বেসরকারি খাতের অনেক উদ্যোগ বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। স্টার্টআপদের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় বেসরকারি খাত থেকে যারা শুরু থেকে উদ্যমী হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে গ্রামীণফোন অন্যতম। স্টার্টআপ ও ইকোসিস্টেম সম্পর্কে আমরা কথা বলেছি গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসির আজমান-এর সাথে।

সমকাল: একটি বৃহৎ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি হিসেবে গ্রামীণফোন কেন স্টার্টআপের সাথে যুক্ত হল?

ইয়াসির আজমান: গ্রামীণফোন থেকে আমরা তারুণ্যের শক্তিকে মূলধারায় নিয়ে আসার জন্য সবসময় কাজ করেছি। স্টার্টআপ এমন একটি ধারণা, যা ব্যবসার মাধ্যমে বিশ্বকে পরিবর্তন করতে চায়, ব্যবসাকে অনেক বড় স্কেলে নিয়ে যেতে চায়। পরিবর্তনের চিন্তা কিন্তু তরুণরাই করে থাকে। আমরা তরুণদের পাশে থেকে তারা যেন বহুদূর যেতে পারে সেই লক্ষে কাজ করতে চেয়েছি।

একটা উড়োজাহাজের জন্য টেক অফের সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়। এরপর একটা দূরত্ব অতিক্রম করে ফেলার পর অটো পাইলট মোডে দিয়ে দিলে সেটি নির্বিঘ্নে উড়তে পারে। স্টার্টআপের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি একই রকম। শুরু করার সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ, এই সময়ে সঠিক নির্দেশনা পেলে, সহায়তা পেলে তারা তাদের যে কাঙ্খিত গন্তব্য সেটিতে পৌঁছাতে পারে।

স্টার্টআপ যেহেতু পরিবর্তন, উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করে; সেটি কিন্তু দেশের জন্য প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। দেশের প্রতি, তরুণদের প্রতি আমাদের যে দায়বদ্ধতা, সেই জায়গা থেকে আমরা গ্রামীণফোন এক্সিলারেটর শুরু করি।

সমকাল: এখন পর্যন্ত সাতটি ব্যাচ নিয়ে কাজ করেছে গ্রামীণফোন এক্সিলারেটর। আপনারা যে ভিশন বা দর্শন নিয়ে শুরু করেছিলেন, তার কতটুকু অর্জিত হয়েছে বলে মনে করেন।

ইয়াসির আজমান: আমরা দেশের তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তিকে একটি ভিত্তি দিতে চেয়েছি। মেন্টরিং সাপোর্টের পাশাপাশি আমরা স্টার্টআপকে সিড মানি দিয়েও সহায়তা করেছি। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যেটা চেয়েছি, সেটি হচ্ছে আমাদের তরুণদের একটি প্ল্যাটফর্ম দিতে। আরো অসংখ্য তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তা করতে উৎসাহ দিতে চেয়েছি। আমি মনে করি, আমাদের এই দর্শন অনেকাংশেই সফল হয়েছে। ২০০ আবেদন থেকে শুরু করে এখন ৭ হাজারের বেশি আবেদন পাচ্ছি।

একটা সময় আমরা শুধুমাত্র আইডিয়া প্রমোট করতাম, তারপর আইডিয়া যেন পুরো জাতির কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় সেটি নিয়ে কাজ করলাম, এখন কিন্তু আমরা গ্রোথ কিভাবে এক্সিলারেট করা যায় সেটি নিয়ে ভাবছি। এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে বিগত কয়েক বছরে।  

সমকাল: এক্সিলারেটর প্রোগ্রামের প্রথমদিকে সঙ্গত কারণেই আইডিয়া স্টেজ বা নূন্যতম কার্যকর একটি প্রোডাক্ট থাকলেই প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করা যেত, সর্বশেষ ব্যাচে আমরা দেখেছি ম্যাচিউরড ও গ্লোবাল মার্কেট ফোকাসড স্টার্টআপদেরকেই কেবল বাছাই করা হয়েছে। এটি নিশ্চয়ই  ভালোলাগার একটি বিষয় আপনাদের জন্য। ভবিষ্যতে এটি কোথায় নিয়ে যেতে চান বা দেখতে চান?

ইয়াসির আজমান: একদিনে কিন্তু ইকোসিস্টেম হয়না, একদিনে একটা ইনফাস্ট্রাকচার হয়না। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন ছিল আমাদের ২০০৯ সালে। সেখান থেকে এখন কিন্তু আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম হওয়ার, উন্নত দেশ হওয়ার চিন্তা করছি।

বেসিক ইন্টারনেট কানেকটিভিটি যখন ছিল না, তখন চিন্তাটা একরকম ছিল। এখন দেশের সবার কাছে ইন্টারনেট পৌঁছে গেছে, তাই আমরা নতুন করে চিন্তা করছি। আমাদের এক্সিলারেটর প্রোগ্রামের শুরুতে আমাদের লক্ষ্য ছিল ইনফাস্ট্রাকচার তৈরি করা। সেটি তৈরি করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। শুরুতে কেবলমাত্র শহরকেন্দ্রিক চিন্তা করছিলাম, লিঙ্গ সমতার দিক থেকেও অনেক পিছিয়ে ছিলাম।  আমাদের তখন স্টার্টআপের সংজ্ঞা কি, এক্সিলারেটর কাকে বলে এসব নিয়ে বলতে হয়েছে। সেখান থেকে এখন আমরা প্রান্তিক পর্যায় থেকে এপ্লিকেশন পাচ্ছি, নারী ফাউন্ডার দেখতে পাচ্ছি, তাদেরকে বিনিয়োগ তুলে আনতে দেখছি।

শুরুতে সবাইকে নিয়ে শুরু করাটা বেশি প্রয়োজনীয় ছিল, কিন্তু এখন আমরা দেখছি স্টার্টআপগুলোর বিজনেস মডেলটা দাঁড়িয়ে গেছে, এখন হয়তো তাদের গ্রোথ এক্সিলারেশন দরকার, পন্য বা সেবাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার মত ক্যাপাসিটি আছে, সহযোগিতাটা দরকার; তাই আমরা তাদেরকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। ভবিষ্যতে এটিকে আরো সুসংহত করার চেষ্টা থাকবে আমাদের। আমরা এখন এমন একটি ইকোসিস্টেম তৈরি করছি যেখানে তরুণরা তাদের দক্ষতা উন্নয়ন করতে পারবে। গ্রামীণফোন একাডেমি ও ফিউচার নেশন দুইটি উদ্যোগ নিয়েছি, এর সাথে জিপি এক্সিলারেটর থেকে স্টার্টআপদের গ্রোথ এক্সিলারেশনের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

সমকাল: আমরা সরকারিভাবে দেখেছি বাংলাদেশ সরকার অনেক উদ্যোগ নিয়েছে এবং স্টার্টআপদের উন্নয়নে সহায়তা করে যাচ্ছে। স্টার্টআপের এই অগ্রযাত্রায় বেসরকারি খাতের উদ্যোগ কতটা জরুরি বলে আপনি মনে করেন?

ইয়াসির আজমান: সরকারি ও বেসরকারি সবধরনের উদ্যোগই জরুরি। বাংলাদেশ সরকারের ভিশন ২০২১ ও রূপকল্প ২০৪১ এর হাত ধরে আইসিটি ডিভিশন অনেক উদ্যোগ নিয়েছে স্টার্টআপের উন্নয়নের জন্য। রাষ্ট্রমালিকানাধীন প্রাইভেট ভিসি ফান্ড স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড, আইডিয়া প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম। একই সাথে বেসরকারি উদ্যোগও অনেক বিস্তৃত হচ্ছে।

গ্রামীণফোন এক্সিলারেটরের মত আরো অনেক উদ্যোগ এর পরে আমরা দেখেছি। ইকোসিস্টেম পার্টনার, ইনকিউবেটর প্রোগ্রাম, এঞ্জেল ইনভেস্টর নেটওয়ার্ক, প্রাইভেট ভিসি ফার্ম, নলেজ হাব- অনেক বেসরকারি  উদ্যোগ এসেছে। এই উদ্যোগগুলো অনেক জরুরি। ক্যাপাসিটি ডেভেলপ করা, ফান্ডের এক্সেস তৈরি করা, এই ব্যাপারগুলি পাইপলাইন বিল্ড করতে সহায়ক। সরকার যেমন হাইটেক পার্ক তৈরি করছে, সেখানে স্টার্টআপরা ওয়ার্কস্পেস পাচ্ছে, ইনকিউবেশনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বেসরকারিভাবে আমরা এবং আরো অনেকেই কো-ওয়ার্কিং স্পেস দিচ্ছে, এক্সেস টু মেন্টরিং, এক্সেস টু ফান্ডিং এর সুযোগ দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত এই সংখ্যাটা প্রয়োজনের তুলনায় হয়তো অনেক কম। কিন্তু বিগত কয়েক বছরের অগ্রগতিতে আমরা আশাবাদী হচ্ছি।

সমকাল: বৈদেশিক বিনিয়োগ আসছে। গত কয়েক বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ইনভেস্টমেন্ট পেয়েছে আমাদের লোকাল স্টার্টআপ গুলো। এটি আমাদের অর্থনীতির জন্য কিভাবে সুফল বয়ে আনছে, আরো বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোন উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করেন কি?

ইয়াসির আজমান: এটি সত্যিই অনেক আনন্দের আমাদের জন্য। ২০১৫ সালে যখন আমরা শুরু করি, স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্টের ধারনাই ছিল না। এখন আমাদের পাঠাও, শপআপ, যান্ত্রিক, ডাক্তারকই-এর মতো অসংখ্য স্টার্টআপ বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আসছে।

আমাদের অর্থনীতি এখনো কিন্তু আরএমজি এবং রেমিট্যান্সের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। আমরা যদি স্টার্টআপের এই সেক্টরে মনোযোগী হই, এখান থেকে কিন্তু জিডিপি বা সামগ্রিক অর্থনীতিতে একটা ভালো অবদান স্টার্টআপ রাখবে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে স্কিল ডেভেলপমেন্ট ও ক্যাপাসিটি বিল্ডিংয়ে মনোযোগ দিতে হবে। বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে, বিনিয়োগকারীরা যেন কোনো অসুবিধার সম্মুখীন না হয়।

সমকাল: বাংলাদেশের স্টার্টআপের অগ্রযাত্রাকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ইয়াসির আজমান: আমরা এমন একটি সময় পার করে এসেছি, যখন আমাদের কাজ করতে হয়েছে সবার হাতে যেন ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া যায়। ২০১৫ সালে আমরা সারা দেশব্যাপী ইন্টারনেট সপ্তাহ পালন করেছি, প্রধানমন্ত্রী ও আইসিটি প্রতিমন্ত্রী মহোদয় তখন আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্যপূরণে এই উদ্যোগে আমাদেরকে উৎসাহ দিয়েছেন। এখন ২০২২ এ যখন আমাদের তরুণরা নতুন নতুন উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করছে, ইন্টারনেট ব্যবহার করে আইওটি, এআই, এমএল, এআর, ভিআর নিয়ে কাজ করছে এবং স্টার্টআপ আইডিয়ার মাধ্যমে বড় বড় সমস্যার সমাধান করে ফেলছে; এটি সত্যিই বিস্ময়কর ।

আমরা এখন স্টার্টআপদের ছাড়া আমাদের জীবন চিন্তাও করতে পারি না। আমাদের সকাল শুরু হচ্ছে পাঠাও বা উবারের মাধ্যমে, বাজার করছি চালডাল এর মাধ্যমে, খাবার অর্ডার করছি পাঠাও বা ফুডপ্যান্ডা দিয়ে, ডাক্তারও দেখাচ্ছি অনলাইনে ডাক্তারকই বা এরকম কোন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। মিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ আসছে আমাদের স্টার্টআপদের হাত ধরে। এই ব্যাপারগুলো অত্যন্ত গর্বের ও আনন্দের।