দি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের আজীবন সদস্য অধ্যাপক ড. আখতার হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তিনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের একাডেমিক উপদেষ্টা ছাড়াও পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, ইউএনডিপিসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানে। আখতার হোসেন সরকার, জননীতি, প্রশাসনিক উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় সরকার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। তিনি ১৯৮১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগ থেকে স্নাতক এবং ১৯৮৬ সালে ভারতের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন।
সমকাল: জেলা পরিষদের যে ভোটিং ব্যবস্থা, এটা কি যথাযথ?
আখতার হোসেন: এই ব্যবস্থা আংশিকভাবে উপজেলা পরিষদেও রয়েছে। যেমন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই উপজেলা পরিষদের সদস্য; সেখানে শুধু চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। এদিকে জেলার সব ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যান, মেয়র, সদস্যরা জেলা পরিষদের ভোটার। এটা এক ধরনের ইলেকটোরাল কলেজ সিস্টেম। ভারতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এভাবে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও প্রায় একই পদ্ধতিতে হয়।
সমকাল: গুরুত্বের দিক দিয়ে জেলা পরিষদের অবস্থান কি উপজেলা পরিষদের চেয়ে ম্লান মনে হয় না?
অখতার হোসেন: ম্লান আমি বলব না। তবে এ মুহূর্তের কথা চিন্তা করলে উপজেলা পরিষদ যেভাবে গঠনতান্ত্রিকভাবে শক্তিশালী; জেলা পরিষদ সে রকম না। মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতার পর থেকেই জেলা পরিষদ ব্যবস্থাটা কখনোই ভালোভাবে চর্চিত হয়নি। ২০১৬ সালে এতে প্রথম অপ্রত্যক্ষ হলেও নির্বাচন হয়। এবার দ্বিতীয় নির্বাচন হচ্ছে। দীর্ঘদিন না চললে কোনো প্রতিষ্ঠান শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায় না। জেলা পরিষদের ক্ষেত্রে এটা এক বড় সীমাবদ্ধতা বলে আমি মনে করি। আরও একটা বিষয় হলো, জেলার আকারটা এত বড় এবং সেখানে হরেক রকম উপাদান আছে, যেগুলোকে সামাল দেওয়া সহজ নয়।
সমকাল: যেমন?
আখতার হোসেন: যেমন একটা জেলায় অনেক সংসদ সদস্য থাকেন। একজন সংসদ সদস্যের ক্ষমতা ও পদমর্যাদা অন্য কোনো জনপ্রতিনিধির সঙ্গে তুলনাযোগ্য নয়। কিন্তু সে জেলায় পরিষদ চেয়ারম্যান যদি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন, তাহলে তাঁর পদমর্যাদা কী হবে- সেটা একটা প্রশ্ন। আরেকটা বিষয় হলো, সংসদ সদস্যরা জেলা ও উপজেলা পরিষদ দু'জায়গাতেই উপদেষ্টা হিসেবে থাকেন। কিন্তু উপজেলায় তাঁর পরামর্শ মানা আইনে বাধ্যতামূলক করা হলেও জেলা পরিষদে তেমনটা নয়। উপজেলায় কিন্তু ১৭টা সরকারি বিভাগ প্রকৃত অর্থে না হলেও হস্তান্তর করা হয়েছে; জেলা পরিষদে যার সুযোগ নেই। জেলা পরিষদ আইনে বলা আছে, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন থাকলে সেগুলোর মেয়ররা এর সদস্য হবেন। ইউএনওকেও এর সদস্য করা হয়েছে, তবে তাঁদের ভোটাধিকার নেই। সব মিলিয়ে সত্যিকার অর্থে বললে জেলা পরিষদকে উপজেলা পরিষদের মতো শক্তিশালী বলা যাবে না।
সমকাল: সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদ অনুসারে স্থানীয় সরকারের প্রতিটা প্রশাসনিক ইউনিট জনপ্রতিনিধি দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কথা। বিদ্যমান জেলা পরিষদ আইন কি সংবিধানের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ?
আখতার হোসেন: একটু কঠিন প্রশ্ন। তবে এখন যা আছে তাকে অনির্বাচিত বলতে পারেন না আপনি। আমাদের রাষ্ট্রপতিও জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নন; সংসদ সদস্যের দ্বারা নির্বাচিত। তাই বলে আমরা তাঁকে অনির্বাচিত বলি না। উপজেলাও কিন্তু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্বাচিতদের মিশ্রণে গঠিত। সেখানে শুধু চেয়ারম্যান এবং দুই ভাইস চেয়ারম্যান সরাসরি ভোটে নির্বাচিত। বাকি সদস্যরা ইউনিয়ন পরিষদের জন্য নির্বাচিত; উপজেলার জন্য নন। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বা সদস্যরা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নন। কিন্তু তাঁদের অনির্বাচিত বলতে পারেন না।
সমকাল: এখন যেভাবে জেলা পরিষদ গঠিত হচ্ছে, তাকে অনেকে শাসক দলের বয়স্ক ও বঞ্চিত লোকদের পুনর্বাসন প্রকল্প বলে বর্ণনা করছেন। আপনার অভিমত কী?
আখতার হোসেন: 'পুনর্বাসন' শব্দটা আমি বলব না। এটাকে বলা যেতে পারে এক ধরনের পলিসি অব অ্যাকোমোডেশন অন দি পার্ট অব দি পলিটিক্যাল পার্টিজ। দলের মধ্যে এমন নেতা থাকেন, যাঁদের অনেক ত্যাগ থাকে; যাঁদের অবদান অন্যদের চেয়ে কম নয়। তাঁদের কোথাও না কোথাও অ্যাকোমোডেট করতে হয়। এটা শুধু আমাদের দেশে নয়, সবখানেই আছে।
সমকাল: এতে জনগণের কী লাভ হয়?
আখতার হোসেন: দেখুন, নিচের দিকে সবখানে আপনিই আছেন। অতএব আপনার লোকই ওপরে বসবে। দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় কথাটা বললাম। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন আপনি আশা করতে পারেন না।
সমকাল: ধরা যাক, ভোটারদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বিরোধী দল থেকে এলো। জেলা পরিষদ নির্বাচনও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলো। তাতেও কি জনগণের কোনো লাভ হবে?
আখতার হোসেন: আসলে জেলা পরিষদ থেকে জনগণের লাভবান হতে হলে সরকারের সদিচ্ছা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জেলা পরিষদের যে ম্যান্ডেটেড (নির্ধারিত) কাজ আছে, তাকে তা করতে দিতে হবে। তার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল জোগাতে হবে। আরেকটা বিষয় হলো, জেলা পরিষদের কিন্তু এখন কোনো জনবল নেই; তা দিতে হবে। এর পাশাপাশি সরকার ওভারসিইং নয়; মনিটরিং করবে। ওভারসিইং হলো খবরদারি করা। সরকার এখানে শুধু দেখভাল করবে। এগুলো নিশ্চিত হলে মানুষ অবশ্যই লাভবান হবে।
সমকাল: তার মানে, জেলা পরিষদের জনগণকে সেবা দেওয়ার সুযোগ আছে।
আখতার হোসেন: হ্যাঁ, আছে। তবে এর জন্য পলিটিক্যাল উইল লাগবে; এটা আপনি পরিস্কার উল্লেখ করবেন। রাজনৈতিক ইচ্ছা ও অঙ্গীকার। আইনে আরেকটা বিষয় বলা আছে- জেলা সার্ভিস, যাতে জেলা পরিষদের জনবল জেলা সার্ভিসের অধীনে আসবে। এখন তো কেন্দ্রীয় সরকারের যে দু'একজন লোক ওখানে কাজ করে, তারা চেয়ারম্যানকে উপেক্ষা করে তার লাইন এজেন্সির কথা শোনে। সেটা থেকে বের হওয়ার জন্য এ প্রভিশন রাখা হয়েছিল। কিন্তু প্রভিশন প্রভিশনের জায়গায় আছে। জেলা সার্ভিস এখনও তৈরিই হয়নি।
সমকাল: সরকার যদি জেলা সার্ভিস চালু করে তখন- আজকে উপজেলায় যে জনপ্রতিনিধি বনাম আমলা দ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে, তা কি জেলা পরিষদেও দেখা যাবে না?
আখতার হোসেন: দ্বন্দ্ব থাকবে। দ্বন্দ্ব ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। এটা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না। দ্বন্দ্ব থাকবে, তবে সেটা যাতে নেতিবাচক দিকে না যায় তার ব্যবস্থা রাখতে হবে। তাহলেই জনগণ প্রত্যাশিত উপকার পাবে।
সমকাল: কর্মপরিধির দিক থেকেও তো জেলা পরিষদ উপজেলার চেয়ে কম গুরুত্ব পাচ্ছে।
আখতার হোসেন: সময়ের কারণে এ রকম হচ্ছে। কারণ কখনোই এ ব্যবস্থাটা চর্চিত হয়নি। ২০১৬ সালেই প্রথম; এবার হচ্ছে দ্বিতীয় নির্বাচন। আবার আইনের দিকে তাকালে দেখবেন সেখানে আবশ্যিক ও ঐচ্ছিক- দুই ধরনের কাজের কথা বলা আছে। কিন্তু একই ধরনের কাজ ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদও করে। জেলার মধ্যে অনেক পৌরসভা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনও আছে। ফলে ওভারল্যাপিংয়ের বিষয় আছে। ইউনিয়ন ও উপজেলা দীর্ঘদিন ধরে কাজগুলো করছে। তা ছাড়া তহবিলেরও বিষয় আছে। জেলাকে করারোপের অধিকার দেওয়া হয়েছে, তবে ট্যাক্স শিডিউল বানানো হয়েছে বলে আমি জানি না। ফলে তহবিলের জন্য জেলা পরিষদকে প্রায় পুরো সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। একই কাজ অন্যরাও করায় সরকারি তহবিল জেলা পরিষদে কমই আসে। সব মিলিয়ে জেলা পরিষদের ভূমিকা এখনও মানুষের চোখে পড়ার মতো অবস্থায় আসেনি।
সমকাল: জেলা পরিষদকে দৃশ্যমান করতে কী করা দরকার?
আখতার হোসেন: এ জন্য জেলা পরিষদের নিজস্ব আয়ের উৎস বাড়াতে হবে। বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাজগুলো তালিকা করে কোনটা কে করবে, তা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। অর্থাৎ ওভারল্যাপিং এড়াতে হবে। প্রত্যেকের ভাগে যে কাজগুলো পড়বে, তা করার জন্য আয়ের সংস্থান করতে হবে।
সমকাল: আপনাকে ধন্যবাদ।
আখতার হোসেন: সমকালকেও ধন্যবাদ।