শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেছেন, শেয়ারদরে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা ঠিক নয়। এতে নিজেদের ক্ষতি হচ্ছে। মন থেকে তিনি নিজেও চান না। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের বাঁচানোর জন্য বাধ্য হয়ে এ নিয়ম চালু করেছেন। ইউরোপ-আমেরিকার বাজারের মতো ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হলে এটি করা লাগত না। বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীদের ৮০ শতাংশ ক্ষুদ্র। গুজবে বা উত্তেজিত হয়ে তারা শেয়ার বিক্রি করাতে বাজারে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তিনি নিজেও শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক সংগঠন আইওএসসিও সদস্য। এ সংস্থার নিয়ম অনুযায়ীও এটা (ফ্লোর প্রাইস) ঠিক নয়।

গতকাল রোববার শেয়ারবাজার বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন সিএমজেএফের এক আলোচনা অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের উত্তরে এসব কথা বলেন বিএসইসির চেয়ারম্যান। রাজধানীর পল্টনে সিএমজেএফ কার্যালয়ে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এদিকে শেয়ারবাজারে ফ্লোর প্রাইস আরোপের প্রথম দিনে লেনদেন হওয়া ৩৮২ শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩৬২টি বা প্রায় ৯৫ শতাংশের দর বেড়েছে। বিপরীতে কমেছে মাত্র সাতটির দর এবং অপরিবর্তিত ছিল ১৩টির। প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ১৫৩ পয়েন্ট বেড়ে ৬১৩৪ পয়েন্ট ছুঁই ছুঁই অবস্থানে চলে গেছে। অবশ্য টানা দরপতনের ধারায় থাকা গত সপ্তাহের গড়মূল্যকে ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ২৮৭ শেয়ারের দর বেড়ে যায়। এ কারণে সূচক উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। গতকাল দিনব্যাপী কেনাবেচা হয়েছে প্রায় ৫৬৮ কোটি টাকার শেয়ার।

লেনদেন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গত সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসের ক্লোজিং প্রাইসের গড়কে ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করায় লেনদেনের শুরুতে ২৮৭ শেয়ার ও ১৫ মিউচুয়াল ফান্ডের দর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যায়। এতে সূচকও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়েছে।

খাতওয়ারি লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রতিটি খাতের প্রায় সব শেয়ারের দর বেড়েছে। তবে সবচেয়ে বেড়েছে বীমা খাতের শেয়ারদর। এ খাতের ৫৪ কোম্পানির মধ্যে একটি বাদে সবগুলোর দর বেড়েছে। গড়ে এ খাতের দর বেড়েছে ৭ শতাংশ।

বিএসইসি চেয়ারম্যান ফ্লোরপ্রাইস ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দেন। দায়িত্ব গ্রহণের সময় সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও কারসাজি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও মেয়াদের অর্ধেকের বেশি সময় পার করার সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও কারসাজি বন্ধ করতে পেরেছেন কিনা- এমন প্রশ্নে শিবলী রুবাইয়াত বলেন, সুশাসন একার পক্ষে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ জন্য সংশ্নিষ্ট সবাইকে সচেতন হতে হয়।

শেয়ারবাজারে সুশাসন প্রশ্নে তিনি আরও বলেন, 'আমি একা কতটুকু পারব? আমার কাজ কী শুধু চোর ধরা? এখানে দরকার সুষ্ঠু পরিবেশ, যেখানে সবাই সুন্দর করে ব্যবসা করবে। এখন আমাকে যদি বলেন- একে ধরেন, ওকে জরিমানা করেন, কম জরিমানা করলেন কেন, বেশি করে জরিমানা করেন, ওমুককে বের করে দেন- এটাই কী কেবল সুশাসন?

উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে কাউকে সাজা দিয়ে ভালো করা যাবে না, এমন মন্তব্য করে বিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, ভালো-খারাপ সবাইকে নিয়ে কাজ করতে হয়। কেউ খারাপ কাজ করলে চেষ্টা করতে হয়, তাকে যতটা সম্ভব ঠিক পথে নিয়ে আসা। সব লোককে জেলে পাঠালে তো তাদের ভাত খাওয়াতেই বাজেট বাড়াতে হবে। রাগ বা ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে ওই লোককে ঠিক করা যাবে না। শুধু মারধর করে কাউকে সোজা করা যায় না। এটা বুঝতে হবে। এখন একা তাঁর পক্ষে সবাইকে ঠিক করা সম্ভবও নয়। তালিকাভুক্ত কোম্পানি, মার্চেন্ট ব্যাংক, ব্রোকারেজ হাউস, বিনিয়োগকারী, বাজার অংশগ্রহণকারী এদের সবাইকে তিনি একা ঠিক করতে পারবেন না। পৃথিবীর কেউ পারবে না।

অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে ব্যাংকের এক্সপোজার গণনা পদ্ধতি শিগগির ক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে হবে। এখন এক্সপোজার বাজারমূল্যে গণনা করা হয় বলে শেয়ারদর বেড়ে গেলে ব্যাংকগুলোকে বাধ্য হয়ে শেয়ার বিক্রি করতে হয়। ক্রয়মূল্যে গণনা করলে এ সমস্যা থাকবে না। ২০১০ সালের আগে ও পরে ১০০ টাকার ওপর কেনা শেয়ারের দর এখন ১০ টাকার নিচে- এ অবস্থায় এক্সপোজার গণনা পদ্ধতি বাজারমূল্যের থেকে ক্রয়মূল্যে পরিবর্তন হলে সার্বিক এক্সপোজার উল্টো বেড়ে যাবে কিনা এবং কোনো কোনো ব্যাংক শেয়ার বিক্রি করতে বাধ্য হবে কিনা এমন প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেননি তিনি।