মূল নাম আব্দুল ওয়াহিদ সাজন। জাতীয় পরিচয়পত্রে মো. সাজন আহমদ। দুটি পাসপোর্টে আব্দুল ওহিদ ও ওয়াহিদ আহমদ। বয়স ছত্রিশের কোটায়। বাড়ি ছাতকের হায়দরপুরে। বাবা আহমদ আলীর ৮ ছেলেমেয়ের মধ্যে সপ্তম সাজন। বড় ভাই আব্দুল গণি ওরফে আলী গণি বসবাস করছেন যুক্তরাজ্যে। বয়স এখন ষাটের কাছাকাছি। সিলেটে তার বাসা দেখভাল করতেন সাজন। কে জানত আপন ভাই সাজন একদিন ভয়ংকর জালিয়াত হয়ে উঠবেন। প্রমাণ দেবেন- 'ঘরের শত্রু বিভীষণ'। বড় ভাই আব্দুল গণির নামের সঙ্গে 'আব্দুল গণি সাজন' ব্যবহার করে নিজেই গণি সেজে তৈরি করেন জাল দলিল, জাতীয় পরিচয়পত্র, নাগরিক সনদ ইত্যাদি। এমনকি নিজের বিয়ে ও কাবিন করেন গণি নাম ধারণ করে।

আশ্চর্যের বিষয়, ১৯৮৫ সালে ভাই আব্দুল গণি জায়গা ক্রয়কালে সাজনের বয়স ছিল ৫ বছর। গ্রেপ্তার হওয়ার পর বেরিয়ে আসে তার প্রতারণা ও জালিয়াতি কাহিনি। এর আগে একাধিক তদন্তে জালিয়াতির বিষয়টি তুলে ধরে সিআইডি। দলিল জালিয়াতি মামলায় এখন কারাগারে সাজন। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি বনকলাপাড়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে বিমানবন্দর থানা পুলিশ। আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয় বলে নিশ্চিত করেন বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. আবুল হোসেন।

মামলা ও তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ১৯৮৫ সালে লন্ডন প্রবাসী আব্দুল গণি নগরীর সুবিদবাজারের লন্ডনী রোডে ৭ শতক জায়গা কেনেন। পরে সেখানে বাসা তৈরি করেন। ৮৯ নম্বর ওই বাসাটির নাম করেন বাবার (আহমদ ভিলা) নামে। পাশাপাশি গণি আরেকটি জায়গা এয়ারপোর্ট থানার কাকুয়ারপাড়ে কেনেন। সাজনকে সুবিদবাজারের বাসা দেখাশোনা ও সেখানে বসবাসের সুযোগ করে দেন আব্দুল গণি। আব্দুল গণির কোনো ছেলে সন্তান নেই। ২ মেয়ের বিয়েও দিয়েছেন। ২০১২ সালে টাকার সমস্যার কারণে বাসা বিক্রির উদ্যোগ নেন। কিন্তু সাজন বেঁকে বসেন। দেশে এলে ভাইকে মেরে ফেলার হুমকি দেন। এর পর ভাই আর দেশে আসেননি। তখন থেকে বাসাটি নিজের নামে করার জালিয়াতি শুরু সাজনের। এজন্য নিজের নাম বদলে আব্দুল গণি সাজন লিখে বিভিন্ন কাগজপত্র তৈরি করেন তিনি।

জানা গেছে, প্রথমেই আব্দুল গণি সাজন উল্লেখ করে বিয়ে করেন আব্দুল ওয়াহিদ সাজন নামে। ২০১২ সালের ৭ ডিসেম্বর সম্পাদিত কাবিননামায় তা উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর একের পর এক জালিয়াতি শুরু। বিভিন্ন সময়ে তার প্রতারণায় বিষয়টি জানতে পারেন গণি। ফলে তার ভাগ্নে নজরুল ইসলামকে আমমোক্তার নিযুক্ত করে বাসা দেখাশোনার দায়িত্ব দেন। নজরুল ২০১৭ সালে জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগে আদালতে মামলা করেন। ২০১৯ সালে কাকুয়ারপাড়ের বাসার কেয়ারটেকার রাসেল আহমদ দলিল জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা করেন। মামলা দুটি আদালতের নির্দেশে তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে জমা দিয়েছেন সিআইডি কর্মকর্তারা।

এসব তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আব্দুল গণি জায়গা (দলিল নং-৫৩৫৮/৮৫) ক্রয়কালে আব্দুল ওয়াহিদ সাজনের বয়স ৫ বছর। নিজেকে আব্দুল গণি সাজন দেখিয়ে ২০১৫ সালে দলিল সংশোধন করেন। ২০১৮ সালে আরেক ভাই আব্দুল গফুরের নামে সাজন হেবা দলিল সম্পাদন করেন (নং-৮৬০৬/১৮)। সেই দলিল থেকে আবার নিজেকে গ্রহীতা দেখিয়ে দলিল (নং-৬৬১/১৯) করেন। সেই দলিল দিয়ে নামজারি (খতিয়ান ৫৫৩৩/১৮-১৯) খোলেন। আব্দুল গণি সাজন লিখে ছাতকের ভাতগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সনদপত্র নেন। ২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারি উত্তরাধিকারী সনদপত্রটিও জাল ছিল। সাজন তার জাতীয় পরিচয়পত্র নং-৯০১২৩১১৬৫৮৬৯২ এবং পাসপোর্ট নং-এ/ই-৩৭৪৩৪১২সহ সকল কাগজপত্রে আব্দুল ওয়াহিদ সাজনের পরিবর্তে আব্দুল গণি সাজন লেখিয়েছেন। কিন্তু আব্দুল ওয়াহিদ সাজনের ২০০০ সালে ইস্যুকৃত পাসপোর্ট নং-এন-০৩৪০১২০ তে নাম আব্দুল ওহিদ উল্লেখ রয়েছে। ২০০৯ সালে আরেকটি পাসপোর্টে ওয়াহিদ আহমদ নাম রয়েছে, যার পাসপোর্ট নং-ভি-০৮৪৭৬৫। সহকারী কমিশনার ভূমি জালিয়াতির বিষয়টি জানতে পেরে নামজারি আদেশ বাতিল করেছেন বলে তদন্ত প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়।

২০১৮ সালে সাজনের দায়ের করা একটি মামলায়ও তার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দেন সিআইডি সিলেট জোনের এসআই রেজাউল করিম। এমনকি সাজনের দায়ের করা মামলায় তার তিন ভাই ১৬১ ধারায় জবানবন্দিতে প্রতারণার বিষয়টিও স্বীকার করেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন এসআই রেজাউল করিম। এছাড়া জালিয়াতির বিষয়টি নজরুল ইসলামের দায়ের করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদনেও উল্লেখ করেন সিআইডির এসআই রনজিত দাস। দুটি মামলাই এখন আদালতে বিচারাধীন।

এদিকে সুবিদবাজারের বাসাটি জবরদখল ও জালিয়াতি করে ধরা খাওয়ার পরও থামেননি সাজন। তিনি হাত বাড়ান বিমানবন্দর এলাকার কাকুয়ারপাড়ের বাসার দিকে। ইতোমধ্যে বাসার কেয়ারটেকার সারিয়া বেগম ও তার ছেলে রাসেলকে বাসা ছাড়ার হুমকিও দিয়েছেন। এ ঘটনায় এয়ারপোর্ট থানায় জিডি করা হয়।\হসাজন কারাগারে থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার ভাগ্নে নজরুল ইসলাম সমকালকে জানান, সাজন প্রতারণা ও জালিয়াতি করে আব্দুল গণির বাসা নিজের নামে করার চেষ্টা করছেন। তিনি একজন জালিয়াত লোক। পরিবারের সবাই তার বিপক্ষে। আদালতের মাধ্যমে তার মামা গণি ন্যায়বিচার পাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন নজরুল।

মন্তব্য করুন