বছর কুড়ি আগেও ক্রীড়া সাংবাদিকদের আড্ডায় একটি কথা চালু ছিল খুব- ‘সম্মানজনক হার’। কোনো ম্যাচে একশর নিচে হার কিংবা প্রতিপক্ষের দু-একটি উইকেট নিতে পারার মধ্যেই গৌরবের ছোঁয়া আর সম্ভাবনার আশা দেখতেন অনেকে। 

রোববার ডমিনিকায় দ্বিতীয় টি২০ ম্যাচে উইন্ডিজের কাছে ৩৫ রানে বাংলাদেশের হারটিকে সেই সময়ের ফিরিয়ে নিলে হয়তো এখনও বলা যেত- ‘একটি সম্মানজনক হার।’ কিন্তু বর্তমান  বাস্তবতা আর আধুনিক ক্রিকেটের বাজারে এ হারটিকে কোনোভাবেই সম্মানজনক বলা যাচ্ছে না। 

বরং ক্রিকেটের এই বিনোদিনী ফরম্যাটে বিরক্তি তৈরি করেছেন এদিন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদরা। দুইশর কাছাকাছি রান তাড়া করতে নেমে ইনিংসের মাঝে ৪৫ বলের মধ্যে নেই কোনো বাউন্ডারি! ম্যাচ জয়ের নেই কোনো তাড়না, লড়াই করার মানসিকতাও যেন উধাও! সিরিজের এখনও একটি ম্যাচ বাকি (বৃহস্পতিবার তৃতীয় টি২০); কিন্তু আপাতত যে দুটি ম্যাচে টাইগারদের ব্যাটিং প্রদর্শিত হয়েছে, তার কোনোটির মধ্যেই টি২০-র মেজাজটাই নেই। 

শুধু পরীক্ষায় বসতে হয় বলে যেন খাতা নিয়ে বসেছেন তাঁরা। দলে দু'জন বিশ্বমানের ফ্র্যাঞ্চাইজি তারকা থাকতেও শ্রীহীন বোলিং, আগ্রাসী ব্যাটিং করতে গিয়ে ব্যাটারদের পাওয়ারলেস হিটিং আর অধিনায়কের বোলিং পরিবর্তনের দুর্বল কৌশল- সব মিলিয়ে সাদামাটা এই উইন্ডিজের সামনেও বড্ড বেশি বেমানান রিয়াদের এই দল।

ম্যাচ শেষে যেমনটা বলে থাকেন অধিনায়করা, রিয়াদও তেমনই বলেছেন। প্রথমে বোলারদের দিকে অনুযোগের আঙুল তুলে পরে ব্যাটারদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দিলেন। যেখানে তিনি নিজেই ব্যাট হাতে ব্যর্থ। শেষ ৯ ইনিংসে মোট ১০০ রান। যার মধ্যে আবার মাত্র তিনটিতে স্ট্রাইক রেট একশর ওপরে!

‘শুরুর দিকে অনেক বেশি আলগা বল করেছি, যা ওদের মোমেন্টাম দিয়ে দেয়। রভম্যান পাওয়েল তা আবার আমাদের কাছ থেকে তা ছিনিয়ে নেয়।’ ইনিংসের ১৫ থেকে ১৭ ওভারের মধ্যে ৫৫ রান তুলে নেয় ক্যারিবীয়রা। ঠিক এখানেই ঘুরে যায় ম্যাচের চাকা। সাকিবের কাছ থেকে ২৩ আর তাসকিনের কাছ থেকে ২১ রান খসিয়ে নেন তাঁরা- আর একেই বলে টি২০-র মেজাজ।

‘বোলিংয়ে আমরা কয়েকটি ওভার বেশি রান দিয়ে ফেলেছি। টি২০-তে এমন হতেই পারে। তবে যেভাবে আমাদের পরিকল্পনা ছিল, যে জায়গায় বল করার কথা ছিল, সেখানে আমরা করিনি। ওটা সম্ভবত একটা দিক।’

কিন্তু সাকিব, মুস্তাফিজ, তাসকিনরা কেন জায়গামতো বোলিং করতে পারলেন না? তার কোনো ব্যাখ্যা নেই রিয়াদের কাছে। যেখানে এক ওভার বোলিং করে মেডেন উইকেট নিলেন মোসাদ্দেক, সেখানে কেন তাঁকে আর বোলিংয়ে আনলেন না রিয়াদ? অধিনায়কের যুক্তিতে সেই সনাতনী ভাবনা। 

‘মোসাদ্দেককে অবশ্যই বোলিং করাতাম। তবে রভম্যান পাওয়েল যখন ব্যাটিংয়ে ছিল, দু'জনই ডানহাতি ব্যাটার- তার ওপর ওই পাশে ছোট ছিল সীমানা। এজন্য ঝুঁকিটা নিইনি।’ 

টি২০-তে ঝুঁকি নিতেই হয়, বাংলাদেশের ব্যাটিংয়েও সেই ঝুঁকি নেননি কেউ, আফিফ আউট হওয়ার পর। অথচ মুস্তাফিজ, শরিফুল আর তাসকিন বাদ দিলে একাদশে প্রত্যেকেই স্বীকৃত ব্যাটার। দুখের বিষয় এটাই যে, তাঁদের মধ্যে কোনো হার্ডহিটার নেই। এই শূন্যতা অতীতেও ছিল, বতর্মানেও আছেও। ২০১৮ সালের নিদহাস ট্রফিতে শ্রীলঙ্কাকে হারানোর পর বাংলাদেশ ড্রেসিংরুম থেকে একটি কথা বলা হয়েছিল- 'ব্র্যান্ড অব বাংলাদেশি ক্রিকেট'। 

যার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কেউ কেউ বলেছিলেন- নিজেদের সীমাবদ্ধতা মেনেই ছক্কা নয়, চারের বাউন্ডারিতে নজর দেওয়া। কোনো একজনের বিধ্বংসী ইনিংসে নির্ভর না করে সবাই মিলে ছোট ছোট কার্যকরী ইনিংস খেলা। এদিনও রিয়াদ সেই সমন্বিত চেষ্টার কথাই বলেছেন। 'টি২০-তে আমরা যে রকম দল, ভালো করতে হলে দল হিসেবে ভালো খেলতে হবে। ছোট ছোট প্রতিটি জায়গায় যার যা ভূমিকা, সুনির্দিষ্টভাবে তা পালন করতে হবে। এটাই আমাদের শক্তির জায়গা।'

এই নিজের জায়গা থেকে সবাই কি তা করতে পারছেন। সাকিব হয়তো শেষ পর্যন্ত চার ছক্কায় ৫২ বলে ৬৮ রান করেছিলেন, কিন্তু এটাও তো ঠিক একসময় তার রান ৩৭ বলে ছিল ৩৫। ম্যাচের পর তামিম ইকবালের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে হাততালির ইমোজি দিয়ে লেখা হয়েছে 'ইন্টারন্যাশনাল টি২০'। তামিম কী বোঝাতে চেয়েছেন তা স্পষ্ট করেননি, তবে অনেকেই তার এই স্ট্যাটাস নিয়ে ফেসবুকে সমালোচনা করার পর সেটি মুছে ফেলেছেন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই অনেকে অনেক কিছুও ভেবে নিয়েছেন।