তারায় ভরা দুটি দল, শক্তিতেও কাছাকাছি। ইতিহাস-ঐতিহ্যের গভীরতাও উজ্জ্বল। শুধু এক দল মৃত্যুকূপের সামনে দাঁড়িয়ে, আরেকটি ধাক্কা লাগলেই তাদের বিদায়। অন্য দল ফর্মের তুঙ্গে। দুই দলেরই হাজার হাজার ভক্ত উড়ে এসেছেন কাতারে। দুশ্চিন্তা আর উত্তেজনায় ভরা চারপাশটা এমন হলেই বুঝি তাকে 'এল ক্ল্যাসিকো' বলা যায়। আজ যেন সেই বিশ্বকাপেরই এল ক্ল্যাসিকো। যেখানে জার্মানিকে বিশ্বকাপে টিকে থাকার অগ্নিপরীক্ষাই দিতে হবে স্পেনের সামনে। হারলে সব আশা শেষ, চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের প্রথম পর্ব থেকেই বিদায়। জার্মানির এই থরকম্প অবস্থা দেখে যদি খারাপ লাগে, তাহলে তাদের কোচ হ্যান্সি ফ্লিকের কথা শুনে নিতে পারেন, 'রাতে ভালো করে একটা ঘুম দেব। তারপর ভাবব কালকের ম্যাচে কোন একাদশ নামানো যায়।' স্পেনের বিপক্ষে বাঁচো কি মরো ম্যাচের আগে জার্মান কোচের এই মন্তব্য শুনে উপস্থিত জার্মান সাংবাদিকরা নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে যেন উত্তর খুঁজলেন, কোচের কিছু হয়েছে কি?

আসলে এটাই এখন জার্মান কৌশল। খুব বেশি চাপ দল নিতে পারছে না। দলে গোল করার লোক নেই। জাপানের বিপক্ষে আগের ম্যাচে ২৭টি গোলমুখে শট নিয়ে সাফল্য মাত্র একটি। এমনকি গত বিশ্বকাপের তিন ম্যাচেও এই গোলস্কোরারেরই অভাব ছিল। সেবারও মোট ৭২টি শট নিয়ে গোল এসেছিল দুটি। স্কোয়াডে গোল করার মতো লোক বলতে সেই থমাস মুলার, তাঁর নাকি হালকা চোট রয়েছে। জার্মানির কাই হাভার্টজকে সামনে রেখে পেছনে থাকছেন গ্যানাব্রি, মুলার আর জামাল মুসিয়ালা থাকছেন আক্রমণভাগে। মুসিয়ালা ছাড়া এই কম্বিনেশন অনেক দিন ধরেই খেলাচ্ছেন জার্মান কোচ। কিন্তু ঠিক যেন জমছে না। গত ৯ ম্যাচে জয় এসেছে মাত্র একটিতে।

কাতারে আসা জার্মান সাংবাদিকরাই বলাবলি করছিলেন, দল গড়তে হলে স্পেনের মতো হতে হবে। তরুণ এক ব্রিগেড দিয়ে তারা আগের ম্যাচেই কোস্টারিকার জালে ৭ গোল দিয়েছে। গাভি, পেদ্রি, ওলমো- দারুণ সব মুখ স্প্যানিশদের। সেখানে জার্মানি কি পারবে স্পেনকে হারিয়ে বিশ্বকাপে টিকে থাকতে? বসার পর প্রথম প্রশ্নটিরই উত্তর দিতে হয়েছিল জার্মান কোচ ফ্লিককে। উত্তর দিতে গিয়ে যেমনটা সবাই বলেন, 'আমাদের দল কাল জয়ের জন্যই খেলতে নামবে। স্পেন অবশ্যই ভালো দল। আমাদের খেলার ধরনও কাছাকাছি। তারা ছন্দে আছে, এটাও ঠিক। তার পরও আমার বিশ্বাস, জার্মানি জয় পাবে কাল।' ফ্লিকেরও আক্ষেপ, মাঝমাঠে ভালো খেলেও ঠিক গোলমুখ খুলতে পারছেন না তাঁরা।

জার্মান-স্পেনের এই লড়াইকে যদি এল ক্ল্যাসিকোই ধরা হয়, তাহলে কিন্তু সেখানে এগিয়ে থাকবে স্পেনই। গত ১৯ বছরে দুই ইউরোপিয়ান দল মুখোমুখি হয়েছে সাতবার, যার একটিতে মাত্র জয় জার্মানদের। তাও সেটা প্রায় আট বছর আগে। জার্মানির গতি থাকলেও স্পেন কিন্তু নির্ভরতা বাড়িয়েছে তাদের তিকিতাকা খ্যাত ছোট পাসের সৌন্দর্যে। স্পেনের অনুশীলনে মাঝেমধ্যেই আসছেন আন্দ্রে ইনিয়েস্তা। বিশ্বকাপজয়ী এই তারকাই এখন তরুণ দলের অনুপ্রেরণা। আক্রমণভাগে দানি ওলমো, মার্কো অ্যাসেনসিও, ফেরান তোরেসদের দিয়ে সাজানো স্পেন দলকে এই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা দল বলে মনে করছেন অনেকে। যদিও তাদের কোচ লুই এনরিকে এখনও ওই সব মাথায় আনছেন না। তাঁর বরং ভয়, আজকের ম্যাচটি জার্মানির কাছে হেরে গেলেই সামনে জাপানের সঙ্গে টেনশন নিয়ে খেলতে হবে। আর তখনই জমে যাবে 'ই' গ্রুপের সমীকরণ। আজ রাতে জার্মানি আর স্পেন ম্যাচের আগেই অবশ্য ফয়সালা হয়ে যাবে জাপান আর কোস্টারিকার ম্যাচ। যদি জাপান হারিয়ে দেয় কোস্টারিকাকে, তখন কিন্তু চাপ বেড়ে যাবে জার্মানি-স্পেন দু'দলেরই। তখন আরও জমবে বিশ্বকাপের আজকের এল ক্ল্যাসিকো।