বিক্রেতা চাচ্ছেন ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার মাত্র ১০ পয়সা দরে বিক্রি করবেন। কিন্তু ক্রেতা ওই শেয়ারেরই প্রতিটির জন্য ১ হাজার ৫০ টাকা দিতে প্রস্তুত। আজ সোমবার এমন অস্বাভাবিক শেয়ার কেনাবেচার অর্ডার পড়েছে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসইতে।

সম্প্রতি তালিকাভুক্ত সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারদের ১২ শতাংশ বা শেয়ার প্রতি ১ টাকা ২০ পয়সা নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর প্রথম কার্যদিবসে এমন অস্বাভাবিক ক্রয় ও বিক্রয় আদেশ দিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।

কিন্তু বাজার সংশ্লিষ্ট ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, মজা করতে কিছু বিনিয়োগকারী এমন অস্বাভাবিক কেনাবেচা অর্ডার দিয়ে থাকতে পারেন। তবে এটা মজা করার কোনো জায়গা নয়। তাই বিষয়টি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।

তবে অস্বাভাবিক দরে কেনাবেচা না হলেও ডিএসইতে আগের দিন ১৬ টাকায় কেনাবেচা হওয়া এ কোম্পানির শেয়ার সর্বনিম্ন ৬০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৭৮ টাকায় কেনাবেচা হয়েছে। দুপুর ১২টায় শেয়ারটি ৭৪ টাকায় কেনাবেচা হতে দেখা গেছে।

যদিও সকাল ১০টায় লেনদেন শুরুর আগে ওপেনিং সেশনে এ কোম্পানিরই  ১০টি শেয়ার ১ হাজার ৫০ টাকায় কেনার অর্ডার ছিল কোনো এক বিনিয়োগকারীর থেকে। ১ হাজার ১০ পয়সায় ২টি, ১ হাজার টাকায় ৭১টি, ৭০০ টাকা দরে ১০০টি, ৫০১ টাকা দরে ১০০টি, ৫০০ টাকায় ৬৭টি, ৪০০ টাকায় ২৫টি অর্ডার দেখা গেছে।

ঠিক বিপরীতে মাত্র ১০ পয়সা দরে এই সোনালী পেপারের ১ হাজার ৭০২টি শেয়ার বিক্রির অর্ডার দিয়েছিলেন কোনো শেয়ারহোল্ডার। এছাড়া ২০ পয়সা দরে ১৭টি, ৩০ পয়সায় ১৮টি, ৫০ পয়সায় ২টিসহ এমন অস্বাভাবিক দরে শেয়ার বিক্রিরও অর্ডার ছিল।

লভ্যাংশ ঘোষণার পরের কার্যদিবসে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচায় বাজারদরে কোনো সার্কিট ব্রেকার থাকে না। এ সুবিধা নিয়ে কিছু বিনিয়োগকারী হয়তো অস্বাভাবিক দর প্রস্তাব করেছেন। জানা গেছে, বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে বিএসইসি।

গত ৩০ জুন ১০ টাকা অভিহিত মূল্যে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর পঞ্চম কার্যদিবস শেষে গত বৃহস্পতিবার সোনালী লাইফের শেয়ার প্রতিদিন ১০ শতাংশ হারে বেড়ে ১৬ টাকা দরে কেনাবেচা হয়েছিল।

সোনালী লাইফের এমন অস্বাভাবিক দর ওঠার বিপরীতে শেয়ারদর ওঠা নামায় গত সপ্তাহের মত অস্থিরতার আভাস দিয়ে আসন্ন ঈদুল আজহার আগের সপ্তাহে শেয়ারবাজারের লেনদেন শুরু হয়েছে। বড় কয়েকটি খাতের শেয়ারদর কমছে। বাড়ছে রুগ্ন ও বন্ধ কোম্পানির শেয়ারদর।

প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসইতে দরবৃদ্ধির শীর্ষের ৩০ কোম্পানির মধ্যে পঞ্চম অবস্থানে থাকা বিডি ফাইন্যান্স এবং ২৮তম অবস্থানে এটলাস বাংলাদেশ ছাড়া বাকি কোম্পানিগুলোর অবস্থা তথৈবচ। কোনোটির উৎপাদন বন্ধ ও মালিকদের হদিস নেই। কোনোটি উৎপাদনে থাকলেও চলছে লোকসানে। এর মধ্যে উৎপাদনে ও সামান্য লাভে থাকা কিছু কোম্পানিও রয়েছে, তবে এগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনের সত্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।

এদিকে দুপুর ১২টায় ডিএসইতে ১৬৬ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডকে দর বেড়ে কেনাবেচা হতে দেখা গেছে। বিপরীতে দর হারিয়ে কেনাবেচা হচ্ছিল ১৬৪ শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড। দর অপরিবর্তিত অবস্থায় কেনাবেচা হচ্ছিল ৪০টির।

এ সময় ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স ৩.৭৪ পয়েন্ট বেড়ে ৬২১৬.৫১ পয়েন্টে অবস্থান করছিল। প্রথম দুই ঘণ্টায় কেনাবেচা হয় ৬৮৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকার শেয়ার।

সার্বিক শেয়ারদর ওঠানামায় মিশ্রধারার মাঝেও বড় খাতগুলোর মধ্যে বস্ত্র, ওষুধ ও রসায়ন, খাদ্য ও আনুসঙ্গিক খাতের বেশিরভাগ শেয়ার দর বেড়ে কেনাবেচা হতে দেখা গেছে। ছোট খাতগুলোর মধ্যে কাগজ ও ছাপাখানা এবং পাট খাতের অধিকাংশ শেয়ার দর বেড়ে কেনাবেচা হচ্ছে। বিপরীতে ব্যাংক, বীমা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের অধিকাংশ শেয়ার দর হারিয়ে কেনাবেচা হতে দেখা গেছে।

যেমন ব্যাংক খাতের ৩১ কোম্পানির মধ্যে ২৩টি দর হারিয়ে কেনাবেচা হচ্ছিল, দর বেড়ে কেনাবেচা হচ্ছিল মাত্র ৪টি শেয়ার। এ সময় দর অপরিবর্তিত অবস্থায় ছিল বাকি ৪টি।

দুপুর ১২টায় ৫১টি বীমা খাতের কোম্পানির মধ্যে ৪৮টির লেনদেন চলছিল। এর মধ্যে ৪১টি দর হারিয়ে, ৬টি দর বেড়ে এবং ১টি দর অপরিবর্তিত অবস্থায় কেনাবেচা হচ্ছিল।

বিপরীত অবস্থায় ছিল বস্ত্র খাত। এ খাতের ৫৮ কোম্পানির মধ্যে ৫৭টির কেনাবেচা চলছে। এর মধ্যে ৩২টি দর বেড়ে, ১৬টি দর হারিয়ে কেনাবেচা হতে দেখা গেছে।

খাদ্য ও আনুসঙ্গিক খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানি ২০টি, যার ১৭টিই দর বেড়ে কেনাবেচা হচ্ছে। পাট খাতের ৩ কোম্পানির সবগুলোর ক্ষেত্রে একই অবস্থা।

স্বাভাবিকভাবে আগের দিনের থেকে দর বেড়ে সাড়ে চারগুনে উন্নীত হওয়া সোনালী লাইফ রয়েছে দরবৃদ্ধির তালিকায় সবার ওপরে।

দুপুর ১২টায় এর পরের অবস্থানে ছিল ওটিসি থেকে ফেরার দুই কোম্পানি পেপার প্রসেসিং এবং তমিজুদ্দিন টেক্সটাইল।

তালিকাভুক্তির ১৯তম কার্যদিবসে এসে পেপার প্রসেসিং কোম্পানির শেয়ারটির বাজারদর উঠেছে ৯৫ টাকা ৮০ পয়সা। গত ১৩ জুন কোম্পানিটি ১৬ টাকা দর নিয়ে ফের মূল শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ গত এক মাসে শেয়ারটির দর বেড়ে ছয়গুন হয়েছে। গত ১৯ কার্যদিবস শেয়ারটি প্রতিদিনই সার্কিট ব্রেকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ হারে দর বেড়েছে। প্রতিদিনই বিপুল সংখ্যক শেয়ারের ক্রয় আদেশ থাকছে, কিন্তু ক্রেতা শূন্য অবস্থা বিরাজ করছে।

একই অবস্থা তমিজুদ্দিন টেক্সটাইলের ক্ষেত্রে। মাত্র ১২টাকা দর নিয়ে যাত্রা শুরু করা শেয়ারটির আজ কেনাবেচা হচ্ছে ৭১ টাকা ৩০ পয়সায়। এটিরও বাজারদর ছয় গুণ হয়েছে।

দরবৃদ্ধির এর পরের অবস্থানে থাকা কোম্পানিগুলো ছিল সিএনএটেক্স, বিডি ফাইন্যান্স, আনোয়ার গ্যালভানাইজিং, সোনালী পেপার, বিআইএফসি, খুলনা প্রিন্টিং, আরএন স্পিনিং, সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল, অলিম্পক এক্সেসরিজ, ওয়েস্টিন মেরিন শিপইয়ার্ড, ফু-ওয়াং সিরামিক, তুংহাই নিটিং, ফ্যামিলিটেক্স, কাট্টলী টেক্সটাইল, মেঘনা পেট, আমান কটন ফাইব্রস, এমারেল্ড অয়েল।

বিপরীতে সাড়ে ৬ শতাংশ দর হারিয়ে দরপতনের শীর্ষে ছিল মুন্ন ফেব্রিক্স। এ কোম্পানিটি পেপার প্রসেসিং এবং তমিজুদ্দিন টেক্সটাইলের সঙ্গে একই দিনে ওটিসি থেকে ফিরে মূল বাজারে পুনঃতালিকাভুক্ত হয়েছিল।

বিষয় : শেয়ারবাজার পুঁজিবাজার শেয়ার

মন্তব্য করুন