বাংলাদেশ ব্যাংক যখন শেয়ারবাজারমুখী অনিয়ন্ত্রিত অর্থ প্রবাহ ঠেকাতে নজরদারি কঠোর করা শুরু করেছে, ঠিক তখন ১০ বছরের রেকর্ড অবস্থানে পৌঁছানোর পরও শেয়ারবাজারে অর্থ প্রবাহ বাড়াতে মার্জিন ঋণ নীতিমালা শিথিল করেছে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।

মুদ্রা এবং শেয়ারবাজার বিষয়ক দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরস্পর বিরোধী দুই পদক্ষেপের পর কিছুটা অস্থিরতায় সোমবার শেয়ারবাজারের লেনদেন চলছে। সকাল ১০টায় লেনদেনের শুরুর আধা ঘণ্টায় বেশ উত্থান-পতন থাকলেও প্রথম দুই ঘণ্টা শেষে বেশিরভাগ শেয়ার দর বেড়ে কেনাবেচা হচ্ছে। তাতে মূল্য সূচকও কিছুটা বেড়েছে, তবে তার পরিমাণ খুব বেশি নয়।

দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ৩৭৫ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড লেনদেনে এসেছে। এর মধ্যে ১৭৯টি দর বেড়ে কেনাবেচা হতে দেখা গেছে, যা লেনদেনে আসা মোট শেয়ারের প্রায় ৪৮ শতাংশ।

বিপরীতে ১৫১ শেয়ার ও ফান্ড দর হারিয়ে কেনাবেচা হতে দেখা যায়, যা লেনদেনে আসা মোট শেয়ারের ৪০ শতাংশের বেশি। বাকি ৪৫ শেয়ার ও ফান্ড দর অপরিবর্তিত অবস্থায় কেনাবেচা হচ্ছিল।

এ সময় ডিএসইএক্স সূচক ২১ পয়েন্ট বেড়ে ৬৭২০ পয়েন্টে অবস্থান করছিল।

দিনের লেনদেন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সকাল ১০টায় আগের দিনের ৬৬৯৯ পয়েন্ট থেকে যাত্রা শুরু করে মাত্র ৪ মিনিটেই সূচকটি ৩৬ পয়েন্ট বেড়ে ৬৭৩৬ পয়েন্ট ছাড়ায়। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে চালুর পর এটাই এ সূচকের এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ অবস্থান।

তবে পরের ১৮ মিনিটে কিছু বৃহৎ মূলধনীসহ বেশ কিছু শেয়ার দর হারালে সূচকটি দ্রুত ৩৮ পয়েন্ট হারায়, নেমে যায় ৬৬৯৮ পয়েন্টে। 

কিন্তু আবার পরের ১৯ মিনিটেই ওই শেয়ারগুলো দর ফিরে পেলে ডিএসইএক্স সূচক ফের ৩৮ পয়েন্ট বেড়ে ৬৭৩৬ পয়েন্ট ছাড়ায়। পরে অবশ্য ওই অবস্থান থেকে কিছুটা নেমে এসেছে।

দুপুর ১২টায় ডিএসইতে শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সিমেন্ট এবং বস্ত্র খাতের সিংহভাগ কোম্পানির শেয়ার দর বেড়ে কেনাবেচা হতে দেখা গেছে। 

বিপরীতে বীমা খাতের প্রায় সব শেয়ার দর হারিয়ে কেনাবেচা হতে দেখা যায়। বাকি সব খাতে ছিল মিশ্রধারা।

যেমন আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের ২২ কোম্পানির সবগুলোই দর বেড়ে কেনাবেচা হচ্ছিল। গড়ে এ খাতের সার্বিক শেয়ারদর এ সময়ে বেড়েছিল ৩.৩১ শতাংশ।

সিমেন্ট খাতের ৭ কোম্পানির মধ্যে একটি ছাড়া বাকি ৬টির দর ছিল ঊর্ধ্বমুখী। এ খাতের সার্বিক দরবৃদ্ধির হার ছিল ১.১৯ শতাংশ। 

বস্ত্র খাতের ৫৮ কোম্পানির মধ্যে ৪৬টি দর বেড়ে কেনাবেচা হতে দেখা গেছে। বিপরীতে দর হারিয়ে কেনাবেচা হচ্ছিল ৭টি এবং অপরিবর্তিত ছিল ৫টির দর। ৭ শেয়ারের দর কমার পরও দুপুর ১২টায় এ খাতের সার্বিক দরবৃদ্ধির হার ছিল ২.৬৬ শতাংশ।

বিপরীতে বীমা খাতের ৫১ কোম্পানির মধ্যে ৪৮টিই দর হারিয়ে কেনাবেচা হতে দেখা যায়। এ খাতের ৩ শেয়ার এ সময় দর বেড়ে কেনাবেচা হলেও সার্বিক দরপতনের হার ছিল ২.০৪ শতাংশ।

পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, দুপুর ১২টায় যেসব শেয়ার দরবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল তার প্রায় সবই ছিল রুগ্ন কোম্পানি। এর মধ্যে বন্ধ কোম্পানিও আছে।

১০ শতাংশ হারে দর বেড়ে দরবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল জুট স্পিনার্স, বিআইএফসি এবং ন্যাশনাল হাউজিং। 

৯ থেকে প্রায় ১০ শতাংশ দর বেড়ে এর পরের অবস্থানে ছিল স্টাইল ক্রাফট, সাউথবাংলা ব্যাংক, জাহীন টেক্স, শ্যামপুর সুগার, খুলনা পাওয়ার, সাফকো স্পিনিং, ইউনাইটেড ফাইন্যান্স, ড্রাগন সোয়েটার, রিং শাইন টেক্সটাইল, সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল, তাল্লু স্পিনিং, এফএএস ফাইন্যান্স, মেঘনা পেট, আরএন স্পিনিং।

বিপরীতে পৌনে ৫ শতাংশ দর হারিয়ে অ্যাপোলো ইস্পাত ছিল দরপতনের শীর্ষে। ৪ শতাংশের ওপর দর হারিয়ে এর পরের অবস্থানে ছিল ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্স এবং সেন্ট্রাল ফার্মা। দরপতনে এর পরের শেয়ারগুলো ছিল বীমা খাতের।

দুপুর ১২টা পর্যন্ত ডিএসইতে ১ হাজার ৪৮১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়। যদিও বেলা ১১ টা পর্যন্ত কেনাবেচা হয়েছিল ১০০০ কোটি টাকারও বেশি শেয়ার।

একক কোম্পানি হিসেবে ৬১.৫৯ কোটি টাকার লেনদেন নিয়ে শীর্ষে ছিল লংকাবাংলা ফাইন্যান্স। ২৮১.৯১ কোটি টাকার লেনদেন নিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত ছিল খাতওয়ারি লেনদেনের শীর্ষে, যা ছিল মোট লেনদেনের ২১.১১ শতাংশ।

সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারের অস্বাভাবিক উত্থানের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে বলেছে, ঋণের অর্থ কোনোভাবে যাতে অনুৎপাদনশীল খাতে না যায়, তা যেন ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা সরাসরি তদারকি করেন।

ধারণা করা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, শেয়ারবাজারের এ উত্থানে ব্যবসা বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ঋণ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারে। এমনটা হলে শেয়ারবাজারে অতিরিক্ত তারল্য ঢুকে এ বাজার যেমন অস্থির হয়ে উঠতে পারে, তেমনি ঋণ গ্রহণ করা প্রতিষ্ঠান ঋণ ফেরতে ব্যর্থ হলে ওই ঋণ খেলাপি হয়ে পড়বে। তাতে ব্যাংক খাতেও সমস্যা তৈরি করবে।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বিভিন্ন ব্যাংককে চিঠি দিয়ে, ব্যাংকগুলোর ঋণ কার্যক্রমের তথ্য দৈনিকভিত্তিক তথ্য দিনের মধ্যেই পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছে। এ তথ্যের মধ্যে ব্যাংকগুলোর সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে (ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক ইত্যাদি) কোনো অর্থায়ন করলে তারও তথ্য দিতে বলেছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শেয়ারবাজারে ব্যাংকের অনিয়ন্ত্রিত অর্থায়ন ঠেকাতেই এ আদেশ জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এই নির্দেশনা প্রকাশের গত বৃহস্পতিবারের তারিখে জারি মার্জিন ঋণ ইস্যুতে এক আদেশ জারি করে বিএসইসি। তাতে শেয়ারদর ও সূচক বর্তমানের তুলনায় আরও বাড়লেও সর্বোচ্চ মার্জিন ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।

বিএসইসির আদেশে বলা হয়েছে, ডিএসইএক্স সূচক ৮০০০ পয়েন্ট পর্যন্ত গেলে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউস তাদের গ্রাহকদের ৮০ শতাংশ হারে মার্জিন ঋণ বিতরণ করতে পারবে। ইতোপূর্বের এ সংক্রান্ত আদেশ অনুযায়ী, ৭০০০ পয়েন্ট পর্যন্ত এ হারে ঋণ দেওয়ার সীমা বেধে দিয়েছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পর আজকের শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা করেছিলেন অনেকে। তা ঠেকাতেই মার্জিন ঋণ সংক্রান্ত নীতিমালা সীথিল করেছে বিএসইসি।