ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

ক্রিকেটাররাই যখন আয়োজক

ক্রিকেটাররাই যখন আয়োজক

--

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০১ জানুয়ারি ২০২১ | ০২:০৬

কভিড-১৯ মহামারিতে দেশের ক্রিকেটে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ক্রিকেটাররাই। খেলা না থাকায় বন্ধ হয়ে আছে আয়ের উৎস। বিসিবির পুলের বাইরে থাকা হাজার খানেক ক্রিকেটার ম্যাচ খেলার সুযোগ পাচ্ছেন না। বেশিরভাগ ক্রিকেটারকে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে আর্থিক অনটনের ভেতরে। বিসিবির দিকে তাকিয়ে না থেকে এই বিপুলসংখ্যক বঞ্চিত ক্রিকেটারের পাশে দাঁড়াতে দেশের সিনিয়র ক্রিকেটাররা উদ্যোগী হয়েছেন নিজেদের জেলায় টুর্নামেন্ট আয়োজনে। ক্রিকেটারদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগে পাশে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসনের কর্মকর্তা, ব্যবসায়ীরা। কোয়াবের অনুরোধে পেছন থেকে আয়োজকদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বিসিবি। বিভাগীয় ও জেলা ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের এ প্রচেষ্টা প্রশংসা কুড়িয়েছে। এতে করে খেলোয়াড়রা যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনি করে সংগঠনিক দক্ষতাও গড়ে উঠছে নেতৃত্বে থাকাদের। এই টুর্নামেন্টের ভেতর দিয়ে নিয়মিত হতে পারে জেলা লিগ। স্বাধীনতার ৫০ বছরে যেটা দেখা যায়নি, করোনাকালে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ক্রিকেটাররা হয়ে উঠলেন অন্যরকম সংগঠক। ক্রিকেটারদের ব্যবস্থাপনায় সারাদেশের স্থানীয় টুর্নামেন্টের আদ্যোপান্ত তুলে এনেছেন আলী সেকান্দার

বিসিবির ক্রিকেট খেলে ব্যস্ততায় কাটত সারা বছর। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, জাতীয় লিগ, বিসিএল, বিপিএলের মতো মেগা টুর্নামেন্ট নিয়ে বছরজুড়েই কাটাতে হতো রাজ্জাকদের। বিশ্রাম নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় থাকত না খেলোয়াড়দের হাতে। দেশের সেই ব্যস্ত ক্রিকেটারদের এক প্রকার বেকার করে দিয়েছে কভিড-১৯ মহামারি। বিসিবির নিয়মিত ক্রিকেট নেই। খেলার জন্য তাই বিকল্প পথ খুঁজে নিতে হচ্ছে খেলোয়াড়দের। বিসিবির দিকে তাকিয়ে না থেকে ক্রিকেটাররাই উদ্যোগী হয়ে জেলায় জেলায় ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করছেন। ক্রিকেটারদের এই উদ্যোগে আপত্তি করেনি বিসিবি। খেলা হলে দেশের ক্রিকেটেরই তো লাভ।

ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট লিগ দেশের ক্রিকেটারদের রুটি-রুজির অন্যতম জায়গা। ঢাকা প্রথম বিভাগ ও প্রিমিয়ার লিগ মিলে প্রায় ৩০০ ক্রিকেটার খেলেন। ২০২০ সালে এই লিগ দুটি হয়নি। ২০২১ সালেও ঢাকা লিগ হবে কিনা জানা নেই। ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-কোয়াব শত চেষ্টা করেও বিসিবিকে রাজি করাতে পারেনি ঘরোয়া ক্রিকেট শুরুর জন্য। কোয়াব নেতারা তাই বাধ্য হয়ে জেলাভিত্তিক টুর্নামেন্ট করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এই সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক দেবব্রত পাল জানান, ২০টি জেলায় স্থানীয় খেলোয়াড়দের উদ্যোগে টি২০ টুর্নামেন্ট করা হবে। সিলেট, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহে টুর্নামেন্ট সফল হয়েছে। রংপুর, খুলনা ও রাজশাহীতে টুর্নামেন্ট আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। বিসিবি পরিচালক ও কোয়াব নেতা খালেদ মাহমুদ সুজন খেলোয়াড়দের এ ধরনের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, 'দারুণ। খুবই ভালো উদ্যোগ। খেলোয়াড়দের সবাই চেষ্টা করছে। বঙ্গবন্ধু টি২০ কাপ চলাকালে খেলোয়াড়রা আমার সঙ্গে বসেছিল, কীভাবে টুর্নামেন্ট করা যায় সে পরামর্শ দিয়েছি। জাঁকজমকপূর্ণ না হলেও চলবে, খেলা হওয়া দিয়ে কথা। জেলার ছেলেগুলো খেলার সুযোগ পেলেই বিসিবি খুশি।'

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ অতীতে দেখা যায়নি। খেলার জন্য আন্দোলন করতে দেখা গেছে ক্রিকেটারদের। সংগঠকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে নিজেরা পিছিয়ে যেতেন। করোনা মহামারি ক্রিকেটারদের দিয়েছে নতুন পথের সন্ধান। যেখানে পথের শেষ সেখান থেকে নতুন পথের শুরু। বিসিবির লিগ না দিলেও দেশে ক্রিকেট বন্ধ থাকছে না। উদীয়মান ক্রিকেটারদের খেলার পথ করে দিচ্ছেন খেলাটির অগ্রণীরা। জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার সানোয়ার হোসেন ময়মনসিংহে টুর্নামেন্ট করেছে জেলার সাবেক ক্রিকেটারদের নিয়ে। তিনি যেমন বলছেন, 'ঢাকায় খেলা হচ্ছে না। খেলোয়াড়দের খেলার মঞ্চ তৈরি করে দেওয়া নিজেদের দায়িত্ব মনে করেছি। বিসিবি সহযোগিতা নিয়ে ছোট্ট পরিসরে হলেও ক্রিকেট টুর্নামেন্ট করতে পেরেছি। এই উদ্যোগ সব জেলায় নেওয়া হলে ক্রিকেট ঘুড়ে দাঁড়াবে।'

বিসিবি বরাবরই ক্রিকেটারদের পাশে থেকেছে। করোনাকালে অনুদান দিয়েছে খেলোয়াড়দের। বিসিবির অনুদানের বড়জোর এক মাস চলার মতো। বছরের বাকি সময়টা চলছে কষ্টেশিষ্টে। বিশেষ করে আর্থিক অসচ্ছল প্রথম বিভাগের অনেক ক্রিকেটার পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানান নুরুল হাসান সোহান। নিজেদের উদ্যোগে টুর্নামেন্ট করার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করলেন রংপুর ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সোহরাওয়ার্দী শুভ, 'এক বছর ধরে ক্রিকেটাররা খেলতে পারছে না। ঢাকায় লিগের খেলা কবে হবে, জানা নেই। আমরা কিছু ম্যাচ খেলার সুযোগ করে দিতে পারলে তরুণ খেলোয়াড়রা একটু হলেও হতাশামুক্ত হবে।'

করোনাকালে বিসিবি দুটি টুর্নামেন্ট করেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার মহড়া হিসেবে। বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপ ও বঙ্গবন্ধু টি২০ কাপের আয়োজন সফল হওয়ায় ১০ জানুয়ারি ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল খেলতে আসছে ঢাকায়। এই সিরিজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঢাকা লিগের মতো ঘরোয়া ক্রিকেটের বড় আয়োজনের ঝুঁকি বিসিবি নেবে না বলে জানান খালেদ মাহমুদ। সে কারণেই ক্রিকেটারদের খেলার ভেতরে রাখতে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে টুর্নামেন্ট আয়োজনে ক্রিকেটারদের পেছন থেকে উৎসাহ জোগাচ্ছেন বোর্ড পরিচালকরা। বিসিবি সিইও নিজামউদ্দিন চৌধুরীর মতে, 'খেলাধুলার ব্যাপারে আমারাদের পজিটিভ থাকতে হবে। যত খেলা হবে তত ক্রিকেটের উন্নতি হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন, কোনো জেলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে টুর্নামেন্ট করতে পারলে ভালো। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট শুরুর জন্য পুলের কাউকে আমরা অনুমতি দেব না। ওয়েস্ট ইন্ডিজে যাদের খেলার সুযোগ রয়েছে, তারা খেলতে পারবে না। তবে স্থানীয়ভাবে খেলাধুলা হলে ভালো।' ক্রিকেটারদের আয়োজনে মাঠ, বল, আম্পায়ার, ম্যাচ রেফারি দিয়ে সহযোগিতা করছে বিসিবি। কোয়াব সাধারণ সম্পাদক দেবব্রত বলেন, 'ক্রিকেটার না থাকলে ক্রিকেটও থাকবে না। ক্রিকেটারদের স্বার্থে আমাদের কোয়াবের পক্ষ থেকে ২০টি জেলায় টুর্নামেন্টের আয়োজন করছি। কিছু জেলায় শেষ হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকিগুলোতে হবে।' ক্রিকেট মাঠে থাকতে এবং রুটি-রুজির জন্য খ্যাপ খেলছেন জাতীয় দলের তারকারাও। সাব্বির, রাজ্জাক, নাঈমরা খ্যাপের টানে ছুটে যান জেলায় জেলায়।

আরও পড়ুন

×