বিশ্বকাপের পর ইংল্যান্ডের প্রথম টি২০ সিরিজ ছিল এটি। সেই বিধ্বংসী ইংল্যান্ডের কথাই বলা হচ্ছে, যারা ভারত-পাকিস্তানকে উড়িয়ে দিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ায়। অ্যাডিলেডের পর মেলবোর্নে সে কী তাণ্ডব তাদের! সেই ইংল্যান্ডকেই টানা দুই ম্যাচে হারাল বাংলাদেশ। এক ম্যাচ হাতে রেখেই বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের মাটিতে নামিয়ে সিরিজ জিতে নিলেন সাকিবরা। গতকাল মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে সিরিজ নির্ধারণী দ্বিতীয় ম্যাচটি তাঁরা জেতেন ৪ উইকেটে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের এ অর্জন ঐতিহাসিক। কারণ এ দুই দলেরই প্রথম টি২০ সিরিজ এটি। বড় পরিসরে দেখলে সব সংস্করণেই ইংলিশদের বিপক্ষে প্রথম সিরিজ জয় টাইগারদের। সেদিক থেকে দেখলে মিরপুরে লেখা হয়েছে সিরিজ জয়ের রূপকথা।

যে কয়টি দলের সঙ্গে বাংলাদেশ খুব বেশি ক্রিকেট খেলার সুযোগ পায় না, তার মধ্যে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া উল্লেখযোগ্য। ক্রিকেটের কুলীন এ দুই দেশই বাংলাদেশকে আতিথেয়তা দিতে চায় না। ইংল্যান্ডে বাংলাদেশ শেষ দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলেছে প্রায় ১৩ বছর আগে ২০১০ সালে। সাকিবরা ক্রিকেটের জন্মভূমিতে আরেকটি সিরিজ কবে খেলার সুযোগ পাবেন, তা জানা নেই। সেই উন্নাসিক ইংল্যান্ডকে টি২০ ফরম্যাটে সিরিজ হারানো তো বিশাল অর্জন। দেশের মাটিতে, স্লো এবং লো উইকেটে খেলে জিতেছে বলে এই প্রাপ্তিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ইংল্যান্ডে গেলে বাংলাদেশকেও তো বিপরীত কন্ডিশনে খেলতে হয়। সেদিক থেকে দেখলে সাকিবরা বাজিমাত করেছেন। টি২০ সিরিজ জয় একদিনের সিরিজ হারের ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার মতোই। জস বাটলারদের একটি ট্রফি জয়ের বিপরীতে সাকিবরাও জিতলেন একটি। এটি টি২০ ক্রিকেটে বাংলাদেশের একাদশ সিরিজ জয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের পর বড় দলের বিপক্ষে আরেকটি মাইলফলক।

সিরিজ জয়ের ভিত তৈরি হয়েছিল চট্টগ্রামে। মিরপুরেও জয়ের ছন্দ ধরে রাখার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন ক্রিকেটাররা। পিচের কন্ডিশনও ছিল পক্ষে। তাই উইনিং কম্বিনেশন ভেঙে একজন স্পিনার বেশি নিয়ে খেলেছে স্বাগতিকরা। শামিম হোসেন পাটোয়ারির জায়গায় মেহেদী হাসান মিরাজকে সুযোগ দেওয়া হলে সেরা খেলাটাই খেলেন তিনি। ইংলিশদের হাত থেকে ম্যাচ ছিনিয়ে নিতে মিরাজের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। বোলিং করে চারটি উইকেট শিকার তাঁর। ২৫ বছর বয়সী এ অফস্পিনারের আগের সেরা বোলিং আরব আমিরাতের বিপক্ষে গত বছর দ্বিপক্ষীয় সিরিজে ৩ উইকেট প্রাপ্তি।

তাসকিন আহমেদ ইনিংসের তৃতীয় ওভারে ব্রেক থ্রু দিলেও পাওয়ার প্লের ছয় ওভার ভালোভাবেই শেষ করে ইংল্যান্ড। ১ উইকেটে ৫০ রান। পরের তিন ওভারে ভোজবাজির মতো সব পাল্টে যেতে থাকে। সপ্তম ওভারে ফিল সল্টের ফিরতি ক্যাচ নিয়ে ছন্দটা নিজেদের পক্ষে নেন সাকিব। এর পরের ওভারেই চোখ ধাঁধানো ইয়র্কার ডেলিভারিতে জস বাটলারকে বোল্ড করেন হাসান মাহমুদ। এর ঠিক ছয় বলের মাথায় মিরাজের শিকার মঈন আলি। ৫৭ রানে ৪ উইকেট হারানোর পর ইনিংস মেরামতের চেষ্টা করেছে ইংল্যান্ড। অধিনায়ক সাকিব সেই প্রতিরোধের দেয়াল ভেঙে দেন মিরাজকে দিয়ে। ১৫তম ওভারে জোড়া উইকেট নিয়ে ইংলিশদের প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেন তিনি। ১৭তম ওভারে গিয়ে নেন আরও একটি উইকেট। শেষ ওভারে মুস্তাফিজ একটি উইকেট নেন এবং দুটি রানআউট করান। এ দুই রানআউটের যে কোনো একটি উইকেট মুস্তাফিজ নিতে পারলেই একশ টি২০ উইকেটের মাইলফলক হতো। শত উইকেটের রেকর্ড স্পর্শ করতে পরের ম্যাচ পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে তাঁকে।

ইংল্যান্ডকে ১১৭ রানে বেঁধে ফেলার পর স্বস্তিতে ছিল না বাংলাদেশও। দুই ওপেনার লিটন কুমার দাস ও রনি তালুকদার আউট হন ২৭ রানে। নাজমুল হোসেন শান্ত তিন নম্বরে নেমে দৃঢ়তা দেখান। তৌহিদ হৃদয় ও মিরাজ কিছু রান দিতে পারলেও থিতু হতে পারছিলেন না সাকিবরা। যে কারণে সহজ ম্যাচও কঠিন করে জিততে হয়েছে। শেষটায় বেশি ভালো লেগে থাকবে তাসকিন আহমেদের দুটি চার। ক্রিজ জর্ডানের বলে যেভাবে পর পর দুটি বাউন্ডারি হাঁকালেন তা মুগ্ধ করেছে দর্শকদের।

এই সিরিজ দিয়ে একটা বিষয় প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ– তারা মাঝের ওভারগুলো কাজে লাগাতে শিখে গেছে। টি২০ ও একদিনের ক্রিকেটে বাংলাদেশের ব্যাটিং এবং বোলিংয়ের বড় দুর্বলতা ছিল মাঝের ওভারগুলোতে সুবিধা করতে না পারা। ব্যাটিং করলে কম রানে জোড়ায় জোড়ায় উইকেট হারাত। বোলিং করলে বোলাররা ব্রেক থ্রু দিতে পারতেন না। চন্ডিকা হাথুরুসিংহের প্রথম মেয়াদেই এ নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। ২০১৭ সালে তিনি চাকরি ছেড়ে দেওয়ায় কাজের আর ধারাবাহিকতা থাকেনি। এই প্রথম টি২০ সিরিজে ইংল্যান্ডের মতো বড় দলের বিপক্ষেও মিডল ওভারগুলো কাজে লাগাতে পেরেছেন ব্যাটার ও বোলাররা। এর ফলও বাংলাদেশ পেয়েছে সঙ্গে সঙ্গেই।