বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) শীর্ষ পদে থেকে ড. এম. মোশাররফ হোসেন অবৈধভাবে শেয়ার ব্যবসা করছেন। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বীমা কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা করছেন তিনি। এ ছাড়া তিনি বেসরকারি কোম্পানির লাভজনক পদে আছেন। আইডিআরএ আইন অনুযায়ী যা অবৈধ। সমকালের অনুসন্ধানে এবং একাধিক সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
আইডিআরএর চেয়ারম্যান ড. এম. মোশাররফ হোসেন সেকেন্ডারি শেয়ারবাজার থেকে যেসব বীমা কোম্পানির কোটি কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা করেছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স, এশিয়া ইন্স্যুরেন্স, এশিয়া প্যাসিফিক ইন্স্যুরেন্স, পদ্মা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স, রূপালী ইন্স্যুরেন্স, ইসলামিক ইন্স্যুরেন্স ও এশিয়া ইন্স্যুরেন্স। এসব কোম্পানির শেয়ারের দর গত দেড় বছরে তিন থেকে ১০ গুণ হয়েছে। প্রভাতী ইন্স্যুরেন্সের দর ১৭ টাকা থেকে ২০০ টাকা ছাড়িয়েছিল। এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের দর হয়েছিল ১৭ টাকা থেকে ১৩৮ টাকা। আইডিআরএ প্রধান এমন কিছু কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা করেছেন, যেখানে কারসাজির মাধ্যমে অস্বাভাবিক দর বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। তবে নিজ নামে নয়, নিজের প্রতিষ্ঠিত দুই কোম্পানির মোট চারটি প্রভিডেন্ড এবং গ্র্যাচুয়িটি ফান্ডের নামে শেয়ার কেনাবেচা করছেন। ফান্ডগুলোর ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান তিনি। অন্যদিকে মূল কোম্পানি দুটির পরিচালক।
বীমা কোম্পানির বাইরে সম্প্রতি অস্বাভাবিক হারে দরবৃদ্ধি পাওয়া অন্য খাতের কোম্পানিতেও তার বিনিয়োগের তথ্য মিলেছে। এসব শেয়ারের উল্লেখযোগ্য হলো- ফরচুন সুজ, কাট্টলী টেক্সটাইল, জেনেক্স ইনফোসিস, সোনালী পেপার, সি পার্ল হোটেল, রিং শাইন টেক্সটাইল, এমএল ডাইং ও এসএস স্টিল। এর বাইরে এবি ব্যাংক, আমান কটন, কপারটেক, ঢাকা ব্যাংক, ইন্ট্রাকো সিএনজি, রানার অটোমোবাইলস, সিলকো ফার্মা, স্কয়ার টেক্সটাইল, নিউ লাইন ক্লোথিংসেও তার বিনিয়োগ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি স্বল্প মূলধনি কোম্পানির শেয়ারবাজার এসএমই বোর্ডে তালিকাভুক্ত হওয়া মাস্টার ফিড, ওরিজা এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজেও তার বিনিয়োগ আছে।
দেশের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে থেকে ড. এম. মোশাররফ হোসেনের বেআইনি শেয়ার ব্যবসা এবং সন্দেহজনক সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনে সম্প্রতি আবু সালেহ মোহাম্মদ আমীন মেহেদি নামের এক ব্যক্তি অর্থ মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এবং শ্রম অধিদপ্তরে চিঠি দেন। এসব সংস্থা কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিনি আদালতে রিট করেন। প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্টের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম এবং বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের দ্বৈত বেঞ্চ গত মঙ্গলবার রিট গ্রহণ করেন এবং উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তাদের পদক্ষেপ আগামী ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগকারীকে অবহিত করতে দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে নির্দেশ দিয়েছেন। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন রিটকারীর পক্ষের আইনজীবী সুমাইয়া ইফরিত বিনতে আহমেদ।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের ২০১০ সালের ৭(৩)(বি) ধারা অনুযায়ী, কোনো কোম্পানির লাভজনক পদে থেকে এ সংস্থার সদস্য বা পরিচালক পদে নিয়োগ পাওয়ার ও দায়িত্ব পালনের সুযোগ নেই। অথচ আইডিআরএ চেয়ারম্যান কোম্পানির লাভজনক পদে আছেন এবং সেই কোম্পানির নামেই শেয়ার ব্যবসা করছেন। ২০১৮ সালের এপ্রিলে প্রথমে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সদস্য হিসেবে আড়াই বছর দায়িত্ব পালন করেন মোশাররফ হোসেন। এর পর গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করছেন। আইডিআরএ আইনের ১৪ ধারা অনুযায়ী, এমন অবৈধ কাজের জন্য তাকে অপসারণ করার বিধান থাকার পরও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না অর্থ মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি সমকালকে জানান, আদালতে বিচারাধীন বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু সেকেন্ডারি বাজার থেকেই নয়, যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিককারী বিনিয়োগকারী হিসেবে প্রতিটি আইপিওর শেয়ার কিনছেন তিনি। সর্বশেষ সেনাকল্যাণ ইন্স্যুরেন্সের আইপিওতে ৫১ লাখ ২০ হাজার টাকার শেয়ার কেনার আবেদন করে দুই লাখ ৭৯ হাজার টাকার শেয়ার পেয়েছেন। অভিযোগ আছে, গত দেড় বছরের বীমা খাতের শেয়ারের অস্বাভাবিক উত্থানের নেপথ্যে তার ইন্ধন রয়েছে। বীমা কোম্পানিগুলোর মুনাফা/ইপিএস এবং সর্বনিম্ন কতটুকু লভ্যাংশ দেওয়া উচিত- তা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন তিনি। বীমা কোম্পানির শেয়ারদর বাড়াতে বীমা আইন অনুযায়ী উদ্যোক্তাদের ৬০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করে গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি সার্কুলার জারি করেন বলেও অভিযোগ আছে। বিদ্যমান অবস্থায় এ বিধান বাস্তবায়ন অযোগ্য- সমকালের প্রশ্নে এমন মন্তব্য করার পরও তিনি তা বাস্তবায়নে নানা তৎপরতা চালাচ্ছেন।
জাতীয় বীমা দিবস উদযাপন উপলক্ষে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বীমার শেয়ারদর বাড়াতে তিনি নেপথ্যে থেকে কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে- সমকাল প্রতিবেদকের এমন এক প্রশ্নের জবাবে ড. মোশাররফ হোসেন বলেছিলেন, তিনি তার কাজে এতই ব্যস্ত থাকেন যে, নিজের পোর্টফোলিওর (শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ) দিকে তাকানোর সুযোগ পান না। ওই বক্তব্যের মাধ্যমে নিজের শেয়ার ব্যবসাকে প্রকৃতপক্ষে স্বীকার করেন তিনি।
এর আগে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বীমা কোম্পানির কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ ওঠে ড. মোশাররফের বিরুদ্ধে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি ডেল্টা লাইফের পরিচালনা পর্ষদ ড. মোশাররফের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলন করে। এর পরই ডেল্টা লাইফের পর্ষদ স্থগিত করে নিজের পছন্দ মতো প্রশাসক বসিয়েছিলেন তিনি। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর এখন পর্যন্ত দু'জনকে প্রশাসক পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে। বর্তমানে তৃতীয় প্রশাসক বীমা কোম্পানিটি পরিচালনা করছেন। এ নিয়ে একাধিক মামলা উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
কোম্পানির পদে আইডিআরএ চেয়ারম্যান :নতুন উত্থাপিত অভিযোগ অনুযায়ী, ড. মোশাররফ শেয়ার ব্যবসা পরিচালনা করছেন নিজ প্রতিষ্ঠিত লাভস অ্যান্ড লাইভস অর্গানিক এবং গুলশান ভ্যালি ফুডস নামে নিজ প্রতিষ্ঠিত দুই কোম্পানির নামে একটি করে এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ড ফান্ড এবং গ্রাচুয়িটি ফান্ড অর্থাৎ মোট চারটি ফান্ড চালু করে। উভয় কোম্পানিতে তিনি মূল শেয়ারহোল্ডার। অন্য শেয়ারহোল্ডার তার স্ত্রী জান্নাতুল মাওয়া। ওই দুই কোম্পানিতে ড. মোশাররফ পরিচালক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং তার স্ত্রী পরিচালক। সর্বশেষ দাখিল করা আয়কর রিটার্নে ড. মোশাররফ এ দুই কোম্পানির শেয়ার ধারণ ও পরিচালক পদে থাকার তথ্য নিজেই দিয়েছেন।
ড. মোশাররফের বক্তব্য :প্রাপ্ত অভিযোগ ও সমকালের অনুসন্ধানের বিষয়ে গত কয়েক দিনে বারবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। খুদে বার্তার কোনো জবাব দেননি। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হোয়াটসঅ্যাপে এ প্রতিবেদককে ফোন করে তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে শেয়ার কেনাবেচা করায় কোনো বিধিনিষেধ নেই। কিন্তু কোম্পানির পদে থেকে কী করে চেয়ারম্যান পদে আছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইডিআরএর বাইরে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের পদে তিনি নেই।
বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে থেকে বীমা কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রথমে তিনি বলেন, কোনো বীমার কোম্পানির শেয়ারে তার বিনিয়োগ নেই। এ বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে জানালে তিনি বলেন, হয়তো অল্প কিছু শেয়ার থাকতে পারে। তিনি শেয়ার কেনাবেচা করেন না। ব্রোকারেজ হাউস তাকে না জানিয়ে শেয়ার কেনাবেচা করে থাকতে পারে বলে দাবি করেন তিনি।
এর আগে গত ১৭ অক্টোবর মোশাররফ হোসেন সমকালকে বলেন, আইডিআরএর সদস্য পদে যোগ দেওয়ার তিন মাস আগে তিনি কোম্পানি দুটি গঠন করেছিলেন। সদস্য পদে নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তাছাড়া কোম্পানি গঠন হলেও এর ব্যবসা কার্যক্রম শুরু করেননি।
প্রভিডেন্ড ফান্ডের বিনিয়োগ কার :ব্যবসা না থাকার দাবি করলেও উভয় কোম্পানির এমপ্লয়িদের জন্য আছে কোটি কোটি টাকার দুটি করে মোট চারটি এমপ্লয়ি প্রভিডেন্ড ফান্ড এবং গ্রাচুয়িটি ফান্ড, যার ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান তিনি। আবার এ ফান্ড থেকে নিয়মিত শেয়ার কেনাবেচাও করছেন। তার আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী, লাভস অ্যান্ড লাইভস অর্গানিক্সে ড. মোশাররফ পরিচালক এবং কোম্পানির ১০০ টাকা অভিহিত মূল্যের মোট পাঁচ হাজার শেয়ারের মধ্যে সাড়ে চার হাজারই তার। এ কোম্পানির প্রভিডেন্ড এবং গ্রাচুয়িটি ফান্ডের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান তিনি এবং যোগাযোগকারী হিসেবে তার নিজের মোবাইল নম্বর ও ই-মেইল অ্যাড্রেস দিয়েছেন। ব্যাংক হিসাব মোশাররফ হোসেনের একার স্বাক্ষরে পরিচালিত হয়।
লাভস অ্যান্ড লাইভস অর্গানিক এবং গুলশান ভ্যালি ফুড ইন্ডাস্ট্রিজে ড. মোশাররফ হোসেন এবং তার স্ত্রীর মোট বিনিয়োগ মাত্র পাঁচ লাখ টাকা। কিন্তু দুই কোম্পানির চার প্রভিডেন্ড এবং গ্রাচুয়িটি ফান্ডে মোট চার কোটি টাকার বিনিয়োগের তথ্য মিলেছে। তার সর্বশেষ দাখিল করা আয়কর বিবরণী অনুযায়ী, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মূল্য ছিল ৭২ লাখ ৪২ হাজার টাকা। তার দাবি অনুযায়ী, কোম্পানির ব্যবসা না থাকলে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগের উৎস নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।





বিষয় : আইডিআরএ চেয়ারম্যান

মন্তব্য করুন