফুটবলার বাড়ির পাশের স্টেডিয়াম থাকতেও শুধু ঢাকার দিকেই তাকিয়ে থাকতেন, যে তীরন্দাজরা ঢাকার পাশের মাঠে খেলার জন্য রীতিমতো আন্দোলন করে গেছেন- তাঁদের জন্য পদ্মা সেতু তো শুধুই কোনো অবকাঠামো নয়। তাঁরা এখন স্বপ্ন দেখতেই পারেন, পদ্মা সেতু পাড়ি দিয়ে জেলার মাঠগুলোতেও আন্তর্জাতিক কোনো টুর্নামেন্ট খেলার। 

বরিশাল, খুলনা, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুরে এখন নিয়মিত ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট বা গেমসের আয়োজন করার উদ্যোগ নিতে পারে ফেডারেশনগুলো। সম্ভাবনার এসব দিক উঁকি দিতেই পুরো ক্রীড়াঙ্গনে বইছে আনন্দের জোয়ার।

বছরে পর বছর যে কষ্টগুলো পোহাতে হয়েছিল, তার শেষ হচ্ছে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের পর। 'আমার মনে আছে একবার ১৪ ঘণ্টা জ্যামে ছিলাম। এখন পদ্মা সেতু হয়েছে বলে স্বস্তি পাচ্ছি। হয়তো ওই সময়টা আর লাগবে না, খুব তাড়াতাড়ি যেতে পারব। ট্রেনিং কিংবা মিটিং কিছুই মিস হবে না আর।' খুলনা থেকে আসা জাতীয় দলের ক্রিকেটার মিরাজের খুশি পদ্মার এই সেতুবন্ধনে।

আরেক ক্রিকেটার সৌম্য সরকারের কাছে এটা অনেক বড় অর্জন। এই জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান তিনি, 'সাতক্ষীরা টু ঢাকা এখন আর খুব বেশি সময় লাগবে না। আর নিজের টাকায় করা আমাদের এই সেতু। এটি অবশ্যই বড় অর্জন।' বাগেরহাটের পেসার রুবেল হোসেনের কাছে এটা স্বপ্নের সেতু, 'দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য এ সেতুটি কতটা উপকার হয়েছে, তা বলে বোঝানো যাবে না। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।'

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ ফুটবলের অন্যতম একটি ভেন্যু গোপালগঞ্জে। মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে এবার এটা হোম ভেন্যু উত্তর বারিধারাও। দুই লেগের লিগ হওয়ায় প্রতিটি দলকে দু'বার করে খেলতে যেতে হয় গোপালগঞ্জে। যাওয়ার পথে মাওয়া ফেরিঘাট কিংবা লঞ্চ পারাপারের যন্ত্রণা পোহাতে হয়। পদ্মা সেতু হওয়ায় এখন সেতুর ওপর দিয়ে অনায়াসে ভেন্যুতে পৌঁছানো যাবে। 

এই আনন্দ পুরো ফুটবলাঙ্গনে। ঢাকা আবাহনীতে খেলা শরীয়তপুরের ছেলে ইমন মাহমুদ বাবুর উচ্ছ্বাসটা যেন একটু বেশিই, 'পদ্মা সেতু দিয়ে আমরা ভেন্যুতে যেতে পারব। এতে করে কষ্টটা অনেকটাই লাঘব হবে। আমার বাড়ি শরীয়তপুরে। এই সেতু আমাদের কতটা উপকৃত হবে, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।'

প্রথম তীরন্দাজ হিসেবে সরাসরি অলিম্পিকে খেলেছিলেন। আরচারিতে বাংলাদেশের বড় তারকা রোমান সানার কাছে এ সেতুটি স্বপ্ন পূরণের চেয়েও বেশি কিছু, 'কত ঘণ্টা যে জ্যামে থাকতাম, তার কোনো হিসাব নেই। সেই দিক থেকে বিবেচনা করলেন আমরা অনেক দিক থেকে পদ্মা সেতুর ফল ভোগ করতে পারব। দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই।' 

ভারোত্তোলক মাবিয়া আক্তার সীমান্তের কাছে আবেগের নাম পদ্মা সেতু, 'আমার ইচ্ছা সেতুটি উদ্বোধন হওয়ার পরই বাড়ি যাবো। এর আগে আমি বাড়ি যাচ্ছি না। আসলে একটা সেতুর সঙ্গে কতটা আবেগ জড়িয়ে আছে, তা বোঝানো কঠিন। সত্যিই আমি খুবই আনন্দিত।' পদ্মা সেতু হওয়ায় জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন, সাবেক দ্রততম মানবী শিরিন আক্তার যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। এখন আর বিড়ম্বনা সইতে হবে না বলে আনন্দিত তাঁরা।