ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ফুটবলে কলঙ্কের দাগ

ফুটবলে কলঙ্কের দাগ

ক্রীড়া প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৩ | ০৪:১৪

শুক্রবার বিকেল সোয়া ৫টায় পরিচিতজনদের নববর্ষের শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছেন বাফুফে সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগ। প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা পর ফিফার এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের ফুটবলে নেমে আসে ‘সুনামি’। দরপত্রে অনিয়ম এবং ফিফার ফান্ডের অপব্যবহারের কারণে ফুটবলের সব ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে সোহাগকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ এবং ১০ হাজার সুইস ফ্রা জরিমানা করে ফিফা। 

বিশ্ব ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীন এথিকস কমিটির এই সিদ্ধান্ত তোলপাড় করে দিয়েছে দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে। ফিফার শাস্তি ফুটবলের জন্য কলঙ্কময় অধ্যায় বলে আখ্যায়িত করেছেন সাবেক ফুটবলাররা। ফুটবলে দুর্নীতির দায়ে নিষিদ্ধ সোহাগই প্রথম। তাঁর নিষেধাজ্ঞায় ‘ইমেজ’ সংকটে থাকা বাংলাদেশের ফুটবল আরও ঘোর অন্ধকারে ধাবিত হয়েছে।

এক দশকের বেশি সময় ফুটবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকের চেয়ারে আছেন সোহাগ। বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত সোহাগ প্রতিনিয়ত ফেডারেশনের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের একজন হয়ে ওঠেন। একজন চাকরিজীবী হয়েও নির্বাহী কমিটির অনেককে এড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারকে নিজের সম্পত্তি বানিয়ে ইচ্ছামতো কাজ করার অভিযোগ আছে সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে। ফিফার সঙ্গে চিঠি চালাচালি থেকে শুরু করে বিভিন্ন আর্থিক বিষয়াদির কাগজপত্রে থাকে তাঁর স্বাক্ষর। সেই হিসেবে তাঁর সময়ে করা আর্থিক অনিয়মের জন্য সরাসরি তাঁকে অভিযুক্ত করছে ফিফা। নির্বাচিত সভাপতি বলে সরাসরি কাজী সালাউদ্দিনকে সরানোর কোনো সুপারিশ করেনি বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা।

কয়েক বছর ধরেই আর্থিক অসংগতি নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। আর্থিক অনিয়মের কারণে ফিফার ফান্ড বন্ধ করে দেওয়ার খবরও মিডিয়ায় উঠেছে। কিন্তু প্রতিবারই তা অস্বীকার করে গেছেন বাফুফে কর্তারা। অবশেষে ফিফার নিষেধাজ্ঞায় সত্যতা মিলেছে বাফুফের আর্থিক অসংগতির বিষয়টি। ৬ কোটি ৩৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকার লেনদেন নিয়ে অভিযুক্ত হয়েছে বাফুফে এবং সাধারণ সম্পাদক সোহাগ। 

ফিফার তদন্তে চারটি ধারায় আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি ওঠে আসে। এগুলো হলো– ধারা-১৫ (সাধারণ কর্তব্য), ধারা-১৩ (আনুগত্যের দায়িত্ব), ধারা-২৪ (জালিয়াতি ও মিথ্যাচার), ধারা-২৮ (তহবিল তছরুপ ও মিথ্যাচার)। এর মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে তিনটি অনিয়ম– ফিফার তহবিলের জন্য নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্ট থেকে নগদে টাকা উত্তোলন করা, ফিফা সম্পর্কিত প্রকল্প বা প্রোগ্রামে অন্য অ্যাকাউন্টের টাকা ব্যবহার করা এবং ফিফা তহবিলের টাকা ভিন্ন খাতে ব্যয় করা। মূলত, ফিফার দেওয়া ফান্ড নির্দিষ্ট একটি ব্যাংকে রাখার নিয়ম। লেনদেনও করতে হবে সেখান থেকে। কিন্তু সেটি বারবারই লঙ্ঘন করেছে বলে ৫১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে ফিফা এথিকস কমিটি। আর বাফুফেকে দেওয়া ফিফার ফান্ডের খরচের হিসাব দিতে ভুয়া কাগজপত্র দাখিল করার অভিযোগ ওঠে। ফান্ডের অর্থ খরচসংক্রান্ত বিষয়ে বাফুফের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে ফিফার তদন্তে এবং শুনানিতে গলদ ধরা পড়েছে।

মূলত, ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর সময়ের মধ্যে লেনদেন নিয়েই তদন্ত করে ফিফা ইনভেস্টিগেটরি। ফিফার তদন্ত চলাকালে কয়েকবারই জুরিখে যেতে হয়েছে সোহাগকে। ২০২২ সালের অক্টোবরে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাফুফের তিন কর্মকর্তাকে নিয়ে ফিফা সদরদপ্তরে যান সোহাগ। তদন্ত চলাকালে ফিফার বিচারিক চেম্বার বাফুফের বেশ কয়েকটি লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং বিশ্লেষণ করে দেখায় অনিয়মগুলো। এর মধ্যে বাফুফের চারটি খাত– ক্রীড়া সরঞ্জাম ক্রয়, ফুটবল কেনা, বিমানের টিকিট এবং ঘাস কাটা যন্ত্র কেনা বাবদ যথেষ্ট অনিয়ম পেয়েছে ফিফা। একই সঙ্গে দরপত্র আহ্বানকারী প্রতিষ্ঠান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

যদিও এ বিষয়টি নিয়েও লুকোচুরি করেন ফেডারেশন কর্তারা। তাঁদের দাবি ছিল আর্থিক লেনদেন-সংক্রান্ত বিষয়ে ফিফার ‘নিয়মমাফিক’ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ডাক পড়েছে। এবার বেরিয়ে এলো বাফুফের আর্থিক কেলেঙ্কারির আসল খবর।

এমনিতেই ফুটবলে কোনো সুখবর নেই। আর্থিক সংকটের কারণে মিয়ানমারে সাবিনা খাতুনদের অলিম্পিক বাছাই খেলতে পাঠায়নি বাফুফে। নির্বাহী কমিটির অনেককে না জানিয়ে সোহাগকে সঙ্গে নিয়ে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন এবং নারী ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণ বাতিল করেন মেয়েদের মিয়ানমার সফর। সোহাগের একক সিদ্ধান্তে সাবিনাদের মিয়ানমার সফরের জন্য যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে ৯২ লাখ টাকার বাজেট দিয়েছে বাফুফে; যা নিয়ে ওঠে নানা প্রশ্ন। 

অর্থ না পাওয়ায় সোহাগ সরাসরি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ওপর দায় চাপিয়েছেন। এ নিয়ে তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এমপি। সোহাগের পদত্যাগের দাবিও ওঠে। এই আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই বেরিয়ে এলো বাফুফে এবং সোহাগের দুর্নীতির সত্যতা।

আরও পড়ুন

×