'বাংলাদেশ কোনো পদক পেয়েছে?'- বার্মিংহামে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে প্রতিদিনই এমন প্রশ্ন শুনতে হয়। উত্তর দিতে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়, 'এখনও তো গেমস শেষ হয়নি।' সত্যিই তো কমনওয়েলথ গেমসের পর্দা তো এখনও নামেনি। ৮ আগস্ট ভাঙবে ৭২টি দেশের ক্রীড়াবিদদের মিলনমেলা। তবে শুক্রবারই যে শেষ হয়ে গেছে বাংলাদেশের ব্যর্থতার কমনওয়েলথ গেমস। 

সাঁতার, অ্যাথলেটিকস, জিমন্যাস্টিকস, ভারোত্তোলন, বক্সিংয়ের পথ অনুসরণ করেছে কুস্তিও। গতকাল প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তি মেলাতে পারেননি কুস্তিগিররা। টেবিল টেনিসে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার প্রাপ্তি ছাড়া ইংল্যান্ডের শিল্পনগরীতে বাংলাদেশের অর্জনের খাতা শূন্য। দুই যুগ পর কমনওয়েলথ গেমসে পদকহীন বাংলাদেশ! অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কান অ্যাথলেটরা পদকের মঞ্চে উড়িয়েছেন নিজ দেশের পতাকা।

বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকাও উড়েছে বার্মিংহামের আকাশে। সেটা গেমসের মূল ভেন্যুতে। কিন্তু জাতীয় সংগীতের সুরের মূর্ছনায় যেভাবে ওড়ার কথা ছিল পতাকা, সেই লক্ষ্যে তো পৌঁছাতে পারেননি আলী কাদের হক, মাবিয়া আক্তার সীমান্ত, ইমরানুর রহমানরা, পার হতে পারেননি হিটের গণ্ডি। অবশ্য দেশ ছাড়ার আগে পদকের আশা নেই- এমন কথা বলেছিলেন বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা। তাঁদের আশাহত মন্তব্যের মূলেই ছিল শুটিং না থাকা। ১৯৭৮ সালে বিশ্বের দ্বিতীয় ক্রীড়াযজ্ঞে অংশগ্রহণের যাত্রা করেছিল বাংলাদেশ। এবার নিয়ে দশবার কমনওয়েলথ গেমসে অংশগ্র্রহণ।

প্রথমবারসহ ১৯৯৪ এবং ১৯৯৮ সালে কোনো পদক পায়নি তারা। বাকি সাত আসরের মধ্যে ২টি স্বর্ণ, ৪টি রৌপ্য এবং ২টি ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছিল বাংলাদেশ। আর সব পদকই এসেছিল শুটিং থেকে। এবার শুটিং নেই বলে পদকের স্বপ্ন না থাকলেও পারফরম্যান্সে উন্নতির আশা করেছিল সবাই। কিন্তু ট্র্যাক, পুল, রিং- সব জায়গাতেই যেন ব্যর্থতার গল্প। প্রশ্ন হলো, এক শুটিংই কি বাংলাদেশের সব। তাহলে বাকি ফেডারেশনগুলোর কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কর্মকর্তাদের শুধু না পাওয়ার হতাশা। সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে আর্থিক সমস্যাই যেন বড় তাদের কাছে।

এর চেয়ে বড় সমস্যা তো শ্রীলঙ্কারই আছে। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত দেশটি। যেখানে বাংলাদেশ ২৪ বছর পর পদকহীন, সেখানে ২৪ বছর পর অ্যাথলেটিকসে শ্রীলঙ্কাকে ব্রোঞ্জ পদক এনে দিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন ইয়পুন আবেকুন। তাদের চেয়ে এক ধাপ ওপরে পাকিস্তান। মাবিয়া আক্তারকে ঘিরে যে ভারোত্তোলনে আশা দেখছিল, সেই ওজনশ্রেণির লড়াইয়ে পাকিস্তানকে স্বর্ণ এনে দিয়েছেন দস্তগীর বাট। আরেক প্রতিবেশী ভারত সবার চেয়ে এগিয়ে। গতকাল পর্যন্ত ৬টি স্বর্ণসহ ২০টি পদক জিতেছে বন্ধুপ্রতিম দেশটি। পদকের মঞ্চে দাঁড়িয়ে পড়শিদের মুখের হাসি দেখে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদরা শুধু আফসোসই করে যাচ্ছেন। বড় মঞ্চে ভালো করার যে স্পৃহা, তা তো নেই, উল্টো সমালোচনা করেই যাচ্ছেন মাবিয়া-সোনিয়ারা।

বার্মিংহামের ভেন্যু থেকে ভেন্যু; সব জায়গাতেই পদচারণা ছিল বিওএ মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজার। বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের অসহায়ত্বের চিত্রটা যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি করে না পারার কারণগুলোও মুখ ফুটে বলে দিয়েছেন তিনি, 'জিমন্যাস্টিকস সম্ভাবনাময় ইভেন্ট; কিন্তু ভেন্যু নিয়ে মারামারিতে ঠিকমতো অনুশীলন করতে পারছেন না খেলোয়াড়রা। ভালো করতে হলে আপনাকে অবকাঠামো মজবুত হতে হবে। আমাদের তো সেগুলো নেই।' অবকাঠামো করতে হলে প্রচুর পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। সেখানেও যে সমস্যা দেখছেন বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের এ মহাসচিব, 'আমাদের অর্থ আছে; কিন্তু ব্যবস্থাপনায় সমস্যা রয়েছে। কমনওয়েলথ গেমসের জন্য আমরা অনেক আগে অর্থ চেয়েছি। সেই অর্থ পাওয়ার চিঠি গেমসের সময় পেয়েছি। এখন গেমস শেষ হলো, টাকাও এলো, তাতে লাভ কী হলো?'

সাত ডিসিপ্লিনের ২৯ ক্রীড়াবিদসহ ৫০ জন কন্টিনেনজে কমনওয়েলথ গেমসে বাংলাদেশের লাভের খাতা শূন্য।