'স্ট্রাইক রেট'- শব্দটি নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তি আছে তাঁর, এটা তামিম ইকবাল নিজেও অস্বীকার করেন না। সংবাদ সম্মেলনে কেউ তা নিয়ে প্রশ্ন করলেও বিরক্ত হন তিনি। এমনকি সাংবাদিককুলে অনুরোধও করেছেন তিনি, যেন এই স্ট্রাইক রেট নিয়ে বারবার প্রশ্ন করা না হয়। তার পরও প্রশ্নটা এসে যায়- সেদিন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে হাফ সেঞ্চুরি করতে শেষ ৬টি রান নিতে কি ২২ বল খেলা বেশি ছিল না? শুরুর পাওয়ার প্লেতে নেমে যে ওপেনার ৪৯ বলে ৪০ রান করেন, তিনিই কিনা ৫০ করেন ৭৯ বলে! 

২২৯ ওয়ানডে খেলা ব্যাটার হাফ সেঞ্চুরির জন্য নার্ভাস ছিল- এটা কোনো যুক্তিতে মেনে নেওয়া যায় না। তার ওপর ওই সময় বোলিংয়ে ছিলেন পার্টটাইম বোলার মিল্টন শুম্বা। অধিনায়ক নিজে যখন এমন স্ট্রাইক রেটে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তখন বাকিদের কী বলবেন তিনি? ম্যাচ শেষে তামিম ইকবাল বলেছেন, ১০ থেকে ১৫টি রান কম হয়েছিল। ইঙ্গিত করেছেন, উইকেট হাতে রেখেও শেষ দিকে প্রত্যাশামতো স্লগ করতে পারেননি ব্যাটাররা।

যার প্রমাণ মেলে শেষ ৫ ওভারে মাত্র ৩৯ রান আসায়। শেষের ৩ ওভারে মুশফিকের সামনেও হাফ সেঞ্চুরির হাতছানি ছিল। সেই ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে তিনি ৪১ থেকে ৫২ রানে পৌঁছতে খেলেন ১২টি বল! অথচ তিনি ছিলেন সেট ব্যাটার। চার-ছক্কার আগ্রাসী মানসিকতা তাঁরই দেখানোর প্রয়োজন ছিল। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ১২ বলে ২০ রানে অপরাজিত থাকলেও তিন চারের বেশি বাউন্ডারি মারতে পারেননি। তাঁরা প্রত্যেকেই খুশি ছিলেন এই ভেবে যে, দলের স্কোর তিনশ পার হয়েছে। ঠিক এখানেই আসলে মানসিকতার দৈন্য ধরা দেয়। 

সেই নব্বই দশকের ট্রিপিকাল ব্যাটিং- শুরুর কুড়ি ওভারে একশ, পরের পঁচিশ ওভারে দেড়শ আর শেষের পাঁচ ওভারে যা আসে সেটাই বোনাস- এভাবেই নব্বইয়ের শুরুতে প্রতিটি দল ওয়ানডে খেলে সফলতা পেয়ে থাকত। যদিও ওই দশকের মাঝামাঝি সময়ে সেই ধারণা বদলে দেন শ্রীলঙ্কার দুই ওপেনার জয়সুরিয়া আর কালুভিথারানা। তাঁরা দু'জনই শুরুর পাওয়ার প্লেতে চার-ছক্কা হাঁকিয়ে প্রমাণ করে দেন যে, ওয়ানডেতে তিনশ রান করা সম্ভব। বর্তমান টি২০ বাজারে এই তিনশও নিরাপদ কিছু নয়। হারারের মতো ব্যাটিং সহায়ক উইকেট এবং প্রতিপক্ষের সাদামাটা বোলিংয়ের সামনে অন্তত সাড়ে তিনশর লক্ষ্য ধরা অস্বাভাবিক ছিল না।

কিন্তু ওই যে নব্বই দশকের মানসিকতা, শুরুতে ধরে খেলতে হবে-

এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি কেউ। তামিম ইকবাল প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ওয়ানডেতে আট হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন, নিঃসন্দেহে এটি ভালো সংবাদ। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত মাইলফলকের দিনে দল কী পেল? আট হাজারি ক্লাবে তামিম যেখানে ৩৩ নম্বরে, সেখানে তাঁর থেকে কম স্ট্রাইক রেটে রয়েছেন মোট ১১ জন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই ১১ জনের মধ্যে মাত্র একজন ওপেনার সৌরভ গাঙ্গুলী যাঁর স্ট্রাইক রেট তামিমের চেয়ে কম। কিন্তু সেটাও ছিল টি২০ যুগে প্রবেশ করার আগের সময়ে।

অর্থাৎ আধুনিক ক্রিকেটে ওয়ানডেতে আট হাজার রান করা ব্যাটারদের মধ্যে তামিমের স্ট্রাইক রেট সবচেয়ে কম। ইদানীং তাঁর মতো নিরাপদ শুরুর কৌশল নিয়েছেন লিটন দাসও। এভাবে প্রত্যেকেই যদি ঝুঁকিহীন নিরাপদ ব্যাটিংই করে যান, তাহলে সেই 'নব্বই দশকের' মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসাটা সত্যিই কঠিন।