যাঁকে চিনেছিল টেনিস, তাঁকে কি সহজে ভোলা যাবে! আমেরিকান জনপ্রিয় লেখক ক্রিস্টোফার ক্লেরি ২০২১ সালে রজার ফেদেরারের জীবনী নিয়ে একটি বই প্রকাশ করেছিলেন। যার নাম 'দ্য মাস্টার :দ্য ব্রিলিয়ান্ট ক্যারিয়ার অব রজার ফেদেরার।' টেনিসের দর্শক ভুবনে দারুণভাবে জায়গা করে নেয় বইটি। ৪০০-এরও বেশি পৃষ্ঠার বইটির পরতে পরতে কেবল একজন কিংবদন্তির কথা, তাঁর অর্জন-বিসর্জন, চড়াই-উতরাই, কোর্টের উচ্ছ্বাস, জীবনযুদ্ধ এবং গোধূলিলগ্ন- মোটামুটি সবই উঠে এসেছে। তবুও এক সাক্ষাৎকারে এই লেখকের অতৃপ্তি- 'আমি তো তাঁর ঘরের কেউ নই কিংবা বন্ধুও না। মনে হয় আরও কিছু লিখতে পারলে ভালো হতো।'

আহা রজার, যাঁর জন্য আজকের টেনিস এতটা মায়াবী, এতটা সুন্দর, তাঁকে নিয়ে দিস্তায় দিস্তায় লেখার পরও একজন লেখক যখন তৃপ্তির ঢেঁকুর গিলতে পারছেন না। না জানি আগামীতে তাঁকে কোর্টে না দেখে কতটা আফসোস করেন টেনিসপ্রেমীরা।

এটাই তো জীবন, এটাই জীবনের নাম। সবকিছুর শুরু যেমন আছে আবার শেষও আছে। দুই যুগের বর্ণিল এক ক্যারিয়ারে যখন সমাপ্তি চিহ্নটা এঁকে দিলেন ফেদেরার, পুরো বিশ্বে রীতিমতো হইচই। অথচ অবসর বলাটা অনুমিতই ছিল। ফর্ম হারানো, ইনজুরির সঙ্গে নিয়মিত লড়াই আর বয়সের ভারে গত কয়েক বছরে চেনা ফেদেরারের দেখা মেলেনি। হয়তো মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে এ ভেবে, তাঁর মতো এমন ওজনদার তারকা আর নামবেন না গ্র্যান্ডস্লামের উঠানে। তবু যেতে দিতে হয়। এটাই প্রকৃতির নিয়ম।

ফেদেরার টেনিসের মানুষ হলেও তাঁর গি টা ছিল অনেক বড়। ফুটবল, ক্রিকেট, বাস্কেটবল- বলা যায় ক্রীড়ার সব আঙিনার খেলোয়াড়রা তাঁর খেলা উপভোগ করতেন প্রাণভরে। তাইতো একজন আইকন, একজন মাস্টারমাইন্ড, একজন কা ারির এমন বিদায়ে নাদাল-জকোদের মনের সুতায় যেমন টান লেগেছিল, একইভাবে মেসি-শচীনদেরও।

এইতো সেপ্টেম্বরের পরই ফেদেরারকে আর দেখা যাবে না টেনিসের কোনো দুর্গে। অসংখ্য ম্যাচের সাক্ষী, অজস্র রেকর্ডের রাজার এমন প্রস্থানে কাঁদছে তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীদের মন। কেউ আবেগী চিঠি, কেউ প্রশংসার মালা, কেউ আবার তাঁর জন্য রেখেছেন শুধুই দীর্ঘশ্বাসের ডালা। সবকিছুই তাঁর জন্য ভালোবাসাস্বরূপ। যদিও তিনি বলেছেন, প্রতিযোগিতার ময়দানে তিনি আর নামবেন না র‌্যাকেট হাতে কিন্তু টেনিসকে তিনি আগলে রাখবেন বাকিটা জীবন। হতে পারে সেটা অন্য কোনো ভূমিকায় বা শখের বসে।

২৩ সেপ্টেম্বর থেকে লন্ডনে শুরু লেভার কাপ। শেষ হবে ২৫ সেপ্টেম্বর। তিন দিনের এই প্রতিযোগিতার পরই বিদায়ঘণ্টা বাজবে রজারের। হয়তো সেদিন ল্যাপ অব অনারে সবাইকে গুডবাই বলবেন সুইস সম্রাট। মনের অজান্তে চোখের কোনে জমা হবে ছেড়ে যাওয়ার অশ্রু। সেই অশ্রু মুছতে মুছতে আবার মাইক্রোফোনের সামনে দেবেন কোনো আবেগী বার্তা। যা ছুঁয়ে যাবে উপস্থিত সবার হৃদয়।

কুড়িটি গ্র্যান্ডস্লাম, ঘাসের কোর্টের রাজত্ব আর টেনিসকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া মানুষটিকেও চড়তে হবে জীবনের নতুন কোনো ট্রেনে। ওই যাত্রা এত আলোকিত হবে কিনা কে জানে। তবু সবার শুভকামনা তাঁর জন্য, 'ভালো থাকুক ফেদেরার। ভালো যাক তাঁর বাকিটা সময়।'