ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪

সাক্ষাৎকার

‘গোলরক্ষকদের মধ্যেও লড়াই থাকে’

‘গোলরক্ষকদের মধ্যেও লড়াই থাকে’

জাতীয় দলের গোলরক্ষক মিতুল মারমা।

সাখাওয়াত হোসেন জয়

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৪ | ১০:৩৭

বাবা সংঘ মারমা ও মা মিলেচ চাকমার ছোট ছেলে মিতুল। কৃষক পরিবারের সন্তান হলেও মিতুল মারমার কাছে ফুটবলার ছিল নেশার মতো। স্থানীয় প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক শান্তজিৎ তঞ্চঙ্গ্যার হাত ধরে ফুটবলে নাম লেখানো। রাঙামাটির বিলাইছড়ি পাহাড়ি অঞ্চলের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ১৭ বছরেই সাবেক কোচ জেমি ডের হাত ধরে জাতীয় দলে ডাক পান তিনি। তিন কাঠির নিচে কোচ হ্যাভিয়ের ক্যাবরেরার অটোমেটিক চয়েস এখন তিনি। ফিলিস্তিনের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য কিছু সেভের পর অসুস্থ হয়ে মাঠ ছাড়েন মিতুল। এরপর দল হজম করে গোল। ফিলিস্তিন ম্যাচ, নিজের ক্যারিয়ার এবং গোলরক্ষক হওয়ার পেছনের গল্পগুলো সমকালের সঙ্গে তুলে ধরেছেন দেশের জার্সিতে ছয়টি ম্যাচ খেলা মিতুল মারমা। শুনেছেন সাখাওয়াত হোসেন জয়

সমকাল : ফিলিস্তিন ম্যাচে অসুস্থ হয়ে মাঠ ছাড়লেন। এখন কেমন আছেন?

মিতুল : এখন বেশ ভালো। ফিলিস্তিন ম্যাচে প্রধান সমস্যা হচ্ছে আমার ব্লাড সুগারটা কমে গিয়েছিল। সম্ভবত ১.৪-এ নেমে গিয়েছিল। উচ্চ রক্তচাপেরও সমস্যা আছে আমার। এসব কারণে আর ম্যাচটাও ছিল হাই টেম্পারপেন্ট। আমি ৮৩ মিনিট পর্যন্ত মাঠে ছিলাম। ওই সময় হঠাৎ করে আমার মাথাটা ঘুরে যাচ্ছিল। তখন আমি চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। পুরো দুর্বল হয়ে গিয়ে আমি পড়ে যাচ্ছিলাম। শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। এরপর আমাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এখন পুরোপুরি ভালো আছি। শেখ রাসেল ক্লাবে এসেছি, আমাদের লিগের ম্যাচ আছে।

সমকাল : বড় ম্যাচের চাপেই কি শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল?

মিতুল : না না। এর আগেও তো চাপের মধ্যে ম্যাচ খেলেছি। কুয়েতে এই ফিলিস্তিনের বিপক্ষে ম্যাচটিও আমাদের অনেক চাপ ছিল। ম্যাচের চাপ নয়, হয়তো এটা গরমের কারণে হয়েছিল। এই ম্যাচ দুটির জন্য যত ট্রেনিং করেছিলাম, সব রাতেই করেছিলাম। আর সৌদি আরবে ক্যাম্প করার সময় কিন্তু ঠান্ডা ছিল। বাংলাদেশে গরমের মধ্যে খেলতে হয়েছে। মানিয়ে নিতে একটু সমস্যা হয়েছে।

সমকাল : আপনি উঠে যাওয়ার পর গোল খেতে হয়েছে।

মিতুল : ম্যাচটি ছিল উত্তেজনাপূর্ণ। আমি যখন উঠে গিয়েছিলাম, তখন জানতাম না কী হয়েছে। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগে একটু ভালো অনুভব করছিলাম। তখন টিম ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম, খেলার রেজাল্ট কী? উনি খবর নিয়ে আমাকে বললেন, আমরা এক গোল হজম করেছি। অতিরিক্ত সময়ের আট মিনিটের শেষের দিকে খেলা চলছে। সেটা শোনার পর আরও বেশি খারাপ লাগছিল। অসুস্থও হয়ে যাচ্ছিলাম।

সমকাল : এখন কি মনে হচ্ছে গোলপোস্টের নিচে আপনি থাকলে গোল হজম করত না বাংলাদেশ?

মিতুল : এটা হয়তো হতো। সবকিছু তো সৃষ্টিকর্তার হাতে। ম্যাচের অবস্থা এমন ছিল, যে কোনো মুহূর্তে আমরাও গোল দিতে পারতাম, একইভাবে তারাও। নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস বাড়ছিল যে মাঠে যতক্ষণ আছি, ততক্ষণ কিছু একটা করব।

সমকাল : একসময় গোলপোস্টের নিচে অটোমেটিক চয়েস ছিলেন জিকো। সময়ের পরিক্রমায় সেই জিকো এখন কোচের কাছে তিন নম্বর। আপনি হলেন এক নম্বর গোলরক্ষক।

মিতুল : আমরা যারা জাতীয় দলের গোলরক্ষক আছি, চারজনই দলের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যেই খেলি না কেন, কে এক নম্বর, দুই নম্বর– আমাদের কাছে কখনোই এটি মুখ্য বিষয় ছিল না। যে খেলবে, সে যেন শতভাগ দিতে পারে– এটাই লক্ষ্য থাকে। এখন কোচ কাকে এক নম্বরে চয়েস করবেন বা উনার টেকনিক্যাল যে দিকগুলো আছে, সেটা নিয়ে টিম সাজাবেন, তা সম্পূর্ণ তাঁর এখতিয়ার। কাকে এক নম্বর দেবেন, এটিও কোচের দায়িত্ব। আমরা আমাদের সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমাদের মধ্যে সব সময় একটা আলোচনা হয় যেই খেলি না কেন, সর্বোচ্চটা দেব। গোলরক্ষক পজিশন আর অন্য পজিশনই– কেউ কিন্তু একেবারে ফিক্সড না। যে কারও সমস্যা হতে পারে বা যে কোনো কিছু ঘটতে পারে। ওই হিসেবে আমাদের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে সবাই সবাইকে চ্যালেঞ্জ করে খেলব। গোলরক্ষকদের মধ্যেও তো একটা লড়াই থাকে। আমি চেষ্টা করব নিজেকে মেলে ধরতে। আমি যদি ভালো করতে না পারি, অবশ্যই আমার জায়গায় আরেকজন আসবে; এটা চিরাচরিত নিয়ম। এসব বিষয় দেখলে চ্যালেঞ্জটা অনেক কঠিন। একভাবে পারফর্ম ধরে রাখাটাও কিন্তু কঠিন। 

সমকাল : অতীতে দেখা যেত জিকো মাঠে নামত আর আপনি সাইড বেঞ্চে বসে দেখতেন। এখন হয়েছে উল্টোটা।

মিতুল : জিকো ভাই নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের এক নম্বর গোলরক্ষক, এটা সবাই আমরা জানি। উনার থেকে আমি অনেক কিছু শিখছি। উনি যখন খেলতেন, উনার স্টাইল আমি অনুসরণ করতাম। উনি ম্যাচের দিন কোন কোন জিনিসটা ভালো করতেন, এটা আমি সাইড বেঞ্চে বসে ফলো করতাম। জিকো ভাইয়ের কোন দিকগুলো ভালো ছিল, সেগুলো করার চেষ্টা করতাম। উনার কাছ থেকে অনেক পরামর্শ নিতাম এবং এখনও নিচ্ছি। 

সমকাল : অল্প দিনেই জাতীয় দলের এক নম্বর গোলরক্ষক। আপনার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট কোনটা?

মিতুল : আমি মনে করি, আমার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট হলো এশিয়ান গেমস। গত বছরের অক্টোবরে হ্যাংঝুতে অনুষ্ঠিত এশিয়াডে ভারত, মিয়ানমার ও চীনের সঙ্গে আমরা ভালো খেলেছিলাম। জাতীয় দলে খেলার আগে আমি সেখানে নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছি। আর কোচ হ্যাভিয়ের ক্যাবরেরা থেকে কোচিং স্টাফরা সবাই ছিল। ওই সময় আমি নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। অনূর্ধ্ব-২৩ বা গেমস কোনোটাই আমার মাথায় ছিল না। আমার মাথায় ছিল যে বাংলাদেশের হয়ে খেলছি এবং সর্বোচ্চটুকু দেব। খেলা শেষ করে যখন দেশে এসেছিলাম, তখন কোচ আমার সঙ্গে আলোচনা করছিল, ‘তুমি এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত জাতীয় দলের জন্য।’ যে কোনো ম্যাচের জন্য তুমি তৈরি। এখন তুমি নিজেকে নিচে ভাববে না। তুমি ভাববে, জিকোকে তুমি ফাইট দেবে। ওই সময় থেকে গোলরক্ষক কোচ মিগুয়েল আমাকে উৎসাহ দিয়ে আসছিলেন। উনি বলেছেন, তুমি এখন এক নম্বর গোলরক্ষক। জিকোর চেয়ে কীভাবে ভালো করবে, সেটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেবে। তখন থেকেই আমি প্রতিজ্ঞা করি যে ফাইট দেব। ওইটার পরপর বসুন্ধরা কিংসের হয়ে খেলার সময় জিকো ভাইয়ের একটা ঘটনা (মদকাণ্ড) ঘটেছিল। এরপর নিজেই ভাবতে লাগলাম, এখন তো জিকো ভাই নেই; আমার কাঁধে বড় একটা চ্যালেঞ্জ।

সমকাল : কাকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন?

মিতুল : আমি জার্মানির ম্যানুয়েল ন্যুয়ারের খুবই ভক্ত। উনাকে ফলো করতাম। ইউটিউবে উনার খেলার ভিডিওগুলো দেখতাম।

আরও পড়ুন

×