অন্য কোনো উপায়ে দরপতন রুখতে না পেরে ফের সব শেয়ারের দরে ফ্লোর প্রাইস আরোপ আরোপ করেছে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।  বৃহস্পতিবার (২৮ জুলাই) বিকেলে এ বিষয়ে আদেশ দিয়েছে সংস্থাটি। আগামী রোববার (৩১ জুলাই) থেকে এ নিয়ম কার্যকর হবে।

শেয়ারদরে ফ্লোর প্রাইস হলো এমন একটি বাজারদর যার নিচে তালিকাভুক্ত কোনো শেয়ার বা অন্য কোনো সিকিউরিটিজ (যেমন- বন্ড বা মিউচুয়াল ফান্ড ইত্যাদি) কেনাবেচা হতে পারবে না। লাগাতার দরপতন ঠেকাতে এ নিয়ে শেয়ারদরে দ্বিতীয় দফায় ফ্লোর প্রাইস আরোপ করল বিএসইসি। প্রথমবার ২০২০ সালের ১৮ মার্চে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করেছিল এ সংস্থা।

প্রথম দফায় 'সাময়িক' সময়ের জন্য ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হলেও তা প্রত্যাহারে এক বছরের বেশি সময় নিয়েছিল সংস্থাটি। মোট দুই দফায় ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করেছিল। প্রথমে ২০২১ সালের ১১ এপ্রিল ৬৬ কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস তুলে নেয়। তবে ওই শেয়ারগুলোর দরপতন শুরু হলে দুইদিন পরই ওই শেয়ারগুলোর দরের ওপরের স্বাভাবিক সার্কিট ব্রেকার কার্যকর রেখে নিচের সার্কিট ব্রেকার ২ শতাংশ বেধে দেয়। দ্বিতীয় দফায় একই বছরের ১৭ জুন বাকি সব শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস তুলে নিয়েছিল।

ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণের নিয়ম

বৃহস্পতিবার জারি করা নতুন আদেশ অনুযায়ি, এদিন এবং এর আগের চার কার্যদিবসের ক্লোজিং প্রাইসের গড় হবে সংশ্নিষ্ট সব শেয়ার ও সিকিউরিটিজের ফ্লোর প্রাইস। অর্থাৎ চলতি সপ্তাহের রোববার থেকে আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মোট পাঁচ কার্যদিবসের ক্লোজিং প্রাইসের গড়ই হবে ফ্লোর প্রাইস।

ফ্লোর প্রাইস আরোপের সাথে সাথে শেয়ারদরের স্বাভাবিক সার্কিট ব্রেকার হারও কার্যকর হবে। যেমন- ২০০ টাকা পর্যন্ত বাজারদর বিশিষ্ট শেয়ারের ক্ষেত্রে ওপরে ও নিচে ১০ শতাংশ সার্কিট ব্রেকার কার্যকর হবে। ২০০ টাকার বেশি থেকে ৫০০ টাকা দরের শেয়ারে সার্কিট ব্রেকার হবে পৌনে ৯ শতাংশ। ৫০০ টাকার বেশি থেকে এক হাজার টাকা দরের শেয়ার সার্কিট হার হবে সাড়ে ৭ শতাংশ। এক হাজার টাকার বেশি থেকে দুই হাজার টাকা দরে সার্কিট হার হবে সোয়া ৬ শতাংশ। দুই হাজারের বেশি থেকে পাঁচ হাজার টাকা দরের শেয়ারে সার্কিট হার হবে ৫ শতাংশ। এর থেকে বেশি দরের শেয়ারে সার্কিট হার পৌনে ৪ শতাংশ কার্যকর থাকবে।

তবে সার্কিট ব্রেকার কার্যকর হলেও রোববার থেকে পরবর্তি নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নতুন ফ্লোর প্রাইসের নিচে সংশ্নিষ্ট শেয়ার বা সিকিউরিটিজ কেনাবেচা হতে পারবে না।

সার্কিট ব্রেকার কার্যকরের ক্ষেত্রে যদি দেখা যায়, তা ফ্লোর প্রাইসের থেকে কম হয়ে যাচ্ছে, তবে ফ্লোর প্রাইসই হবে ওইদিনের সর্বনিম্ন সার্কিট।

নতুন তালিকাভুক্ত শেয়ারের ক্ষেত্রেও ফ্লোর প্রাইস কার্যকর হবে। এক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট শেয়ারের প্রথম দিনের ক্লোজিং প্রাইস হবে সংশ্নিষ্ট শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস।

ফ্লোর প্রাইস কার্যকর হলেও বোনাস বা রাইট শেয়ারের কারণে সংশ্নিষ্ট শেয়ারের দর স্বাভাবিক নিয়মে সংশোধন হবে। এক্ষেত্রে সংশোধিত দরই হবে নতুন ফ্লোর প্রাইস।

ফ্লোর প্রাইস সংক্রান্ত নতুন আদেশের কারণে যেসব শেয়ারের দর চলতি সপ্তাহে ক্রমাগত কমছিল, সেগুলোর দর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যাবে। আবার যেসব শেয়ারের দর বাড়ছিল, সেগুলোর দর কিছুটা কমবে।

ফ্লোর প্রাইস যেভাবে গণনা করতে হবে

বৃহস্পতিবার গ্রামীণফোনের শেয়ারের ক্লোজিং প্রাইস ছিল ২৮৫ টাকা ৭০ পয়সা। গত রোববার থেকে বুধবার পর্যন্ত ক্লোজিং প্রাইস ছিল যথাক্রমে ২৮৭ টাকা ৯০ পয়সা, ২৮৭ টাকা ১০ পয়সা, ২৮৬ টাকা ৩০ পয়সা এবং ২৮৬ টাকা ৩০ পয়সা। এর পাঁচটি দরের গড় হলো- ২৮৬ টাকা ৬৬ পয়সা। পয়সার হিসেবে সর্বশেষ পূর্ণ সংখ্যার হিসেবে ফ্লোর প্রাইস হবে ২৮৬ বা ৭০ পয়সা।

বিএসইসির বেধে দেওয়া নিয়মানুযায়ি, আগামী রোববার থেকে গ্রামীণফোনের শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস হবে ২৮৬ টাকা ৭০ পয়সা। ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার বা এ সংক্রান্ত নিয়মে পরিবর্তন না আনা পর্যন্ত এ দরের নিচে এ শেয়ার কেনাবেচা হতে পারবে না।

আবার শেয়ারদরের সার্কিট ব্রেকার ফের কার্যকর করার কারণে এ শেয়ারটি পৌনে ৯ শতাংশ বেশি বা কম দরে কেনাবেচার সুযোগ তৈরি হবে। এক্ষেত্রে রোববার গ্রামীণফোনের শেয়ারের সর্বনিম্ন সার্কিট দর (৮.৭৫ শতাংশ কমে) ২৬১ টাকা ৬০ পয়সা এবং সর্বোচ্চ সার্কিট দর (৮.৭৫ শতাংশ বেশি) ৩১১ টাকা ৭০ পয়সা দরে কেনাবেচার সুযোগ থাকার কথা।

কিন্তু ফ্লোর প্রাইসের কারণে নিচের সার্কিট ব্রেকার কার্যকর হবে না, অর্থাৎ ২৮৬ টাকা ৭০ পয়সার নিচে কেনাবেচা হতে পারবে না। তবে সর্বোচ্চ দর ৩১১ টাকা ৭০ পয়সা দরে কেনাবেচার সুযোগ থাকবে।

ধরা যাক- রোববার গ্রামীণফোনের শেয়ারদর বেড়ে ক্লোজ প্রাইস হলো ২৯০ টাকা। তাহলে সোমবার ২৯০ টাকার নিচে কেনাবেচার সুযোগ থাকবে। তবে পৌনে ৯ শতাংশ সার্কিট না হয়ে, ফ্লোর প্রাইসের কারণে সর্বনিম্ন ২৮৬ টাকা ৭০ পয়সায় কেনাবেচা করা যাবে, এর নিচে নয়।

আরো সহজ উদাহরণ

ধরা যাক কোনো শেয়ারের চলতি সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসের ক্লোজিং প্রাইসের গড় হলো ১০০ টাকা। এখন রোববার থেকে এর ফ্লোর প্রাইস হবে ১০০ টাকা। অর্থাৎ পরবর্তি নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এর নিচে শেয়ারটি কেনাবেচা করা যাবে না। আবার এর বাজার দরের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক সার্কিট ব্রেকার হারও কার্যকর হবে।

সার্কিট ব্রেকারে নিয়ম অনুযায়ী, এর দর ২০০ টাকা সীমার মধ্যে থাকায় শেয়ারটির ১০ শতাংশ কমে ৯০ টাকা থেকে ১০ শতাংশ বেশিতে অর্থাৎ ১১০ টাকা দরে কেনাবেচা হওয়ার কথা।

কিন্তু বেধে দেওয়া নতুন নিয়মের কারণে সর্বনিম্ন ১০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১১০ টাকা শেয়ারটি কেনাবেচা করা যাবে।

আরো ধরা যাক- রোববার শেয়ারটির দর বেড়ে ১০৫ টাকায় ক্লোজ হলো। তাহলে রোববার সার্কিট ব্রেকারের ১০ শতাংশ নিয়মের কারণে সর্বনিম্ন ৯৪ টাকা ৫০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১১৫ টাকা ৫০ পয়সায় কেনাবেচার সুযোগ থাকার কথা। তবে এদিনও ফ্লোর প্রাইসের কারণে ওই শেয়ার সর্বনিম্ন ১০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১১৫ টাকা ৫০ পয়সায় কেনাবেচা করা যাবে। এভাবে শেয়ারটির দর ১১১ টাকা না ছাড়ানো পর্যন্ত এর নিচের সার্কিট ব্রেকার পুরোপুরি কার্যকর হবে না।

সোজা কথা হলো- কোনো শেয়ারের দর বেধে দেওয়া ফ্লোর প্রাইস থেকে বেড়ে গেলে ওই শেয়ারের দর সার্কিট ব্রেকারের নিয়ম অনুযায়ি প্রযোজ্য সার্কিট ব্রেকার হার পর্যন্ত কমতে পারবে। প্রযোজ্য সার্কিট হার কার্যকর করতে গিয়ে ফ্লোর প্রাইসের কম হলে সেক্ষেত্রে ফ্লোর প্রাইসই হবে ওইদিনের নিচের সার্কিট দর।

বিশ্বে শেয়ারদরে ফ্লোর প্রাইস

দেশে কমোডিটি বা নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের (যেমন- চাল, ডাল, ভোজ্য তেল ইত্যাদি) বাজারদর নিয়ন্ত্রণে করতে ওই সব পণ্যের ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে। তবে বাংলাদেশের বাইরে শেয়ারের দরপতন ঠেকাতে 'ফ্লোর' বা সর্ব নিম্ন স্তর বেধে দেওয়ার একমাত্র নজির আছে পাকিস্তানে।

২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার সময় বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির চাপে ব্যাপক দরপতন হচ্ছিল পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় শেয়ারবাজার করাচি স্টক এপচেঞ্জে (কেএসই)। ওই বছরের ২০ আগষ্টের পর টানা ছয় দিনে ওই বাজারের কেএসই নামক প্রধান মূল্য সূচকের ৪৩ শতাংশ পতন হয়। এরপর 'সাময়িক সময়ের জন্য' বলে ওই বছরের ২৮ আগষ্ট ফ্লোর প্রাইস আরোপ করেছিল করাচি স্টক এপচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে শেয়ারদরের স্বাভাবিক সার্কিট ব্রেকারও কার্যকর রাখে।

তবে চার মাসেরও কম সময়ের মধ্যে সেদেশের শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় স্টক এপচেঞ্জটি। যদিও ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার পরও ক্রমাগত দরপতন হয়েছিল ওই বাজারে। কিন্তু আর কখনো ফ্লোর প্রাইস আরোপ করেনি করাচি স্টক এক্সচেঞ্জটি। চারশ বছরের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে বিশ্বের আর কোনো শেয়ারবাজারে শেয়ারদরে ফ্লোর প্রাইস আরোপের তৃতীয় কোনো নজির নেই।

বিশেষজ্ঞ মত

দরপতন ঠেকাতে নতুন করে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করার খবরে বিশ্ময় প্রকাশ করেছেন শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অনারারি অধ্যাপক আবু আহমেদ। তিনি বলেন, পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমন নিয়ম নেই। এটা শেয়ারবাজার এবং অর্থনীতির চাহিদা ও যোগান ধারণার বিপরীত। এভাবে পতন ঠেকানোর নিয়ম করা আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত।

প্রায় একই মন্তব্য করেছেন বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী। তিনি বলেন, এটা এটা 'কন্ট্রোলড মার্কেট' হয়ে গেলো। এমন মার্কেটে প্রকৃত বিনিয়োগ ও বিনিয়োগকারী কমবে। তাতে সংকট আরো বাড়বে। শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ দরপতন ঠেকানো নয়, বরং স্বাভাবিক লেনদেন নিশ্চিত করা, কারসাজি নিয়ন্ত্রণ করা। তা না করে এভাবে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা হলে কারসাজির চক্র উৎসাহিত হয়। আখেরে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি।

বিএসইসির বক্তব্য

নতুন ফ্লোর প্রাইস 'খুবই সাময়িক' সময়ের জন্য আরোপ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র রেজাউল করিম।

জানতে চাইলে তিনি সমকালকে বলেন, করোনা মহামারি পরবর্তি এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট বৈশ্বিক সংকটাবস্থায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। আতঙ্কে অনেকে শেয়ার বিক্রি করছেন। এতে শেয়ার বিক্রির চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় দরপতন হচ্ছে। দরপতন বন্ধ করতেই 'খুবই সাময়িক' সময়ের জন্য ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হয়েছে।

'খুবই সাময়িক' বলতে কী বোঝাচ্ছেন জানতে চাইলে বিএসইসির মুখপাত্র বলেন, এর অর্থ খুব অল্প সময়ের জন্য এ নিয়ম চালু করা হলো। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরলে, দরপতন বন্ধ হলে স্বাভাবিক নিয়ম কার্যকর হবে, অর্থাৎ ফ্লোর প্রাইস তুলে দেবে। তবে তা কখন করা হবে, তা কমিশনই (বিএসইসি) ঠিক করবে বলে জানান বিএসইসির মুখপাত্র।

নতুন আরোপিত সম্ভাব্য ফ্লোর প্রাইস (পিডিএফ ফাইল)