স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়ার মতো উদারতা উপমহাদেশের খুব বেশি ক্রিকেটার দেখাতে পারেন না। বরং উপার্জনের পথ খোলা রাখতে বিভিন্ন কলাকৌশলে জাতীয় দলে টিকে থাকার সংস্কৃতি চর্চিত। ভারত, পাকিস্তানের চেয়েও এই প্রবণতা বাংলাদেশ ক্রিকেটে একটু বেশিই। তাই বিসিবিকেই বাধ্য হয়ে সিনিয়র ক্রিকেটারদের বাদ দেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

২০১৭ সালে যেমন মাশরাফি বিন মুর্তজাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে আন্তর্জাতিক টি২০ থেকে অবসরের ঘোষণা দিতে হয়েছিল। ২০২০ সালে ছাড়তে হয়েছিল ওয়ানডে দলের নেতৃত্ব। জাতীয় দলের স্বার্থে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকেও ‘থ্যাংকস’ বলে দেওয়া হতে পারে। 

বিসিবির একজন পরিচালক জানান, আজ দ্বিপক্ষীয় সভায় টি২০ অধিনায়ককে বোর্ডের পরিকল্পনার কথা জানানো হবে। ছেড়ে দিতে বলা হবে টি২০ দলের নেতৃত্ব। বিসিবির প্রস্তাবে রাজি না হলে জাতীয় দল থেকে বাদ পড়তে হবে মাহমুদউল্লাহকে। জোরাজুরি করলে আন্তর্জাতিক টি২০ থেকে বিদায় নেওয়ার মঞ্চও হারাতে পারেন তিনি।

ব্যাড প্যাচে থাকায় শ্রীলঙ্কার সিরিজের পরই টেস্টের নেতৃত্ব হারান মুমিনুল হক। বিসিবি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়ার পর নিজে থেকেই ক্যাপ্টেনসি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর দিয়ে তৃতীয় মেয়াদে টেস্টের নেতৃত্বে ফেরেন সাকিব আল হাসান। বাঁহাতি এ অলরাউন্ডারের কাছ থেকেই ২০১৯ সালে টেস্টের নেতৃত্বের হাত বদল হয়েছিল।

রিয়াদ যাঁর কাছ থেকে টি২০র নেতৃত্ব পেয়েছিলেন, সেই সাকিবকেই অনিচ্ছায় ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে দায়িত্ব। সাকিব জিম্বাবুয়েতে না গেলেও নেতৃত্বে পরিবর্তন নিশ্চিত করতে চায় বোর্ড। কারণ বিসিবি চাচ্ছে, জিম্বাবুয়ে সফর দিয়ে বিশ্বকাপ দলটাকে গুছিয়ে নিতে। তাই মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও মুশফিকুর রহিমকে টি২০ থেকে বিশ্রাম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে। 

পেশাদারিত্বের সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতেই রিয়াদের সঙ্গে বিসিবি কর্তাদের বৈঠক। এই আনুষ্ঠানিকতাটুকুর জন্যই সফরের চার দিন বাকি থাকলেও দল ঘোষণা করতে পারেননি নির্বাচকরা।

উইন্ডিজ সফর শেষে রিয়াদ বৃহস্পতিবার দেশে ফেরায় আলোচনার টেবিলে বসার সুযোগ এসেছে। জাতীয় দল নির্বাচক প্যানেলের সদস্যদের উপস্থিতিতে একজন পরিচালক বোর্ডের বার্তা জানিয়ে দেবেন অধিনায়ককে। যদিও ক্রিকেটপাড়ার গুঞ্জন, জিম্বাবুয়ে সফর দিয়ে রিয়াদকে টি২০ ক্যারিয়ার শেষ করতে বলা হতে পারে। তিনি তাতে রাজি হয়ে যেতে পারেন বলে মনে করেন সাবেক ক্রিকেটাররা। 

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান অধিনায়ককে জিম্বাবুয়ে সফরের টি২০ দলেই রাখতে চাচ্ছে না বিসিবি। কারণ তিনি বিশ্বকাপ পরিকল্পনাতেই নেই। বিশ্বকাপের ঠিক তিন মাস আগে টি২০ দলের পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে বিকেএসপির পরামর্শক কোচ নাজমুল আবেদীন ফাহিম বলেন, '২০২১ সালের টি২০ বিশ্বকাপের পরই দলকে ঢেলে সাজালে ভালো হতো। তবে এখনও যেহেতু সময় আছে তাই সেরা দল বেছে নিতে এক দুটি জায়গায় পরিবর্তন করা যেতে পারে। আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য জিম্বাবুয়ে আদর্শ প্রতিপক্ষ। পরিবর্তনটা যেন মেধাবী ক্রিকেটার দিয়ে হয়।’

জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটাররা মনে করেন, টি২০ অনেক বেশি তারুণ্যনির্ভর। রকিবুল হাসানের মতে, 'টি২০ ক্রিকেটারদের ফিটনেস বেশি ভালো থাকতে হয়। ফিল্ডার ভালো হতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই তরুণদের মধ্যে ক্ষিপ্রতা একটু বেশি থাকে। আমাদের দলে তরুণ খেলোয়াড় বেশি হলেও আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা আছে। তাই এক দুটি জায়গায় পরিবর্তন করলে সমস্যা হবে না।’

টি২০ সিনিয়রদের জন্য বেশি লাভজনক। কম পরিশ্রম করে ২ লাখ টাকা ম্যাচ ফি পাওয়া যায়। বিপিএলের বাজারে আইকন ক্রিকেটার হিসেবে সর্বোচ্চ সম্মানী পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে। মাহমুদউল্লাহ বা মুশফিক বিশ্বকাপ পর্যন্ত টিকে গেলে ম্যাচ ফি থেকেই অন্তত ৩০ লাখ টাকা করে আয় করতে পারবেন। জিম্বাবুয়ে সফর, এশিয়া কাপ, নিউজিল্যান্ডের ত্রিদেশীয় সিরিজ এবং বিশ্বকাপ মিলে অন্তত ১৫টি ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ। আর তাঁরা দু'জন দলে থাকলে ম্যাচ খেলা নিশ্চিত। 

বিশ্বকাপ এবং এশিয়া কাপের অংশগ্রহণ ফি’র ভাগও পাবেন। একজন সাবেক ক্রিকেটারের মতে,  ‘রোজগারের এমন সুযোগ লুফে নিতে বর্ষীয়ান খেলোয়াড়দের স্বার্থপর হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। আমি এতে দোষও দেখি না। দেশের স্বার্থ মাথায় রেখে কার্যকরী দল গোছানোর দায়িত্ব তো বিসিবির। তাই বিসিবিকেই সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

মুশফিকের টি২০ ক্যারিয়ারের বয়স আর বাংলাদেশের টি২০-র সময়কাল সমান। ২০০৬ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক টি২০ অভিষেক ম্যাচ দিয়েই শুরু হয়েছিল তার। ১৬ বছরের টি২০ ক্যারিয়ারকে এখনও টেনে নেওয়ার ইচ্ছা মুশফিকের। তাই তিনি জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার কথা স্বপ্নেও ভাবেন না। ২০০৭ সালে টি২০ অভিষেক করা মাহমুদউল্লাহও কালে কালে কম খেলেননি। তবুও তাঁরা তামিম ইকবালের মতো টি২০ ছেড়ে দেওয়ার সাহস দেখাতে পারছেন না।