গুজবে ও আতঙ্কে টালমাটাল শেয়ারবাজার। টানা সপ্তম দিনের দরপতনে মঙ্গলবার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি শেয়ার দর হারিয়েছে। তবে দর যত হারিয়েছে, আতঙ্ক ছড়িয়েছে তার বহুগুণ। গতকাল লেনদেন শুরুর প্রথম ১৫ মিনিটে বাজারের প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স ৮৯ পয়েন্ট বেড়ে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দেয়। অথচ লেনদেন শেষ হওয়ার আধা ঘণ্টা আগে উল্টো ৮৯ পয়েন্ট পড়ে যায়। অর্থাৎ দিনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে পতন হয়েছে ১৭৮ পয়েন্ট। বাজারে পতন দেখে বুঝে না বুঝে অনেকেই শেয়ার বিক্রি করতে থাকেন। যারা শেয়ার কেনার আদেশ দিয়েছিলেন, তারা তুলে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

গতকাল বাজারে ব্যাপকভাবে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোতে এ গুজব অনেকে বিশ্বাস করেন। এ অবস্থায় আরও বড় দরপতন হওয়ার আগে নিজের শেয়ার বিক্রি করে পুঁজি বাঁচাতে মরিয়া ছিলেন অনেক বিনিয়োগকারী।

কী কারণে বিএসইসির চেয়ারম্যান পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন- এমন প্রশ্নে গুজবে-আতঙ্কে ভোগা বিনিয়োগকারীদের উত্তর ছিল, গত কয়েক মাস ধরে শেয়ারবাজারের ঊর্ধ্বমুখী ধারায় লাগাম টানতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংককে নিবৃত্ত করতে না পেরে বিএসইসির চেয়ারম্যান পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। একটি সূত্র জানায়, পরিকল্পিতভাবে একটি চক্র শেয়ার বিক্রি করে বাজার ফেলেছে। তারাই গুজবটি ছড়িয়ে থাকতে পারে।

বিএসইসির চেয়ারম্যান গতকাল বিকেলে সমকালকে নিশ্চিত করেন, তার পদত্যাগের গুজব সম্পর্কে তিনি শুনেছেন। তিনি বলেন, বিএসইসির চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করার মতো কোনো ঘটনাই ঘটেনি। শুধু শুধু কেন পদত্যাগ করতে যাবেন। কে বা কারা গুজব ছড়িয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বিএসইসির সম্পর্ক খারাপ যাচ্ছে বলে তিনি পদত্যাগ করছেন। প্রকৃত তথ্য হলো- কিছু বিষয়ে মতদ্বৈততা থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বিএসইসির কোনো বিরোধ নেই।

গত কিছু দিনের দরপতনের কারণও ছিল নানা গুজব। এর মধ্যে বড় গুজব ছিল শেয়ারবাজারের ঊর্ধ্বমুখী ধারা ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক আরও কঠোর হতে যাচ্ছে। এটা সত্যি হলে দরপতন আরও বাড়বে। এ সময়ে আলোচিত ও 'ট্রেন্ডি' শেয়ারগুলো দর হারাতে থাকলে অনেক বিনিয়োগকারী গুজবকেই সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেন। সতর্কতার অংশ হিসেবে অনেকে শেয়ার বিক্রি করেন। এতে গত ১১ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ৬ দিনে ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স ২৭০ পয়েন্ট হারায়। গতকাল মঙ্গলবার ৭৬ পয়েন্ট হারালে গত সাত দিনে সূচকের পতন হয়েছে ৩৪৭ পয়েন্ট বা পৌনে ৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্নিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, গত কয়েক মাস আগে বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রাবাজারে কিছু পদক্ষেপ নেয়। এর কিছু নেতিবাচক প্রভাব শেয়ারবাজারেও ছিল। কিন্তু তা অনেক আগেই শেষ হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে তাদের দিক থেকে তেমন কোনো পদক্ষেপ বা কঠোর নজরদারি নেই। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে নিত্য নতুন গুজব ছড়ানো হচ্ছে।

দরপতন বিষয়ে বাজারের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, এ মুহূর্তের বাজারের সবচেয়ে বড় কারসাজির চক্র পরিকল্পিতভাবে শেয়ার বিক্রি করে বাজারের পতনকে ত্বরান্বিত করেছে। চক্রটি গতকাল বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউস থেকে তাদের হাতে থাকা শেয়ার ব্যাপকভাবে বিক্রির আদেশ দেয়। এর প্রভাবে এসব হাউসের অন্য বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করেন। এতে মাত্র দেড় ঘণ্টায় সূচক ১৭৮ পয়েন্ট হারায়। এই চক্র শেষ দুই ঘণ্টার মোট বিক্রির অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার তারা বিক্রি করেছে। এতে ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৭৬ শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২৫৪টিই দর হারায়।

এদিকে বড় পতনের পর গতকাল বিকেলে শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে বিএসইসি বৈঠক করে। বৈঠকে সূত্র জানায়, ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে বন্ড ইস্যু করে নিজস্ব বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।