বিগত বছরে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ প্রদানে ব্যর্থ কোম্পানিগুলোকে একের পর এক কমিশন কার্যালয়ে ডেকে পাঠাচ্ছে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। 

কেন এসব কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে পারছে না, লোকসান থাকলে তার কারণ কী, লোকসান থেকে বের হতে কী ব্যবস্থা নিয়েছে- এমন সব মৌলিক প্রশ্নের ব্যাখ্যা চাওয়া হচ্ছে এমন কোম্পানিগুলোর কাছে। কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

কমিশন কর্মকর্তারা জানান, আগামী এক মাস টানা প্রতিদিনই কোনো না কোম্পানিকে ডেকে পাঠানো হবে। কমিশনে বিশেষ শুনানিতে অংশ নিতে কোম্পানির চেয়ারম্যান বা পর্ষদ সদস্য ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন দায়িত্বপ্রাপ্তদের উপস্থিত থাকতে বলা হচ্ছে।

যেসব কোম্পানিকে ডাকা হচ্ছে সেগুলো হলো- আরামিট সিমেন্ট, বঙ্গজ, সেন্ট্রাল ফার্মা, সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল, দুলামিয়া কটন, ফ্যামিটিটেক্স, জেমিনি সী ফুডস, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনস, গোল্ডেন হারভেস্ট এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জুট স্পিনার্স, লিগ্যাসি ফুটওয়্যার, মালেক স্পিনিং, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ, অলিম্পিক এক্সেসরিজ, আরএন স্পিনিং, রেনউয়িক যজ্ঞেশ্বর, সাফকো স্পিনিং, সায়হাম কটন, সায়হাম টেক্সটাইল, সাভার রিফ্যাক্টরিজ, শ্যামপুর সুগার মিলস, তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ, উসমানিয়া গ্লাস, জাহীন স্পিনিং, জাহিনটেক্স এবং ঝিলবাংলা সুগার মিলস।

সম্প্রতি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলাম এক সাক্ষাৎকারে সমকালকে বলেছিলেন, শেয়ারবাজারের সার্বিক সুশাষণ ফেরানোর উদ্দেশ্যে বর্তমান কমিশন ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেখা যাচ্ছে, বছরের পর বছর কোনো কোনো কোম্পানি লোকসান করছে এবং শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন, একটি কোম্পানি বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে চলতে পারে না। এক্ষেত্রে কোনো সমস্যা আছে। কমিশন জানতে চাচ্ছে, কার কী সমস্যা। কারো যদি যৌক্তিক কোনো সমস্যা থাকে তবে কমিশন চেষ্টা করবে ওই সমস্যা থেকে উত্তরণে সহায়তা দিতে। 

কিন্তু পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনাগত কোনো দুর্বলতার কারণে কোনো কোম্পানি লোকসান করলে তাতে হস্তক্ষেপ করবে কমিশন। এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে অবস্থার পরিবর্তনে যৌক্তিক সুযোগ দিতে চায় বিএসইসি। যারা কোম্পানি চালাতে বা লাভজনক পর্যায়ে উন্নীত করতে ব্যর্থ হবেন, তাদের পদ থেকে সরে যেতে হবে। অনথ্যায় কমিশনই তাদের সরিয়ে দেবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

শিবলী রুবাইয়াত বলেন, যারা শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থরক্ষা করে কোম্পানি পরিচালনায় ব্যর্থ হবেন, তাদের অবশ্যই সরে যেতে হবে। চাইলে তারা শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার কিনে নিয়ে শেয়ারবাজার থেকে বের হয়ে যেতে পারেন। আগে এ জন্য কোনো আইনি বিধান ছিল না। নতুন কমিশন তাদের ‘এক্সিট প্ল্যান’ (বের হওয়ার অর্থাৎ তালিকাচ্যুত হওয়ার) সুযোগ করে দিয়েছে। চাইলে এ সুযোগ তারা নিতে পারেন।

বিএসইসির কর্মকর্তারা জানান, ডেকে পাঠানো কোম্পানিগুলোর কাছে লোকসানি অবস্থা থেকে বের হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা কমিশনে জমা দিতে বলা হচ্ছে। কমিশন ওই কর্মপরিকল্পনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবে। যাদের পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত হবে, তাদের প্রয়োজনে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে।

প্রসঙ্গত, লভ্যাংশ প্রদানে ব্যর্থ এবং উৎপাদন বন্ধ থাকা জেড ক্যাটাগরি কোম্পানিগুলোর বিষয়ে গত ১ সেপ্টেম্বর জারি করা এক নির্দেশনায় জেড ক্যাটাগরিতে অবনমনের ৪৫ কার্যদিবসে মধ্যে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করতে বলেছিল।

নির্দিষ্ট সময়সীমা পার হলেও এমন কোম্পানিগুলো এখনও কমিশনের এ নির্দেশ মেনে পর্ষদ পুনর্গঠন করেনি।

কমিশনের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এ ধরনের কোম্পানিগুলোর হিসাব বছর শেষ হওয়া ছয় মাসের মধ্যে এজিএম করার এবং এজিএমে পরিচালক নির্বাচনসহ কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক ভোট বাধ্যতামূলক। 

এক্ষেত্রে কোনো কোম্পানি ব্যর্থ হলে কমিশন নিজেই স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়ারও বিধান রেখেছে বলে কোম্পানিগুলোকে জানিয়ে দিয়েছে।

এসব কোম্পানির পর্ষদ পুনর্গঠনের পর নতুন পর্ষদকে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে কোম্পানির লোকসানের কারণ চিহ্নিত করা, এক্ষেত্রে কারো দায় থাকলে তাকেও চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও কমিশনের নির্দেশনায় বলা হয়েছে।

একইসঙ্গে কোম্পানিটিকে কী করে লাভজনক পর্যায়ে উন্নীত করা যাবে- সে বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা করতেও বলা হয়েছে কমিশনের নির্দেশনায়।

জেড ক্যাটাগরির পর্ষদ পুনর্গঠন বিষয়ে ২০০২ সালের ১ আগস্ট জারি করা নির্দেশনাটি বাতিল করে কমিশন নতুন এ নির্দেশনা জারি করেছিল।

কিন্তু কোনো কোম্পানি নির্দেশনাটি এখনও পর্যন্ত মেনে ব্যবস্থা নেয়নি। এ অবস্থায় কমিশনই ‘কেস টু কেস’ ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।

এর আগে দায়িত্ব গ্রহণের পরই সেকেন্ডারি জেড ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোর সংজ্ঞায় পরিবর্তন এনেছিল। আগে যেখানে কোনো কোম্পানি কোনো বছরের জন্য লভ্যাংশ প্রদানে ব্যর্থ হলেই জেড ক্যাটাগরিভুক্ত করা হতো- এখন সেখানে পরপর দুই বছর নগদ লভ্যাংশ প্রদানে ব্যর্থ কোম্পানি জেড ক্যাটাগরিভুক্ত হবে। এর বাইরে উৎপাদন বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম ছয় মাসের বেশি বন্ধ থাকলে সে কোম্পানিও জেড ক্যাটাগরিভুক্ত হবে।

এ নিয়মের কারণে রাতারাতি জেড ক্যাটাগরিভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা প্রায় ৭০টি থেকে এখন মাত্র ৩১টিতে নেমেছে।

লভ্যাংশ না প্রদানের হিসেবে জেড ক্যাটাগরিতে অবনমন করা নিয়মে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি নতুন কিছু নিয়মও এ কমিশন করেছে।

এতে বলা হয়েছে কোনো কোম্পানির ক্যাশ ফ্লো পর পর দুই বছর ঋণাত্মক হলে বা পুঞ্জিভূত লোকসান পরিশোধিত মূলধনকে ছাড়িয়ে গেলে সে কোম্পানিও জেড ক্যাটাগরিভুক্ত হবে।

শেয়ার লেনদেনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। টি+৮ কার্যদিবসের পরিবর্তে এসব শেয়ার লেনদেন টি+৩ কার্যদিবসে নামিয়ে আনে।

মন্তব্য করুন