সাকিব আছেন সাকিবের মতোই

এহ্‌সান মাহমুদ


টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন চলছে : বাংলাদেশের জান, বাংলাদেশের প্রাণ- সাকিব আল হাসান। টিভি সেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছোট্ট শিশু হাত নাড়ছে। পাশে তার ছোট্ট খেলনা ক্রিকেট ব্যাট। বছর পাঁচেক বয়সের এই ছোট্ট ছেলেটিও ক্রিকেটার হতে চাচ্ছে। এমন দৃশ্য আজকাল প্রায়ই দেখা যায়। 

এবার একটু পেছনে ফেরা যাক। ২০০৬ সালের কথা। জিম্বাবুয়ে সফরের সময় বাংলাদেশ ক্রিকেটের জাতীয় দলে অভিষেক হয় তিন ক্রিকেটারের- ফরহাদ রেজা, মুশফিকুর রহিম ও সাকিব আল হাসান। সেই সময়ে ফরহাদ রেজা ও সাকিব আল হাসানকে বলা হতো বাংলাদেশ ক্রিকেটের মেধাবী মুখ! ফরহাদ রেজা এখন বাংলাদেশ ক্রিকেট থেকে প্রায় ভুলতে বসা নাম। শুরুতে আলো ছড়াতে না পারলেও পরবর্তীতে অধ্যবসায়ী মুশফিক এখনও বাংলাদেশ ক্রিকেটের নির্ভরতার নাম। আর সাকিব আল হাসান শুধু নিজের দেশ নয়, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও দামি ও নামি খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেটে সাকিব অনেক 'প্রথম'-এর অধিকারী। বাংলাদেশ দলের হয়ে খেলা আরেকজন ক্রিকেটার আছেন যিনিও বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি হলেন মোহাম্মদ আশরাফুল। ক্রিকেটার তামিম ইকবাল একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আশরাফুল ভাই আমাদের ক্রিকেটের প্রথম প্রেম! সেই আশরাফুলের পরিণতি বাংলাদেশের অসংখ্য ক্রিকেটভক্তকে আশাহত করেছিল। 

এর পরেই বাংলাদেশ ক্রিকেট পেল সাকিব আল হাসানকে। যেন আর কারও দরকার নেই! মাঠের ভেতরে এবং বাইরে সাকিব হয়ে উঠলেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের আলোচনার মূল কেন্দ্র। টানা ম্যাচ খেলার রেকর্ড, টানা ম্যান অব দ্য ম্যাচ, ম্যান অব দ্য সিরিজ, সেরা বোলার, সেরা ব্যাটসম্যান থেকে শুরু করে অনেক সেরার রেকর্ড জমা আছে তাঁর নামের পাশে। আবার নামের পাশে বসিয়েছেন সিনিয়র খেলোয়াড়দের সম্পর্কে বাজে মন্তব্যকারী, কোচের সঙ্গে বনিবনা না হওয়া, অনুমতি না নিয়ে বিজ্ঞাপনে অংশ নেওয়া, টিমমেটদের সঙ্গে মন্দ ব্যবহারকারী, প্রকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া, জুয়াড়িদের প্রস্তাব গোপন করাসহ নানা ঘটনা। 

সাকিবকে নিয়ে সর্বশেষ বিতর্কের উত্তাপ আঁচ করা যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকালেও। বেটিং এবং ক্রিকেট জুয়া নিয়ে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। এবার জানা গেল 'বেট উইনার' নামে এক প্রতিষ্ঠানের। যার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন সাকিব। সপ্তাহখানেক আগেও যে প্রতিষ্ঠানের নাম খুব একটা পরিচিত ছিল না, এখন তা জানা হয়ে গেল। বেট উইনার মূলত ব্যাটিং আর ক্যাসিনোর ওয়েবসাইট। বাংলাদেশের আইনে তো বটেই ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা আইসিসির আইনেও বেটিং নিষিদ্ধ। আর এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে সাকিব নিজের ফেসবুক পেজে তা ঘোষণা দিয়েছেন। যে কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিছু নিয়ম রয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডেরও (বিসিবি) তেমন কিছু নিয়ম রয়েছে। নিয়ম অনুসারে কোনো খেলোয়াড় কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি করতে গেলে বিসিবি থেকে অনুমতি নিতে হয়। 

সাকিব সেই অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। অবশ্য এটাই প্রথম নয়। এমন শৃঙ্খলাভঙ্গের কাজ সাকিব অতীতে বহুবার করেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রায় ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে খেলা একজন খেলোয়াড়ের এমন আচরণের একটিই ব্যাখ্যা হতে পারে। আর তা হলো- কোনো নিয়মনীতিকে তোয়াক্কা না করা। আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, অল্প কিছুকাল আগেই সাকিব ফিপিংয়ের প্রস্তাব গোপন করার অপরাধে আইসিসির দেওয়া এক বছরের নিষেধাজ্ঞা পিরিয়ড কাটিয়ে এলেন। সবাই আশা করেছিল, এই নিষেধাজ্ঞা এক নতুন সাকিবকে ফিরিয়ে দেবে! কিন্তু দেখা গেল, সাকিব আছেন সাকিবের মতোই। সাকিব নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। কিন্তু এই বার্তা ভুলে গেলে চলবে না, কেউই অপরিহার্য নয়। দেশের পরিচয়ে খেলার সুযোগ পেয়েছেন বলেই আজকের সাকিব আল হাসান- এটা ভুলে গেলে চলবে কেন! 

গত দুই দশকে বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে যতটা উন্মাদনা দেখিয়েছে, তা খেলাধুলার আর কোনো বিভাগে ছিটেফোঁটাও পৌঁছায়নি। এর কারণগুলোর মধ্যে আছে- দেশি-বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির বিজ্ঞাপন, আন্তর্জাতিক বাজার, বিদেশি খেলার প্রতি আকর্ষণ ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তাসহ আরও কিছু বিষয়। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের গড় সফলতার হার অপরাপর দলের তুলনায় তলানিতে থাকলেও ক্রিকেটারদের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার, বিলাসী জীবনযাপন ও রাতারাতি তারকাখ্যাতি নতুন প্রজন্মকে ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে। সেখানে সাকিব আল হাসানের মতো তারকা ক্রিকেটার অনেকের কাছে হয়ে আছেন আদর্শ। একজন পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে সাকিবের কাছে তাই পেশাদারি আচরণ প্রত্যাশিতই থাকে সবার। আমাদের রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে সরকারপ্রধান প্রত্যেকেই ক্রিকেটের জয়কে উদযাপন করেন। এসব খবর জনমনে আনন্দ বার্তা ছড়ায়। কোনো কোনো বিজয়ের পর বিজয়ী দলকে বিশেষ উপহার, সরকারপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ সংবাদমাধ্যমে বিশেষভাবে প্রকাশ করা হয়। বিশেষ করে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কয়েকজন খেলোয়াড় সরাসরি রাজনীতিতে অংশ নিয়েছেন। গত নির্বাচনের আগমুহূর্তে সাকিব আল হাসানেরও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই সময়ে সরকারপ্রধান তাঁকে আরও কিছুকাল খেলোয়াড়ি জীবন কাটাতে পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানা যায়। শুধু ক্রিকেটকেই অবলম্বন করে রাজনীতির ময়দানে লড়াই করার নজির এশিয়ার কয়েকটি দেশেও রয়েছে। তবে তা খেলোয়াড়ি জীবন থেকে অবসর গ্রহণের পর। খোলোয়াড় হিসেবে থাকাকালে নিয়ম না মানায় অনেক তারকা খেলোয়াড়কেই বহিস্কার হতে হয়েছে। এমন উদাহরণ দিতে হলে অনেক নাম যুক্ত করা যায়। 

সাকিব আল হাসান বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের হয়ে অনেক ম্যাচজয়ী খেলা খেলেছেন। দেশকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাই বলে একের পর এক নিয়মনীতি ভেঙে চলবেন- এটা হতে পারে না। কেননা, সমাজে 'দুষ্টের দমন শিষ্টের লালন' বলে একটি বিষয় রয়েছে। ক্রিকেট যেখানে একটি কঠোর শৃঙ্খলার খেলা, সেখানে একজন খেলোয়াড় কেবল ভালো খেলোয়াড়- এই অজুহাতে একের পর এক শৃঙ্খলাভঙ্গ করে পার পেয়ে যেতে পারেন না।