তেলেসমাতি কাণ্ড ঘটেছে শেয়ারবাজারে। ৩০ টাকার শেয়ার মাত্র তিন টাকা দরে কেনাবেচা হয়েছে। বীমা খাতের এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের মোট চার লাখ ৩০ হাজার ৯৮০টি শেয়ার ১২ লাখ ৯৩ হাজার টাকায় কেনাবেচা হয়েছে এমন দরে। প্রকৃত দর ৩০ টাকায় কেনাবেচা হলে, এ শেয়ারের লেনদেন মূল্য হতো প্রায় এক কোটি ২৯ লাখ টাকার বেশি। লভ্যাংশ ঘোষণার পরদিন শেয়ারদরে সার্কিট ব্রেকার না থাকায় গতকাল বৃহস্পতিবার এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রে এ ঘটনা ঘটেছে।
সংশ্নিষ্টদের দাবি, ৩০ টাকায় শেয়ার বিক্রির আদেশ বসাতে গিয়ে ভুল করে ৩ টাকায় লেনদেন অর্ডার বসানো হয়েছিল। এটা অনিচ্ছাকৃত বলেও দাবি তাদের। তবে সার্বিক তথ্য বিশ্নেষণ করে একাধিক ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এটি পরিকল্পিতভাবে হয়ে থাকতে পারে।
সন্দেহজনক হওয়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) লেনদেনটি গতকালই বাতিল করেছে। লেনদেন বাতিল হলেও কী করে এমনটি হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি করেছে স্টক এক্সচেঞ্জটি। শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিও খতিয়ে দেখছে।
সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আলোচিত শেয়ার লেনদেনে বিক্রেতা ছিল ফারইস্ট ইসলামী সিকিউরিটিজ নামের ব্রোকারেজ হাউস। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব ডিলার অ্যাকাউন্ট থেকে এ শেয়ার বিক্রির আদেশ দেয়। ওই আদেশ দেখে নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে ওই দরে পুরো শেয়ার কিনে নেন লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের এক নারী গ্রাহক। তার নাম-পরিচয় অবশ্য জানা যায়নি।
জানতে চাইলে লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের সিইও খোন্দকার সাফফাত রেজা সমকালকে বলেন, ওই বিনিয়োগকারী তার মোবাইল অ্যাপ থেকে শেয়ার কিনেছেন, সরাসরি ব্রোকারেজ হাউস থেকে লেনদেনটি হয়নি। তবে এ বিষয়ে ফারইস্ট লাইফ সিকিউরিটিজের সিইও মো. নাজমুন মনিরের কোনো ভাষ্য পাওয়া যায়নি। সন্ধ্যায় এ বিষয়ে ফোন করা হলে জানান, তিনি ডিএসইতে এ বিষয়ে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে আছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সকাল ১০টায় লেনদেন শুরুর প্রথম ১০ সেকেন্ডে ৩১ টাকা ৪০ পয়সা দরে মোট আড়াই হাজার শেয়ার কেনাবেচার মধ্য দিয়ে গতকাল এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের লেনদেন শুরু হয়। আলোচিত লেনদেনের সবগুলো (মোট ৫টি) সম্পন্ন হয় সকাল ১০টা ৩৩ সেকেন্ডে। ওই এক সেকেন্ডেই আরও দশটি লেনদেনে মোট ৮৩ হাজার ২০টি শেয়ার কেনাবেচা হয়। এর মধ্যে ৩০ টাকা দরে ২০ হাজার এবং ৩০ টাকা ১০ পয়সা দরে পাঁচ হাজার, ৩০ টাকা ২০ পয়সা দরে ৮ হাজার শেয়ার কেনাবেচা হয়। বাকি শেয়ারগুলো কেনাবেচা হয় ৩০ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৩১ টাকা ৪০ পয়সার মধ্যে।
কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তা জানান, শেয়ার লেনদেনে অনেক সময় কাছাকাছি কোডের শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্রে ভুল করে এক শেয়ারের পরিবর্তে অন্য শেয়ার কেনা বা বেচার অর্ডার বসানো হয়। একইভাবে শেয়ারদরের ক্ষেত্রেও ভুল হয়। তবে এ লেনদেনটি পূর্বপরিকল্পিত হয়ে থাকতে পারে। সন্দেহের কারণ, কেউ ভুল করে ৩০ টাকার শেয়ার তিন টাকায় বিক্রির আদেশ বসাতে পারে, কিন্তু একবারে এত সংখ্যক শেয়ার বিক্রির আদেশ বড় প্রতিষ্ঠান সাধারণত বসায় না। তাছাড়া লেনদেনের শুরুর মাত্র ৩৩ সেকেন্ডে লেনদেন অর্ডার বসানোয় খুব এক্সপার্ট না হলে এত দ্রুততায় ক্রয় অর্ডার বসানো প্রায় অসম্ভব, বিশেষত মোবাইল অ্যাপে।
এদিকে সার্বিক হিসাবে গতকাল ঊর্ধ্বমুখী ছিল শেয়ারবাজার। তুলনামূলক দরবৃদ্ধি পাওয়া শেয়ার সংখ্যা ছিল বেশি, সূচকও বেড়েছে। এমনকি এক মাস বা ২৩ কার্যদিবস পর ডিএসইর লেনদেন ফের হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ডিএসইতে গতকাল ১৯৮ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের দর বেড়েছে। বিপরীতে ১৩৫টির দর কমেছে, অপরিবর্তিত ৪৮টির দর। ডিএসইএক্স সূচক ৫১ পয়েন্ট বেড়ে ৬৪২৫ পয়েন্ট ছাড়িয়েছে। সূচকের বৃদ্ধিতে খাতওয়ারি হিসেবে বেশি অবদান ছিল ওষুধ ও রসায়ন খাতের। লেনদেন হয়েছে এক হাজার ৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকার শেয়ার, যা বুধবারের তুলনায় ১০২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা বেশি।